কেন ‘টার্গেটে’ এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:১৯, বৃহস্পতিবার, ২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১১ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

কেন ‘টার্গেটে’ এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, মে ২৭, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, মে ২৭, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব তরুণ নেতা দ্রুত আলোচনায় এসেছেন, তাদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও রয়েছেন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে তার ওপর হামলা, ডিম নিক্ষেপ এবং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গত ২২ মে ঝিনাইদহে তার ওপর হামলার ঘটনার পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে— বারবার কেন তার ওপরে হামলা হচ্ছে। তাকে টার্গেট করার নেপথ্যে কোনও কারণ আছে কিনা?

প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ‘তীর্যক’ ও ‘আক্রমণাত্মক’ বক্তব্য

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর থেকে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির তীব্র সমালোচনা করে আসছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার দল এনসিপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ সমালোচনা করে তিনি ভোটারসহ দেশের মানুষের দৃষ্টি কাড়েন। বিভিন্ন জেলা সফর ও রাজনৈতিক সভায় তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও আরেক শীর্ষ নেতা সালাহউদ্দিন আহমদসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকে উদ্দেশ করে চাঁচাছোলা ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছেন।

বিএনপির শীর্ষ ও হেভিওয়েট নেতাদের নিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর তীর্যক মন্তব্য দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। তাদের দাবি, পাটওয়ারী ‘কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও উসকানিমূলক বক্তব্য’ দিচ্ছেন। এ কারণেই ঝিনাইদহে তিনি সরাসরি ‘জনরোষ’ বা হামলার শিকার হয়েছেন।

বিএনপির সঙ্গে যেভাবে দ্বন্দ্ব শুরু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সেখানে তিনি বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে লড়ে ৫৪ হাজার ১২৭ ভোট পান এবং প্রায় ৫ হাজার ২৩৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। পাটওয়ারীর অভিযোগ, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রথম নির্বাচনে একজন তরুণ প্রার্থীর এমন শক্ত অবস্থান ঢাকার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত একটি বড় দলের জন্য প্রচ্ছন্ন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মির্জা আব্বাস নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘‘তারা এত ভোট কীভাবে পেলো।’’ রাজনৈতিক ক্ষমতার এই সরাসরি দ্বন্দ্ব এবং ভোটের মাঠের রেষারেষি তাকে প্রতিপক্ষের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে মনে করেন অনেকে।

নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও দমে যাননি এই তরুণ নেতা। একপর্যায়ে ঘোষণা দেন— তার দল বিএনপি বা অন্য কোনও বড় রাজনৈতিক ব্লকের ছায়াতলে যাবে না। বরং তরুণ ও নতুন দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক জোট বা অ্যালায়েন্স গড়ে তুলতে চান। যদিও পরে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরীক হয় এনসিপি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ এমনিতেই বেড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরেও তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ছিল। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি কার সঙ্গে জোট করবে— সেদিকে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোরও নজর ছিল।

বাংলাদেশের দ্বিমুখী বা প্রথাগত রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের চেষ্টা সবসময়ই প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তরুণদের এই নতুন শক্তিকে শুরুতেই রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা বা কোনঠাসা করার কৌশলগত চেষ্টা প্রতিপক্ষের দিক থেকে ছিল বলেও মনে করেন অনেকে। নির্বাচনের আগেও এনসিপিকে নিবন্ধন ও প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে আন্দোলন করতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে এনসিপির অন্যান্য নেতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক

শুধু রাজনৈতিক দল নয়, বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের নিয়েও মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে জুনায়েদ বাবুনগরীকে নিয়ে তার একটি মন্তব্যকে ঘিরে বাবুনগরীর অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জেরে বায়তুল মোকাররম এলাকায় তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছিল। যদিও তিনি সেই বিক্ষোভ সমাবেশে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয়— দুই ক্ষেত্রেই তার সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক অবস্থান তাকে বহুমাত্রিক টার্গেটে পরিণত করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সরকারের সমালোচনা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া

ঝিনাইদহে নিজের ওপর হামলার ঘটনার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করে স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ তার বক্তব্যকে ‘উসকানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে ঘটনাগুলোকে ‘জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কালচারের বাইরে গিয়ে আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ভাষা, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ এবং ভোটের মাঠে নতুন শক্তির উত্থান— এই তিন কারণেই তিনি এখন রাজনৈতিক টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। আবার কেউবা মনে করেন, রাজনীতিতে আলোচনায় থাকার জন্যই নাসীর এসব করে থাকেন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য

কেন বারবার বিতর্কে জড়াচ্ছেন, হামলার শিকার হচ্ছেন— এমন প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি সবসময় সরাসরি কথা বলি। কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলি না। অন্যায়ের সঙ্গে আগে যেমন আপস করিনি, ভবিষ্যতেও করবো না। সম্ভবত এ কারণেই আমাকে টার্গেট করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘আমি সীমান্ত হত্যা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, মাদক ও ইয়াবা সমস্যা, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি এবং ন্যায়বিচার নিয়ে কথা বলি। একইসঙ্গে সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং গণভোটের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাওয়ার বিষয়েও কথা বলেছি। এসব কারণেই আমাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে চাপ ও হামলা চালানো হচ্ছে।”

তার অভিযোগ, সরকার একটি ‘রক্ষীবাহিনীর’ ভূমিকায় নেমেছে। ‘‘প্রতিনিয়ত আমাদের ওপর আঘাত আসছে। কিন্তু তারপরও আমরা মাঠে আছি। আমাদের শেষ করে দেওয়াই হয়তো তাদের শেষ অপশন। তারপরও আমরা আপস করবো না, যদি সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা হয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, বিচার এবং সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির প্রশ্নে কোনো কম্প্রোমাইজ হবে না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের বিরুদ্ধে যদি অন্যায়ভাবে হামলা-মামলা চালানো হয়, তাহলে আমরাও দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত আছি।’’

যা বললেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল

এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হলেন— জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক টার্গেটিংয়ের বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, এর সঙ্গে জড়িত আছে এনসিপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানও।’’

তার ভাষায়, ‘‘এখানে শুধু ব্যক্তি নাসীর গুরুত্বপূর্ণ না, গুরুত্বপূর্ণ হলো এনসিপি। আগে থেকেও তারা বিভিন্ন কথা বলতো। কিন্তু এখন বিষয়টি বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। কারণ এই মুহূর্তে এনসিপি একধরনের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে ছাত্রদল-যুবদলের মতো সংগঠনগুলো এনসিপিকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে।’’

মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যের ধরনও বড় ভূমিকা রাখছে। তার অনেক বক্তব্য অনেকের কাছে অস্বস্তিকর বা আপত্তিকর মনে হয়। সবাই সেটা পছন্দ করে না। ফলে তাকে আক্রমণ বা টার্গেট করার জন্য একটি অজুহাত তৈরি হয়। মূল বিষয়টা হলো— তার কথাবার্তাকে ব্যবহার করে সেই অজুহাত দাঁড় করানো যায়।’’

তার মতে, ‘‘নাসীরের বক্তব্যে এমন কিছু রাজনৈতিক বা আবেগী উপাদান থাকে, যা সহজেই ‘মব রিঅ্যাকশন’-এর পরিবেশ তৈরি করতে পারে।’’

তিনি বলেন, “‘ভুয়া’ বলাটা শালীন কিনা, সেটাও প্রশ্নের বিষয়। আমরা দেখেছি মিরপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও অনেকে ‘ভুয়া’ বলেছে। এটা আসলে মানুষের ক্ষোভ বা মনের ভাবের প্রকাশ। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না, এভাবে কাউকে সরাসরি ‘ভুয়া’ বলা সৌজন্যমূলক আচরণ।’’

তবে তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজনৈতিক হতাশা বা ক্ষোভ থেকে অনেক সময় মানুষ ভাষায় আগ্রাসী হয়ে ওঠে। ‘‘মানুষ যখন খুব বিরক্ত হয়ে যায়, যখন মনে করে সে আর কিছু করতে পারছে না, তখন গালাগালি বা অপমানজনক ভাষার মাধ্যমে মনের ঝাল মেটানোর চেষ্টা করে।’’

তার মতে, ‘‘পুরো পরিস্থিতি বুঝতে হলে দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে— একদিকে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান, অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যের ধরন।’’

মাসুদ কামাল বলেন, ‘এনসিপিতে আরও অনেকে আছেন, অনেকেই সমালোচনামূলক কথা বলেন। কিন্তু সবাই একইভাবে টার্গেট হন না। এখানে দুটি বিষয় মিলেই একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।’’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ