এক পার্সেন্টও বিশ্বাস করি না এই সরকার অবাধ নির্বাচন দিবে - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৪:৫৭, রবিবার, ১৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১১ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

এক পার্সেন্টও বিশ্বাস করি না এই সরকার অবাধ নির্বাচন দিবে

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৩ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৩ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক

বর্তমান সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিবে তা এক পার্সেন্টও বিশ্বাস করেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান, লেখক, বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, এটা বিশ্বাস করা কারও উচিত হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা এ ধরনের কোনো সরকারের মাধ্যমেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব বলে তার মত। বর্তমান নির্বাচন সংকটের জন্য সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কঠোর সমালোচনা করেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি-

বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এটি একইসঙ্গে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট। তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো উপায় আছে কী? আপনার কাছে এই সংকটের কোনো সমাধান আছে কী?

বাংলাদেশে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে যে নির্বাচন হয়েছে, এরপর তো কোনো কারণ নাই এই সরকারকে বিশ্বাস করার যে, তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করবে। ২০১৪তে বিরোধী দল আসে নাই, ১৮তে বিরোধী দল এসেছে। এবং তখন যখন সংলাপ হচ্ছিল বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। প্রধানমন্ত্রী বারবার আশ্বাস দিয়েছেন অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।

কিন্তু ২০১৮ সালের যে নির্বাচন, সেটা তো কারচুপির সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমরা বহু সাক্ষ্য-প্রমাণ, বহুজনের কথা শুনেছি যে, ইলেকশনের আগের রাতে ইলেকশন হয়ে গেছে। ২০১৮ বা ’১৪ সালের নির্বাচন বৈধ কিনা- এটাই আমার সন্দেহ আছে। মূল কথা হচ্ছে, এখানে যা হয়েছে নির্বাচনের নামে যে অরাজকতা হয়েছে, আমি মনে করি সরকারকে কারও বিশ্বাস করাই উচিত না যে তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে। এরকম একটা সিচুয়েশনের পর যদি তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন না হয়, তাহলে কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে আমি বুঝতে পারছি না। কারণ আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, এরমধ্যে আমরা প্রশাসন, পুলিশ এই দুইটা প্রধান নির্বাচন অ্যাপারেটাস তাদের যে ভূমিকা দেখি এবং নির্বাচন কমিশন, তাদের যে ভূমিকা দেখি তারপর তো কোনোভাবেই বিশ্বাস করার কারণ নাই যে, এই প্রশাসন বা এই পুলিশ প্রশাসন, এই নির্বাচন কমিশন, এই সরকার ওনারা মিলে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার করতে হবে। এটার বাইরে যদি একটা সলিয়্যুশন চিন্তা করা যেতে পারে সেটা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার। কিন্তু আমার মনে হয় না, নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থাকলে এটা অন্য কারও জন্য গ্রহণযোগ্য হবে। এবং আমার মনে হয় নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে যদি নতুন কাউকে দিয়ে জাতীয় সরকার করা হয়, হয়তো সেটা একটা বিকল্প হতে পারে সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য। কিন্তু আমি এক পার্সেন্টও বিশ্বাস করি না যে, এই সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে। এবং এটা বিশ্বাস করা কারও উচিত না।

প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার বইয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট তৈরির জন্য খায়রুল হককে দায়ী করেছেন। আপনি এটা কতোটা যৌক্তিক মনে করেন?

আসিফ নজরুল: মাহবুব তালুকদারের বই লেখার বহু আগে থেকেই আমরা বিভিন্নভাবে বলে আসছি, আজকে বাংলাদেশে নির্বাচনের নামে যে প্রহসনের অবস্থা তৈরি হয়েছে, এর দায়-দায়িত্ব বিচারপতি খায়রুল হক কোনোভাবে এড়াতে পারেন না। উনি যে রায় দিয়েছেন, অনেকগুলো অত্যন্ত প্রশ্নবোধক কাজ করেছেন। একটা সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছেন। সেখানে উনি বলেছিলেন- পরবর্তী দুইটা নির্বাচন দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হতে পারে। এই সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ সংবিধান চেঞ্জ করার পরে উনি পরিবর্তিত সংবিধান অনুযায়ী বিস্তারিত রায় দিয়েছেন। ওনার বিস্তারিত রায় যে সংক্ষিপ্ত রায়ের ব্যত্যয়, সেটা অন্য দুইজন বিচারপতির রায়ে উল্লেখ করা আছে। উনি প্রায় ১ বছরের বেশি সময় নিয়েছেন বিস্তারিত রায় দেয়ার জন্য। এই রায় ঘোষণার পর উনি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন। উনি নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে প্রধান বিচারপতির পদমর্যাদার বেতন নিয়ে আজকে কতো বছর যাবৎ আছেন। এটা তো ক্লিয়ার, উনি উপকারভোগী হয়েছেন একটা রায় দিয়ে, যে রায় বাংলাদেশের ভোটাধিকারকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। ফলে ওনার নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগেরই প্রতিষ্ঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আওয়ামী লীগ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ওনারাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছিলেন। এটা একটা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা সামাজিক চুক্তির মতো হয়ে গিয়েছিল। এখন আমার ক্ষমতা আছে দেখে, বিচারকের আসনে বসছি দেখে যেকোনো রায় দিয়ে দিলাম, পরে একটা বেনিফিট নিলাম, এটা তো দুর্ভাগ্যজনক। আজকে বাংলাদেশে যে অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে, আজকে যে সুশাসনের ক্ষেত্রে, গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে, মানবাধিকারের ক্ষেত্রসহ কোনো ক্ষেত্রে উনি ওনার দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

আমাদের ঐতিহাসিকভাবে এবং বর্তমানে যে সংঘাতময় রাজনীতি এর সমাধানে কোনো সামাজিক চুক্তি কি সম্ভব?

আসিফ নজরুল: আমাদের যে বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি এটা অবসানে সামাজিক চুক্তিই তো ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। তখনকার সময়ে প্রধান বিরোধী দলগুলো আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত মিলে চেয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। বিএনপি সেটা মেনে নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে। এই চারটা মেজর প্লেয়ার এবং একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ সবাই মিলে একটা ব্যবস্থা সেটেল্ড করেছে। সেটাই তো সবচেয়ে বড় সামাজিক চুক্তি। এই সামাজিক চুক্তিই তো লঙ্ঘন হয়ে গেল। সামাজিক চুক্তির মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থাকতো, ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিএনপি সরকার ম্যানুপুলেট করার চেষ্টা করলে, অবশ্যই বিএনপি’র সেটা দোষ ছিল। যদি একটা সিস্টেমে সমস্যা থাকে, সমস্যা দূর করবেন। আপনি সিস্টেম বাদ দিয়ে দিলেন কেন? সামাজিক চুক্তি বাদ দেয়ার রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে আওয়ামী লীগের।

আপনার কি মনে হয় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?
আসিফ নজরুল: বাংলাদেশে ফরেন প্লেয়ার যারা আছে এদের মধ্যে সুস্পষ্ট দুইটা ভাগ আছে। একদিকে আছে আমেরিকা-ইউরোপ, আরেকদিকে আছে চীন এবং রাশিয়া। ভারতের রোল এক্সাটলি কী, আমরা বুঝতে পারছি না। অতীতে আমরা দেখতাম আমেরিকা ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখতো। ভারতের চোখ দিয়ে দেখার কারণে দুটো অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। বিদেশি প্রভাবের কারণে সরকার এইভাবে নির্বাচন করার সাহস পেয়েছে। আজকে বিদেশিরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে এজেন্ডা নিয়ে এসেছে বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপ, আমি মনে করি বাংলাদেশের বহু মানুষ তা স্বাগত জানাবে। কারণ আমরা ভোটাধিকার পাই না। আমি আমার ছাত্রদের জিজ্ঞেস করি তোমরা কী ভোট দিয়েছো? ওরা হাসে। আমাদের সংবিধান আমাকে ভোটাধিকার দিয়েছে, রাষ্ট্রের মালিকানা দিয়েছে। এই মালিকানা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।

এখানে যদি বিদেশিরা হেল্প করে সমস্যা কী? যদি সেটাই তাদের নিয়ত হয়ে থাকে। যাদের আমেরিকা বা ইউরোপের খবরদারি পছন্দ হয় না; ফাইন, আপনি তাহলে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বসেন। বসে আপনারা একটা নির্বাচনকালীন সরকার যেটার প্রতি সবার আস্থা আছে সেরকম একটা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তাহলে তো বিদেশিরা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে না। আর সরকার যদি বিদেশি বলতে শুধু আমেরিকা বা ইউরোপকে বোঝায়, আর যদি বিদেশি বলতে চীন আর ইন্ডিয়াকে না বোঝায়, তখন তো মানুষের মনে সন্দেহ আসবে।

জাতীয় সংকটে বুদ্ধিজীবীদের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?
আসিফ নজরুল: বুদ্ধিজীবী বলতে কাদেরকে বোঝাবেন? এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী আছে যাদের হৃদয়ে বাকশাল। আমি বলি তারা আওয়ামী লীগেরও সাপোর্টার না। বাকশাল মানে হচ্ছে আওয়ামী লীগই থাকবে, অন্য কোনো দল যাতে জনগণের ভোটাধিকার নিয়েও ক্ষমতায় আসতে না পারে। এই অংশ নির্বাচনের নামে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করছে। এবং এর বিনিময়ে বিভিন্ন বেনিফিটও গ্রহণ করছে। আরেক অংশ ভয়ে চুপচাপ হয়ে আছে। আরেক অংশ কথা বলছে। সকল বিপদ, সকল ঝুঁকি, সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি অবশ্যই মনে করি ভূমিকা রাখছে। এখনকার এই সময় সোশ্যাল মিডিয়া আছে, যে যত বড় বুদ্ধিজীবী নিজেকে মনে করে জনগণ কিন্তু আপনাকে দেখছে। জনগণ কিন্তু তার মতামত ব্যক্ত করতে পারছে। জনগণ যদি দেখে জনগণের অর্থনৈতিক অধিকারের পক্ষে কেউ দাঁড়ায় নাই, গুমের বিপক্ষে দাঁড়ায় নাই, ব্যাংক লুটপাটের বিপক্ষে দাঁড়ায় নাই, শেয়ারবাজার লুটপাটের বিপক্ষে দাঁড়ায় নাই, বিদেশে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, এটার বিপক্ষে দাঁড়ায় নাই- অবশ্যই জনগণ তাদের ঘৃণা করবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা করা নিয়ে ১৬০-এর বেশি বিশ্বনেতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

আসিফ নজরুল: এই দেশে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটা ব্যক্তি সম্পর্কে অনবরত বিষোদ্গার করা হয়। গত ১০-১২ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ, অপবাদ দেয়া হচ্ছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে উনার বিরুদ্ধে যে বিচার কাজগুলো চলছে সেই বিচার কাজে কতোটা সুষ্ঠু এবং কতোটা নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে- এটা তো সহজেই অনুমেয়। পত্রপত্রিকায় দেখলাম ১৮ জন ব্যক্তি মামলা করেছে। তারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন ২০০৭ সালের আগে। ১৬ বছর পর হঠাৎ করে যখন ড. ইউনূসের পক্ষে বিভিন্ন লোকজন দাঁড়িয়েছে, বলছেন ওনার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে। হঠাৎ করে এই লোকগুলো ১৬ বছর পর মামলা করলো কেন শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে? বাংলাদেশে কতো গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি আছে, কতো শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে আমরা শ্রমিকদের বিভিন্ন শোষণের কথা শুনি। কেউ কখনো মামলা করে না। হঠাৎ করে ১৮ জন লোক যাদের ১৭ বছর ধরে চাকরি নাই-একসঙ্গে মামলা করলো কেন? মানুষ কি বোকা নাকি? মানুষ এগুলো বোঝে না? আইন যদি নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করেন এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘উনি এটা করেছেন’ বলে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অব্যাহত প্রচারণা ও বিষোদ্গার শুরু করেন, তত সহজেই অনুমেয় যে টার্গেট করে ওনাকে মামলাগুলো দেয়া হচ্ছে।মানবজমিন

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com