গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রযুক্তির বিভ্রান্তিকর নিয়ন্ত্রনঃ বাংলাদেশের নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী প্রভাবও মিথস্ক্রিয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, মে ২৩, ২০২৬ ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, মে ২৩, ২০২৬ ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬। এ নির্বাচনের প্রচার ও প্রচারণায় যতটা না ছিল গতানুগতিক, তারচেয়ে বেশি ছিল নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার কৌশল । অর্থাৎ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রয়াস ছিল উল্লেখ করার মতো । বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজ নিজ দলীয় আদর্শ, ইশতেহার, কৌশল, প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কৌশলের যুক্তি খন্ডন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয় সমুহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছে মেছো স্টাইলে( Macho Style)। যা বাংলাদেশের অন্য কোনো নির্বাচনে এত ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়নি ।মোট কথা প্রযুক্তি ও গণতন্ত্র আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্হায় একটি সৃজনশীল পদ্ধতি এবং কার্যকর রাজনৈতিক চলকের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মূলত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন শুধুমাত্র গতানুগতিক ও বাহ্যিক যোগাযোগের মধ্যে আর সীমিত নয়।কারণ সেই প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার ও কার্যকারিতা রাজনৈতিক বিপ্লবের দুয়ার উন্মুক্ত করেছে। উদাহরণ হিসেবে ফেসবুক, টুইটার, টিকটক, মেসেজিং, ভিডিও, ডিজিটাল ক্যাম্পপেইন, হ্যাশট্যাগ, এআই, ও বিগ ডাটার ব্যবহারে রাজনৈতিক জনমতের দ্রুত প্রতিফলন ও পরিবর্তন ঘটছে। ফলশ্রুতিতে সরকারের স্হিতিশীলতায় এসব সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব গণতন্ত্রকে ডিজিটাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্হার রূপ ধারণ করেছে।তাই বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গণতন্ত্র ও প্রযুক্তি রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে ।
পর্যবেক্ষণীয় বিষয় হিসেবে মার্টিন মুরের (Martin Moore) ডেমোক্রেসি হ্যাকড ( Democracy Hacked) বইয়ের দি ফেইসবুক ইলেকশনস (The Facebook Elections) অধ্যায়ের একটি বিশ্লেষণ আলোচনা করা যায়। ২০১৬ সালের মে মাসে ফিলিপাইনের জাতীয় নির্বাচনের সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ফেসবুকে নির্বাচনের প্রচারণার রডরিগো দুতার্তে প্রেসিডেন্ট পদেপ্রার্থী হিসেবে ছিলেন একেবারে নতুন ও অপরিচিতমুখ। তাছাড়া তার কোন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের (Political Legacy) পটভূমি ও ছিল না।কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রচার ও প্রচারণার মধ্যে ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার যা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ব্যর্থতা জনমনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে।অর্থাৎ তার প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক এলিটদের ব্যর্থতা বিশেষ করে মাদক চোরাচালানের মতো সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়সমূহ জোরালোভাবে উপস্থাপন ছিল তার অন্যতম রাজনৈতিক কৌশল। পাশাপাশি দুতার্তের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক প্রচার চালানো হলে মূহুর্তের মধ্যেই তার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো । উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রিনী জুলিয়েনা কারুন্নুনগান (Renee Julienee Karunnungan) নামে একজন ভদ্র মহিলা ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন, নির্বাচনে দুতার্তে একটি দুর্বল পছন্দ (Duterte is a lazy choice)।কিন্তু তার পোস্টের জন্য মুহূর্তের মধ্যেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দুতার্তের অনুসারীরা তাঁকে ধর্ষনের এবং হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয় । পরবর্তীতে তিনি থানায় জিডি করতে বাধ্য হন! সুতরাং এটা হল প্রযুক্তির পার্শপ্রতিক্রিয়া, যার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে যেমন সুরক্ষিত ও প্রসারিত করা যায়। তেমনিভাবে নিয়ন্ত্রন এবং অস্থিতিশীল ও করা যায়। মূলত দুতার্তে পর্যবেক্ষণ করেন ফিলিপাইনের প্রায় অর্ধেক নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং বিশাল জনগোষ্ঠীকে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দুর্নীতিবিরোধী বার্তা ও দেশের অবকাঠামোর পূনঃনির্মান করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন।আর কৌশল হিসেবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, যেমন ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির ব্যবহার তার পক্ষে প্রচারণা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। ফিলিপিনো নিউজ আউটলেট র্যাপলার (Rappler) রিপোর্ট করে চারশো থেকে পাঁচশো ডিজিটাল কিংবা সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন চ্যানেলে দুতার্তের পক্ষে কাজ করেছেন এবং প্রতিটি চ্যানেলের সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন তিনশো থেকে সর্বোচ্চ আট লক্ষাধিক পর্যন্ত ছিল ।এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি গ্রুপের নাম দেন “Duterte Warrior ”। মূলত এই গ্রুপের সদস্যরা ছিল দুষ্ট ও আক্রমণাত্মক । তারা মূলত দুতাতার্তের পক্ষে এবং তার বিরোধী দলের বিভিন্ন নীতিও কৌশলসমূহ ফেসবুক, টুইটারে, হ্যাশট্যাগ কিংবা ম্যাসেজের মাধ্যমে দুতার্তের পক্ষে রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে । এমতাবস্থায়, শেষ পর্যন্ত তিনি অপ্রত্যাশিত ভূমিধস জয় লাভ করেছেন বটে কিন্তু গণতান্ত্রিক যাত্রায় দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারেননি । যদিও সেই একই প্রক্রিয়ায় , ২০১৪ সালে ভারতের নরেন্দ্র মোদি, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প এবং ২০১৭ সালে ইমানুয়েল ম্যাক্রন ক্ষমতায় আসেন।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে বলা যায়, ২৪ শের গণঅভ্যুত্থানে ও তৎপরবর্তী সময়ে সোশাল মিডিয়ার কার্যকর ভূমিকা প্রতিফলিত হয়েছে।যার মাধ্যমে মানুষের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর দ্রুত প্রভাব বিস্তার লক্ষণীয়। কেননা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি।যার ফলশ্রুতিতে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ভেঙে যখন অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলো, তখন ও সরকারকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক গোষ্ঠী কৃত্রিম জনমত সৃষ্টি করে রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে! যার কারণে স্বৈরাচার পরবর্তী সরকার তার শাসনামলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা অর্জন করতে পারেনি। আর রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা জন্য প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বা অপব্যবহার অনেকাংশে দায়ী । সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনেও মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার- প্রচারণা রাজনৈতিক তরঙ্গের ঢেউ ছিল ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মতো সাংঘর্ষিক।আর এ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির বিভিন্ন ব্যবহার করে বিশেষ করে ফেসবুক, এ আই, টিকটক, ইউটিউবে ব্যাপক ভুয়া প্রচারণা কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রকৃত জনপ্রতিনিধি বাছাই করার ক্ষেত্রে অসত্য জনমত তৈরি করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে “ডিপ ফেইক বা কৃত্রিম জনমতের মাধ্যমে “(Deep Fake) গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে । রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কৃত্রিম জনমত প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছে ।ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান এ সময়কে প্রযুক্তিগত সংকটকাল (Technologically Critical Juncture) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।এখানে কৃত্রিম জনমত বলতে বুঝায় যে সমস্ত বিষয়সমূহ অসত্য কিন্তু প্রযুক্তির এলগোরিদমের সহায়তায় বিভিন্ন ভিডিও, অসত্য সংবাদ তৈরি করে এমনভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বিধাগ্রস্হতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এগুলোর কোন প্রকৃত সত্যতা পাওয়া যায় না তবে জনমনে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খল জনমত সৃষ্টি হয়। নির্বাচন পূর্ববর্তী আরো যে সমস্ত বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলেছে তা হল, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার, সংস্কার নাকি নির্বাচন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামীর নতুন রাজনৈতিক কৌশল, মব সংস্কৃতি, গণভোট এবং সর্বোপরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির ধারাবাহিকতা প্রশ্নে। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রযুক্তির প্রসার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বিগত স্বৈরাচারী সরকারের হাত ধরেই উদ্বোধন হয়েছিল । কারণ স্বৈরাচার সরকারের আমলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য রেজিস্ট্রোর ফেসবুক (ফেবু) ব্যবহারকারী কিন্তু অজানা ব্যবহারকারী (Unknown Users) বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের পক্ষে সোচ্চার থেকে এসব কৃত্রিম জনমত জনমনে বিভ্রান্তি ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে। যার ফলে ঐ সমস্ত অজানা ফেবু ব্যবহারকারীদের জন্য বর্তমানে রাজনীতিতে গুপ্ত কিংবা বট শব্দ গুলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে ।তাছাড়াও রাজনীতিতে দুষ্ট কৌশল ও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপত্তিকর ও অসৌজন্যমূলক ছবি ভাইরাল কিংবা এনসিপির নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর রাজনৈতিক অশালীন, ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং বিদ্রূপ বক্তব্য রাজনৈতিক অপকৌশলের একটি অংশ যা বট ও গুপ্তদের মাধ্যমে ছড়িয়ে একটি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার অপতৎপরতা।এমনকি সমাজের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জঘন্য অপরাধের কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দ্রুত সময়ে নিশ্চিত এবং সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের নিয়ন্ত্রণের অপ্রতুলতাও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে ।তবে সেক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের শিক্ষার দুঃশাসন ও এজন্য দায়ী।
এবার, বেন এনসেল (Ben Ansell) এর Why Politics Fail বইয়ের একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আলোচনা করা যাক। সেখানে তিনি লিখেছেন ১৯৩৬ সালে স্পেনে, বামপন্থী স্পেনীশ পপুলার ফ্রন্ট, কনজারভেটিভ দলকে স্বল্প ব্যবধানে পরাজিত করে । যদিও নির্বাচনের আগে উভয় দলই গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দেন।কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী ডানপন্হী কনজারভেটিভ দল, সরকার দলের প্রতি তাদের সমর্থন তুলে নেন। পরবর্তীতে তা রাজনৈতিক সংকট (Political Deadlock) তৈরি হলে, জেনারেল ফ্রাংকোর নেতৃত্বে স্পেন প্রায় ৩৬ বছর পরিচালিত হয়। সুতরাং পর্যবেক্ষনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক দুষ্কর্মের জন্য রাজনীতির প্লাটফর্ম থেকে ছিটকে পড়েছে । সেখানে ডানপন্হী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সুবিধার বিয়ে ( Marriage of Convenience) হয়েছে, সেক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ভবিষ্যৎ রাজনীতির কৌশল যদি সংসদ থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গণতন্ত্রহীন অন্ধকার যুগ কিংবা আরেকটি গণতন্ত্রের কালো অধ্যায়ের (Black Chapter of Democracy) যুগে প্রবেশ করতে পারে । আর প্রযুক্তির এ যুগে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করতে রাজনৈতিক কূটকৌশল লক্ষণীয়।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে একটি জরিপ আলোচনা করি। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন মোবাইল সংযোগ সক্রিয় ছিলো। একই সময়ের হিসাবে প্রায় ৭৭.৭ শতাংশ ব্যক্তি ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহার করেন এবং তারমধ্যে প্রায় ৪৪.৫ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকেন । এছাড়াও মোট জনসংখ্যার প্রায় মধ্যে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন যা জনসংখ্যার প্রায় ৩৪.৩ শতাংশ।তারমধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ শতাংশ নারী ।(তথ্যসূত্রঃBangladesh’s 13th Parliamentary Election: Confronting the Negative Impacts of AI and Disinformation, AHM Bazlur Rahman,২০২৬)। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ এবং ২০১৬ সালে ফিলিপাইনের প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারী সংখ্যার একটি সাদৃশ্যতা লক্ষ্য করা যায় ।
উপরিউক্ত সমীক্ষার তাৎপর্য হলো, স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় রাজনীতির খুব গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি চলে এসেছে! রাজনৈতিক সমীকরণ এখানে স্পষ্ট, বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা মানে তাদের ক্ষমতা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা! অর্থাৎ জনমনে রডরিগো দুতার্তু স্টাইলে সোশ্যাল মিডিয়ার প্লাটফর্মগুলোর প্রভাব খাটিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে কৃত্রিম জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করে সরকারকে বিভ্রান্ত ও কোণঠাসা করার কৌশল অবলম্বন করবে। কেননা জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সেই রাজনৈতিক সক্ষমতার যথেষ্ট প্রতিফলন ইতিমধ্যে তারা দেখিয়েছেন।সেই জন্যই তারা একদিকে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন ।আবার অন্যদিকে নির্বাচনকে ষড়যন্ত্রমূলক ফলাফল হিসেবেও বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে তারা একই সাথে ডিপ ফেইক নীতি ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল ও বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছেন । অন্যদিকে রাজনৈতিক এ মিথস্ক্রিয়ায় সদ্য সমাপ্ত স্বৈরাচারী শক্তি ও তাদের উন্নয়নের গল্প ছড়িয়ে সরকারের ওপর চাপ ও চ্যালেন্জ ছুড়ে দিচ্ছে।সুতরাং আগামীর রাজনীতিতে বর্তমান সরকারকে জামায়াত ও স্বৈরাচারী শক্তির ডিপ ফেইক নীতির সাথে মোকাবেলা করার সক্ষমতা দেখাতে হবে।তবে স্বৈরাচারী শক্তি যদি উগ্রবাদী পলিসিতে ফিরতে চায়, তাহলে জামাত- বিএনপির মধ্যে বিরোধীতার মধ্যেও ঐক্য গড়ে তুলতে হবে । আবার জামাত ও যদি সেই একই নীতিতে সরকারকে দুর্বল করতে চায়, তাহলে বিএনপি আওয়ামিলীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কিভাবে খুলে দিবে, নাকি এককভাবে মোকাবেলা করবে তা নির্ভর করবে বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সক্ষমতার ওপর। আর রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার এ প্লাটফর্ম তৈরিতে সোশ্যাল মিডিয়ার বহুমুখী ব্যবহারকে বিরোধী শক্তি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে তাতে সন্দেহ নাই । আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতি ব্যর্থতার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক ব্যবস্হার সংকটকে রাজনৈতিক নীতি ও বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করার সক্ষমতার অভাব।শেষত বলা যায় প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন দরকার তেমনি তা প্রয়োগের সুশাসন নিশ্চিত করা আরো বেশি জরুরি। কেননা তা রাজনৈতিক ব্যবস্তার অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে ।
মোঃ শাহজাহান মিয়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতীয় বিতার্কিক।
(বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত )
ই-মেইলঃ shahjahanau.bd@gmail.com
জনতার আওয়াজ/আ আ