ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়ান : মারুফ কামাল খান - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৫:১৮, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়ান : মারুফ কামাল খান

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৫ ৪:০৮ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৫ ৪:০৮ পূর্বাহ্ণ

 

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে গণতন্ত্র হত্যার শামিল বলে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। দলনেতা শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রাম করার কারণে বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ভালোবেসে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে ডাকে। কিন্তু আজ যদি আপনি গণতন্ত্র হত্যার এ উদ্যোগ নেন, তাহলে এ দেশবাসী আপনাকে ‘মুজিব খান’ বলে মনে করবে৷ তারা আইউব খান, ইয়াহিয়া খানকে যেমন ক্ষমা করে নি, মুজিব খানকেও তেমনই ক্ষমা করবে না।
মুজিবোত্তর বাংলাদেশে জেনারেল ওসমানী এক সংবাদ-সন্মেলনে বলেছিলেন : “একদলীয় বাকশাল শাসনপদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের যে ক্ষতি করা হয়েছে ততোটা ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার স্টাইন আইজেনহাওয়ার-এর আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সমাজতন্ত্রের চরম শত্রু জন ফস্টার ডালেসও করতে পারেন নি।”
সমাজবাদীরা বলে থাকে, বুর্জোয়াদের একটা অপকৌশল হচ্ছে, লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা ঠেকানো। মুজিব হয়তো তার রাজনৈতিক জীবনের একটা পর্যায়ে এসে সেই অপকৌশলই গ্রহন করেছিলেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ মরহুম খন্দকার আব্দুল হামিদ মুজিবামলে জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাক-এ মঞ্চে-নেপথ্যে শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখতেন স্পষ্টভাষী ছদ্মনামে। তিনি মুজিববাদী সোশ্যালিজমকে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপে জর্জরিত করে নাম দিয়েছিলেন ‘চোষালিজম।’
জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, “যদি কুড়ি বছর বয়সে তুমি কম্যুনিস্ট না হও, তাহলে বুঝতে হবে তোমার কোনো হৃদয় নেই। আর যদি ৩০ বছর বয়সেও তুমি পুঁজিবাদী না হও, তাহলে তুমি মগজশূন্য।” শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে এর উল্টোটাই ঘটেছিল। ২০ বছর বয়সে তিনি মোটেও সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, বরং ছিলেন পুঁজিবাদের ঘোর সমর্থক। আর পঞ্চাশোর্ধ বয়সে এসে তিনি নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে জাহির করেন। এই বাস্তবতার আলোকে মুজিবের হৃদয় ও মগজের পরিমাপ করা বার্নার্ড শ-এর থিয়োরি অনুযায়ী সত্যিই ভারী কঠিন।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি নাকচ করে কেবল একদলীয় বা আওয়ামী লীগের সরকার গঠন এবং সেই সরকারের আদেশে গণপরিষদ গঠনের বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুস সালাম ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লিখেন। এই অপরাধে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও তার দলও এই গণপরিষদ গঠনকে অবৈধ বলে মত দেয়। সে সময় নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল – জাসদ গণপরিষদে পাস হওয়া সংবিধানের প্রতি জনগণের অনুমোদন আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য গণভোট আয়োজনের দাবি জানায়। কিন্তু এসব দাবি ও মতামত নাকচ করে দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালেই জনমনে এই সন্দেহ বদ্ধমূল হয়েছিল যে, বাংলাদেশের সংবিধানটি এদেশের জনগণের নয়, ভারত সরকারের অনুমোদিত। জনগণের এতো অনাস্থা ও সন্দেহ এই সংবিধান কখনো বাংলাদেশের সমস্যা ও সংকট নিরসনের নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেনি। বরং প্রতিটি সংকটকালে সমাধান খুঁজতে হয়েছে এই সংবিধানের বাইরে গিয়ে এবং পরে সংবিধানকে সেই সমাধানের আলোকে কাটাছেঁড়া করে পুনর্বিন্যস্ত করতে হয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে উপাধি, খেতাব, ভূষণ ও সম্মাননা দিতে পারতো না। কেবল সাহসিকতা ও একাডেমিক পুরস্কার ছিল ব্যতিক্রম। অর্থাৎ বীরত্বসূচক খেতাব ও একাডেমিক পুরস্কার ছাড়া কোনো নাগরিকের মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া থেকে রাষ্ট্রকে বিরত রাখা হয়েছিল। কারণ সমাজতন্ত্র। মুজিব ছাড়া নাগরিকেরা সবাই সমান। তাদের আবার কৃতিত্বের স্বীকৃতি কীসের? জিয়াউর রহমান এসে সেই বন্ধ্যানীতি উড়িয়ে দিলেন। নাগরিকদের অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিতে, মেধা ও মননশীলতাকে উৎসাহিত করতে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক নামে মর্যাদাসম্পন্ন দু’টি রাষ্ট্রীয় পদক প্রবর্তন করলেন।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জননির্বাচিত সরকার ২০০৩ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে দু’জন ব্যক্তির নাম মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার বিজয়ী বলে ঘোষণা করে। তাদের একজনের নাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরেক জনের নাম জিয়াউর রহমান। উভয়ের নামে নিবেদিত মেডেল আর সম্মাননাপত্র জাতীয় যাদুঘরে রেখে প্রদর্শনীর সিদ্ধান্ত হয়।
রাজনৈতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের রহমান যুগলকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার এই ঘোষণায় মুজিবকন্যা হাসিনার প্রতিক্রিয়া ছিল বিষজর্জর। এর মাধ্যমে নাকি মুজিবের মহিমাকে ক্ষুণ্ণ করে তাকে জিয়ার পাশে এনে দাঁড় করাবার দুরভিসন্ধি প্রকাশিত হয়েছে বলে হাসিনা বয়ান দেন। আরো পরে তার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা এলে হাসিনা ২০১৬ সালে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাহার করেন। জাতীয় জাদুঘর থেকে ওই পুরস্কারের মেডেল ও সম্মাননাপত্র সরিয়ে ফেলা হয়।
হাসিনা তার বাবাকে খালেদা জিয়া সরকারের দেয়া স্বাধীনতা পুরস্কার বহাল রেখে তার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের নামে দরিদ্র মানুষের দেশের কোটি কোটি টাকা খোলামকুচির মতো উড়িয়েছেন। সারা দেশে তার ম্যুরাল অঙ্কন ও মর্মরমূর্তি গড়েছেন হাজারে হাজার। পারিবারিক বাসভবনকে করেছিলেন স্মৃতিযাদুঘর। মুজিবের ব্যক্তিপূজার আয়োজন চলেছে দেশজুড়ে দিনরাত। কিন্তু কোথায় আজ মুজিবের সেই মহিমা এবং জবরদস্তি করে আরোপিত সম্মান? জেগে ওঠা নির্যাতীত মানুষের আঘাতে ধূলিসাৎ হচ্ছে আজ তার সব স্মৃতির স্মার। আর সারাদিন যে জিয়াকে তুচ্ছ ও অসম্মান করতে হাসিনাগং অহর্নিশি কুৎসা রটাতেন,তার স্মৃতি আজ স্বমহিমায় উদ্ভাসি। হিংসার রাজত্ত ভেঙে পড়েছে ।এখন জিয়ার স্বাধীনতা পুরস্কার উপযুক্ত মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতায় পুনঃস্থাপিত হয়নি।
জনগনের সমর্থনে বর্তমান অন্তর্বর্তী
সরকারকে বলি ,দেরি না করে কাজটা করে ফেলুন। ইতিহাসের রেকর্ড ঠিক করু। ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়া।

মারুফ কামাল খান : সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ