খাল খনন কর্মসূচি ও শহীদ জিয়ার ‘সবুজ বিপ্লব’ - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ১০:১৯, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৯ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

খাল খনন কর্মসূচি ও শহীদ জিয়ার ‘সবুজ বিপ্লব’

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, মার্চ ১৭, ২০২৬ ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, মার্চ ১৭, ২০২৬ ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ

 

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, খাদ্যঘাটতি, প্রশাসনে অস্থিরতা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে নবীন রাষ্ট্রের সামনে ছিল পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কৃষি খাত ছিল বিপর্যস্ত। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল বিশ্বের নিম্নতমগুলোর একটি।

সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তববাদী, উৎপাদনমুখী এবং আত্মনির্ভর উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিল—ক্ষুধামুক্তি, দারিদ্র্য হ্রাস, উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘সবুজ বিপ্লব’ ছিল সত্তরের দশকের শেষের দিকে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে গৃহীত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

সবুজ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি খাল খনন কর্মসূচি, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সার ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি নিজে খাল খনন কর্মসূচি তদারকি করেন। এই কর্মসূচির প্রধান দিক ছিল তিন হাজার ৬৩৬ মাইলের বেশি খাল খনন ও পুনঃখনন, যার মধ্য দিয়ে সেচব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়।
বৃষ্টির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সেচ সুবিধার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমেও ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখেন কৃষকরা। এ ছাড়া খালগুলো শুধু সেচের উৎসই ছিল না, ছিল মাছ চাষের উপযুক্ত আবাসস্থলও। খাল খনন কর্মসূচিতে স্থানীয় মানুষকে সরাসরি যুক্ত করার মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরি হয়। শহীদ জিয়ার সেই সবুজ বিপ্লবের ধারাবাহিকতা রক্ষায় খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন।

গতকাল সোমবার ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খননের মাধ্যমে ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন তারেক রহমান। প্রথম দিনই ৫৪টি জেলায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশে অগভীর নলকূপ ও গভীর নলকূপ স্থাপনের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ১৯৮০ সালের মধ্যে সেচের আওতাভুক্ত জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উন্নত জাতের ধান, সার ও কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়া হয়। কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ সহজলভ্য করা হয়। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। খাদ্য উৎপাদন বাড়তে শুরু করে এবং কৃষি অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেছিল। একইভাবে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান বাংলাদেশের উন্নয়ন রাজনীতির বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, কৃষি উৎপাদনের পুনরুদ্ধার ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

জিয়াউর রহমান শুধু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেননি, তিনি গ্রামীণ উন্নয়নকে একটি সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি গ্রামে নিহিত। সেই কারণে তিনি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

গ্রামে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের মাধ্যমে বাজারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন তিনি। এ সময় অনেক এলাকায় নতুন হাটবাজার গড়ে ওঠে। এতে কৃষিপণ্য বাজারজাত সহজ হয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সক্রিয় করার মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, জিয়াউর রহমানের সময়ে গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রশাসন সক্রিয় করার উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। তিনি মনে করতেন, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন চিন্তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক কাঠামো অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একটি কার্যকর প্রশাসন প্রয়োজন ছিল। এই বাস্তবতা বিবেচনা করে তিনি প্রশাসনের মধ্যে জবাবদিহি এবং দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। তাঁর ধারণা ছিল, উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ অপরিহার্য।

জাতীয় নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রেও তিনি একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকে তিনি অগ্রাধিকার দেন। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং প্রতিরক্ষাকাঠামোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রেও তিনি একটি নতুন ধারণা সামনে আনেন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এর লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হয়। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ পান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় থেকেই বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।

এ সময় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া সহজ হয়। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেন। শিল্প খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশে গুরুত্ব দেন। এর ফলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হতে থাকে। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তববাদিতা এবং কর্মমুখী চিন্তা। তিনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব কাজে বেশি গুরুত্ব দিতেন। প্রশাসনের মধ্যে কর্মসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে তাঁর শাসনামল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। উন্নয়ন, শৃঙ্খলা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগগুলো দেশের উন্নয়নের ধারায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকরা প্রায়ই উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি গঠনে এ সময়ের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুযোগ সৃষ্টি—এসব বিষয় পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

এ কারণেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রনীতি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনো বিস্তৃত আলোচনা ও গবেষণা হয়। ক্ষুধামুক্তি, দারিদ্র্য বিমোচন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ

পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ