আন্তর্জাতিক গুম দিবসের দাবি হোক, আয়না ঘর গুড়িয়ে ফেলি,ইলিয়াস-আজমী- কাশেমী গংদের ফিরিয়ে আনি – জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:৫৮, বুধবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক গুম দিবসের দাবি হোক, আয়না ঘর গুড়িয়ে ফেলি,ইলিয়াস-আজমী- কাশেমী গংদের ফিরিয়ে আনি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, আগস্ট ২৯, ২০২২ ৯:১৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, আগস্ট ৩০, ২০২২ ৪:৫৭ অপরাহ্ণ

 

সায়েক এম রহমান

এক. এই তো গত সপ্তাহে বিশ্বসহ সারা জাতি দেখেছে, জাতীয় প্রেসক্লবের সামনে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে-ই কেঁদে ফেলল ছোট্ট আদিবা! শুধু এটুকু বলতে পেরেছে, “পাপাকে (বাবা) ছাড়া একটুও ভাল্লাগে না আমার। কিছুই ভাল্লাগে না”।
আদিবার বয়স যখন দুই বছর, তখন থেকেই সে তার বাবাকে খুঁজে পাচ্ছে না। এখন তার বয়স ১১ বছর। প্রতিদিনই সে তার বাবাকে খুঁজে এবং সে বিশ্বাস করে এক দিন না এক দিন তার বাবাকে খুঁজে পাবে। তার মায়ের হাত ধরে গত সপ্তাহে আদিবা হাজির হয়েছিল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে “মায়ের ডাকে” মানববন্ধন অনুষ্টানে। সেখানে আদিবার মত ৪২টি পরিবার সমবেত হয়েছিল, তারা প্রতিটি পরিবার তাদের প্রিয় মানুষদের খোঁজ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আদিবার বাবা পারভেজ হোসেন বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। পারভেজের আজও খোঁজ মিলেনি।
আদিবার বাবার মত হাফসা ইসলামের বাবা সাজেদুল ইসলামও নিখোঁজ হন ২০১৩ সালে। তার বাবার কথা বলতে গিয়ে হাফসা বলেন,” আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই, আমার বাবাকে যদি মেরে ফেলে থাকেন, তাহলে লাশটা একটু দেখতে দিন। আমি আমার বাবার লাশ দেখতে চাই। কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন,” আমি আমার বাবাকে শেষ বারের মতন একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই”। এ সব অনুস্টান দেখে সবার চোখে ছিল বিষাদের পানি। আর ফ্যাসিস্টের কি ছিল জানি না! হায়রে নিষ্ঠুরতা! হায়রে বর্বরতা!

দুই. পাঠক, একান্ন বৎসরের বাংলাদেশ আজ একটি চরম বিপদগ্রস্ত দেশ! লেখাটি যখন লিখছি তখন অর্থাৎ এই সপ্তাহে -ই আন্তর্জাতিক গুম দিবস (৩০ আগষ্ট ২০২২) পালন করবে সারা বিশ্ব। আর প্রায় কাছাকাছি সময়েই সম্প্রতি নিখোঁজ অবস্থা থেকে ফিরে আসা দই ব্যক্তির জবান বন্দি নিয়ে ” আয়না ঘর” নামে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে বিশ্ব মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সুইডিশ অনলাইন পোর্টাল “নেত্র নিউজ”। নেত্র নিউজ তুলে ধরছে আয়না ঘরের বিভীষিকাময় লোমহর্ষক কাহিনী! আজ বিশ্ব মিডিয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জ পর্যন্ত আয়না ঘরের বিভীষিকাময় লোমহর্ষক কাহিনীতে সয়লাব!
মজার ব্যাপার হল, তার পরপরই অর্থাৎ এ মাসের মাঝামাঝিতে (আগস্টে) জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিচেল ব্যাচেলেটের চার দিনের সফরে আসেন ঢাকা। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ধারণা হল মিচেল ব্যাচেলেটের এই সফর সরকারি দলের জন্য ছিল একটি বিগ মেসেজ। এই চারদিন ঢাকা ছিল গুম-খুনের খবর নিয়ে সরগরম! মিচেল ব্যাচেলেটের কাছ থেকে বারবারই সরকারের নেতাদের শুনতে হয়েছিল বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং বহু মানুষের লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার অভিযোগগুলি। অভিযোগের ব্যাখা দিতে হয়েছে,খন্ডন করতে হয়েছে। ব্যাচেলেটেস যেদিন ঢাকায় নামেন সেদিনই পরপর সরকারের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী – স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, – পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী দেখা করে গুমখুন, এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের জোরে সাংবাদিক হয়রানি নিয়ে তার উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। এমন কি ঢাকা ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে এ কথাগুলি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে নেই গণতন্ত্র, নেই মানবধিকার, নেই মানুষের স্বাধীনতা! চতুদিকে হামলা – মামলা, খুন-গুম, রাহাজানি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি । সব মিলে এ যেন পাগলা ঘৌড়ার পিঠে চড়ছে বাংলাদেশ!


তিন. এছাড়া হংকং ভির্ত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের২০০৯ সাল থেকে অর্থাৎ আঃ লীগের সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৬১৯জন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটকের পর লাপাত্তা হয়ে গেছেন এবং ২৬৫৮জন মানুষকে বিচার-বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। যদিও এ পরিসংখ্যানে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু অসংখ্য মানবাধিকার সংস্থা গুলো বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা গুম-খুন এবং হালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের নির্যাতন নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করে, এই সব ব্যাপারে শত শত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।

চার. পাঠক অবগত,,, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাতে এম ইলিয়াস আলীকে তাহার বাসার সামন থেকে ড্রাইভারসহ তুলে নিয়ে যায় সরকারি লোকজন। অত্যান্ত পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে আজ ১০ বছরের উপরে হয়ে গেলেও বৃহত্তর সিলেটের এই সময়ে একমাত্র জনপ্রিয় নেতা এম ইলিয়াস আলীর সন্ধান মিলেনি। টিপাই মুখ বাঁধ এবং দেশ বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদের দরুনই তাঁকে গুম করা হয়েছে বলে বেশির ভাগ বিশ্লেষকদের ধারণা। কারণ বৃহত্তর সিলেট বাসির জন্য মরণফাঁদ ভারতের টিপামুখ বাঁধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বৃহত্তর সিলেট বাসিকে নিয়ে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ গণ-আন্দোলনের জোয়ার গড়ে তুলেছিল তাঁর ই নেতৃত্বে। সেই আন্দোলনের ভয়াভহতা দেখেই সরকার হিমশিম খেয়েছিল। আজকের দেশবাসীর ধারণা টিপাইমুখের বাঁধই এম ইলিয়াস আজকের এই পরিণতি। উল্লেখ্য এম ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর তাঁকে ফেরত পাওয়ার জন্য সারা দেশে যেভাবে আন্দোলন সংগ্রাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল, আমার জানা মতে আর কোন নেতা গুম হওয়ার পর এভাবে আন্দোলন সংগ্রাম হয়নি। বিশেষ করে তাঁহার নির্বাচনী এলাকা বিশ্বনাথে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনজন আন্দোলনকারী কর্মী মৃত্যু বরণ করেছিলেন। আমার মনে হয়, এম ইলিয়াস আলীকে ফেরত পাওয়ার জন্য তখন সারা দেশজুড়ে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই আন্দোলন এই মহুর্তে করতে পারলে আমি নিশ্চিত ফ্যাসিষ্ট সরকারের পতন হয়ে যেত।
এছাড়া আরও তিনটি নাম না লিখলে কলামটি অপূর্ণ থেকে যাবে,,, পাঠক বৃন্দ অবশ্য অবগত, আমি একটু সরণ করিয়ে দেই,,২০১৬ সালের ৪, ৯ এবং ২২ আগষ্ট যথাক্রমে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বীন কাশেম এবং বিগ্রেডিয়ার আব্দুল্লাহিল আমান আজমীদেরকে অনেকটা সিনেমা স্টাইলে সরকারি বাহিনী ডিবি পরিচয়ে উটিয়ে নিয়ে যায়। হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে তো দিন দুপুরে তাহার ঘরে সাথে থাকা অবস্থায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। তারই ঠিক চারদিন পর, সুরক্ষিত এলাকা মীরপুর ডিএইচএস এর বাসা থেকে মীর আহমেদ বিন কাশেমকে।
উল্লেখ্য তাহাকে তুলে নেওয়ার আগের রাত র্যাব গিয়েছিল বাসায় তাঁকে তুলে নিয়ে আসার জন্য। তখন মীর কাশেম র্যাব কে বলেছিলেন, ” আমাকে কেন আপনাদের সাথে যেথে হবে? আর যদি যেথেই হয় আমাকে ওয়ারেন্ট দেখান। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তারা তাকে না নিয়ে চলে যায়। কিন্তু পরের রাত ঠিকই সাদা পোষাকের বাহিনী মা – বোন – স্ত্রীর সামনে থেকে ফিল্মি কায়দায় তুলে নিয়ে যায়। হিসেব করে দেখবেন, ঠিক তার ১৩ দিন পর সেনা বাহিনীর জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা যিনি তাঁহার কর্ম জীবনে সোর্ড অব অনার পেয়েছিলেন, বিগ্রেডিয়ার আজমী কে নাজেহাল করে তাঁহার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় ডিবি পরিচয়ে। উল্লেখ্য তাঁহাকে তুলে নেওয়ার পূর্ব মহুর্তে তাঁহার বাসার আশ -পাশের রাস্তা গুলি যেন ফিল্ম সুটিংয়ে রুপান্তরিত হয়েছিল! এ সময রাস্তার সব সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলা হয় এবং তাঁহার বাসার সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়। এমনি ছিল সেই দিনের সাদা পোষাক বাহিনীর ফিল্মি স্টাইলের অপারেশনের বিবরণ!
তারপর ও ফ্যাসিষ্ট সরকারের বাহিনী তাদের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী বলছে, এ সমস্ত গুম বা নিখোঁজের ব্যাপারে তারা অবগত নহে। যেমনি সালাউদ্দিন ও হুম্মাম কাদের চৌধুরী র ব্যপারে বলছিল। পরে কি ভাবে কি হয়েছিলো সবই আপনাদের জানা।
আজ দেশের প্রতিটি নাগরিক বলছে, ” সালাউদ্দীন হুম্মাম গং রা যখন ফিরলেন, তা- হলে বাকিরা কোথায়? চৌধুরী আলমসহ ইলিয়াস- আজমী -কাশেমীরা “আয়না ঘর ” থেকে কবে ফিরবেন?
নাগরিক রা এখন বিশ্বাস করে ওরা সবাই আয়না ঘড়ে আছেন।
ফ্যাসিষ্ঠ সরকারকে বলছি, তাদেরকে অনুধাবন করা উচিত ছিল, ক্ষমতা কখনও চিরস্থায়ী হয় না। পৃথিবীতে ক্ষমতার অবশ্য পালাবদল রয়েছে। এমন জগন্য খুন-গুমের রীতিনীতি পরিহার না করলে, তোমাকেও কিন্তু সেই স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সময় কিন্তু খুব ই সন্নিকটে!

পাঠক, দেশ এখন এক “আয়না ঘরে” আবদ্ধ হয়ে গেছে, আসুন আমরা দলমত নির্বিশেষে দেশকে বাঁচানোর জন্য, মানুষকে বাঁচানোর জন্য, আজকে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি, এখনই সময় আয়না ঘড় গুড়িয়ে ফেলি, সকল গুম হওয়া মানুষ দের মুক্ত করি এবং আন্তর্জাতিক গুম দিবসের আমাদের দাবি হোক, আয়না ঘর গুড়িয়ে ফেলি, চৌধুরী আলমসহ ইলিয়াস – আজমী – কাশেমী গংদের ফিরিয়ে আনি।

লেখক ও কলামিস্ট
সায়েক এম রহমান
উপদেষ্টা সম্পাদক
জনতার আওয়াজ ডটকম

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ