জাপায় শীর্ষ নেতৃত্বে চলমান বিরোধের অবসান হয়নি, ফের ভাঙনের সুর - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:৩৯, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জাপায় শীর্ষ নেতৃত্বে চলমান বিরোধের অবসান হয়নি, ফের ভাঙনের সুর

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৩ ২:১৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৩ ২:১৯ অপরাহ্ণ

 

ডেস্ক নিউজ

মে মাসকে ‘সাংগঠনিক মাস’ ঘোষণা করে ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্টির (জাপা) জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি। এরপর জুনে সুবিধাজনক সময়ে প্রতিনিধি সভা করার পক্ষে চূড়ান্ত মত দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ।

গতকাল সোমবার জাপার রওশনপন্থি অংশের এ সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে পাঠানোর মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হলো দলের শীর্ষ নেতৃত্বে চলমান বিরোধের অবসান হয়নি।

রওশন এরশাদ ও জাপা চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরের মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে নেতৃত্বের বিরোধ চলছে। সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে তাদের একই মঞ্চে দেখা গেলেও কার্যত সে বিরোধ মেটেনি। নিজেদের মতো করে দলীয় কার্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তারা। দুপক্ষের অন্তত ১০ জন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রওশন ও জি এম কাদেরপন্থিসহ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক সম্ভাব্য সংসদ সদস্যদের পৃথক পৃথক তালিকা তৈরি করছেন। প্রস্তুতিও আছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার। দলটির নেতারা বলছেন, সরকারের মধ্যস্থতায় সম্প্রতি রওশন ও জি এম কাদেরের মধ্যে বিরোধের পারদ কিছুটা নিচে নামলেও আবারও তা ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থা থাকলে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জাপায় বড় রকমের ভাঙনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

পাশাপাশি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় যে কোনো সময় স্থগিত করা কেন্দ্রীয় সম্মেলনের ডাক দিতে পারেন রওশন। আগামী মে অথবা জুনের মধ্যে সম্মেলনের আভাসও দিয়েছেন একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। চলমান পরিস্থিতিতে রওশন-জি এম কাদের দুই নৌকায় পা রেখেছেন দলের শীর্ষ নেতারা। সকালে রওশনের কাছে হাজিরা দিলে, বিকেলে দেন জি এম কাদেরের কাছে। দুজনের মনই জয় করে চলার চেষ্টা করছেন কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। বিশেষ করে সংসদ সদস্যরা এ ব্যাপারে বেশি সোচ্চার।

পার্টির একাধিক সংসদ সদস্য কালবেলাকে জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাপার অবস্থান, ভাঙন বা ঐক্য পুরোটাই সরকারের ওপর নির্ভর করছে। শেষ পর্যন্ত দেবর-ভাবির মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে, যে কোনো একটি পক্ষ শক্তিশালী হবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের গুড বুকে রয়েছেন রওশন।

আর সময়ের অপেক্ষায় আছেন জাপার কেন্দ্রীয় নেতারও। যে বেশি শক্তিশালী হবেন, তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়ে পূর্ণ সমর্থন জানাবেন। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে জি এম কাদের শক্তিশালী হলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের খুব একটা পাশে পাবেন না। এ অবস্থায় দল আরও বেশি দুর্বল হওয়ায় পাশাপাশি জনসমর্থন কমার শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন পার্টির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা।

সব মিলিয়ে বিরোধ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না জাতীয় পার্টির। ত্রিধারায় বিভক্ত দলটিতে কখনো দেবর-ভাবি, কখনো চাচা-ভাতিজা আবার কখনো পদ-পদবি ও অর্থকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। আর এসব দ্বন্দ্বের মূল চরিত্রে থাকেন দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। সেখানে আবার মাঝেমধ্যে হাজির হন দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছেলে এরিক এরশাদ ও তার মা বিদিশা সিদ্দিক। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, এসব নিয়েই দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া দলটি।

দলের নেতারা বলছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রওশন এরশাদ ও বিদিশা সিদ্দিকের মধ্যে একটা মিল রয়েছে। এ দুজনই নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আনুকূল্য পেতে চায়। আর জি এম কাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজের অবস্থান ঠিক করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

জি এম কাদের জানিয়েছেন, তারা এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবার ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে। তালিকাও তৈরি হচ্ছে। সামনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সিটি নির্বাচনের পর এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান তিনি।

আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমামও। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জোটগত নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জোটগত নির্বাচন করলে আমরা সবসময় উন্নয়নের পক্ষের শক্তির সঙ্গেই আছি। ঈদের পর দলের প্রেসিডিয়ামের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দলের করণীয় ঠিক করা হবে।

ঈদের পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান-আমেরিকা সফরের পর, আগামী নির্বাচন কতটা সরকারের আনুকূল্যে থাকবে সে সম্পর্কেও পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যাবে। তখন পরিস্থিতি বলবে—সরকারের সঙ্গে থাকব, নাকি ভিন্ন চিন্তা করব। আর সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে জি এম কাদের তার রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করবেন। তবে মুখে বিরোধিতা করলেও এখন পর্যন্ত তিনিও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।

আর রওশন এরশাদের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বের সমাধান কোন পথে হবে সেটিও ঈদের পরে ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছেন জি এম কাদেরপন্থিরা। তারা বলছেন, রওশন এরশাদের সঙ্গে জি এম কাদেরের নিয়মিত কথা হয়। তার পক্ষ থেকে অনেক সুপারিশ আসে–যেগুলো জি এম কাদের মেনে চলছেন। এরপর রওশনপন্থি হয়ে যারা দ্বন্দ্ব তৈরি করে রাখছেন, তাদের বিষয়টিও দলের প্রেসিডিয়াম সভা ডেকে সুরাহা করা হবে। তবে, রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত যাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের কাউকে ফিরিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছেন জি এম কাদের।

এ প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে জাপা নির্বাচনে অংশ নেবে এমন কথা রওশন এরশাদ বলেছেন কি না, আমি জানি না। তবে তার সঙ্গে যারা আছেন, তারা কেউ জাতীয় পার্টির না। তারা পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। যারা জাতীয় পার্টির নাম ভাঙিয়ে এসব কথা বলছেন, তাদের বিষয়ে আমরা যাচাই-বাছাই করছি, আইনগত ব্যবস্থা নেব।

এদিকে পার্টির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রওশন এরশাদের মুখপাত্র কাজী মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ম্যাডাম আগের চাইতে অনেক সুস্থ। তিনি রাজনীতির জন্য আগের চাইতে এখন অনেক বেশি ফিট। দলকেও সংগঠিত করা হচ্ছে, নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির যেসব নেতারা এখন জি এম কাদেরের সঙ্গে আছেন, তারাও রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন বলে উল্লেখ করে মামুন বলেন, পার্টির যারা সংসদে আছেন, তারা সবাই চান বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে। সেই লক্ষ্যে ম্যাডাম কাজ করছেন।

রওশন এরশাদের সঙ্গে যারা আছেন, তারা কেউ জাতীয় পার্টির নন, তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে–জি এম কাদেরের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মামুন বলেন, আমরা দল ত্যাগ করিনি। স্বেচ্ছাচারিতার কারণে জাতীয় পার্টি থেকে ৪ বার বহিষ্কার করা হয়েছে জি এম কাদেরকে। ম্যাডামের নির্দেশে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি স্থগিত করেছিলাম। এখন তার নির্দেশে সম্মেলন প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছি। দ্রুত বর্ধিত সভা করা হবে। সেখানে সম্মেলনের তারিখ ঠিক হবে।

অন্যদিকে বসে নেই এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিকও। ২০১৭ সালের এরশাদ ঘোষিত ৫৮ দলীয় সম্মিলিত জাতীয় জোটের চেয়ারম্যান তিনি। এই জোটকে নিয়ে সরকারের সঙ্গে থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদিশা সিদ্দিক বলেন, সারাদেশে ৪৭টি জেলায় কমিটি আছে। সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে জেলা সফরে নামব। আগামী সংসদ নির্বাচনে ১০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার টার্গেট রয়েছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

রওশনপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত জাপার সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার খান বলেন, রওশন এরশাদের নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তার নেতৃত্বে আগামী দিনে দল এগিয়ে যাবে। বঞ্চিত নেতারা সবাই মূল দলে সম্মানের সঙ্গে জায়গা পাবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ