জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য ও এনসিপি’র রাজনৈতিক বিভ্রান্তি - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ১০:২৫, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৯ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য ও এনসিপি’র রাজনৈতিক বিভ্রান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ১:১৫ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫ ১:১৫ পূর্বাহ্ণ

 

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে। এই মুক্তিযুদ্ধ কেবলই একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার প্রশ্ন ছিল না; ছিল একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের প্রকাশ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম শুধু একটি মানচিত্র পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল অস্তিত্বের লড়াই। জনগণ নির্দিষ্ট একটি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। এই আকাঙ্ক্ষাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি।

শোষণের বিরুদ্ধে আর অধিকারের পক্ষের এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ১৯৭১ সালে জামায়াত স্বাধীনতাকে সমর্থন করেনি; বরং তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এটি নিছক রাজনৈতিক মতভেদ ছিল না, বরং স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট বিরোধী অবস্থান। জামায়াত যে-অবস্থান নিয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তাকে সরাসরি অস্বীকার করা। কোনো রাজনৈতিকশক্তি যখন একটি রাষ্ট্রের ভ্রূণলগ্নে তার প্রাণের স্পন্দনকে রুদ্ধ করতে চায়, তখন সেই শক্তি রাষ্ট্রটির মূল কাঠামোর সঙ্গে একীভূত হতে পারে না।
ফলে জামায়াতের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। তারা কখনোই ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী ভূমিকার জন্য রাষ্ট্রীয় বা নৈতিকভাবে পূর্ণ দায় স্বীকার করেনি, কিংবা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সুস্পষ্ট আত্মসমালোচনামূলক অবস্থান নেয়নি। তাই ইতিহাসের দায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই মুছে যায়-এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়। এই অভ্যুত্থান কেবল একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটায়নি, বরং ছিল পুরনো সব অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত এক ঘোষণা। এনসিপি এই অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া একটি শক্তি। তাদের দর্শন ছিল নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উচ্ছেদ। কিন্তু জামায়াতের মতো ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাহীন শক্তির সঙ্গে ঐক্য করার অর্থ হলো-সেই সত্যকে ‘নির্বাচনী কৌশলে’র কাছে বিসর্জন দেয়া। এটি রাজনীতির একটি ‘ট্র্যাজিক প্যারাডক্স’- যেখানে নতুন শক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সেই পুরনো আবর্জনাকেই আলিঙ্গন করে।

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা এনসিপি’র নৈতিক শক্তিকেই দুর্বল করে। যে-রাজনৈতিকশক্তি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ঐতিহাসিকভাবে অস্বীকার করে, তার সঙ্গে ঐক্য মানে-সেই আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে আপস করা। এতে এনসিপি ইতিহাসের দায় থেকে মুক্ত হয় না; বরং সেই দায়কে নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। তাদের এই অবস্থানকে একটি দার্শনিক-দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে। একদিকে যেখানে ক্ষমতা দখল বা সংহতির জন্য যে-কারও সঙ্গে জোট বাঁধা বৈধ মনে করা হচ্ছে, অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক কাজ কেবল তখনই সঠিক হয়, যখন তা সর্বজনীন একটি নৈতিক আইন মেনে চলে। জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য এনসিপিকে একটি ‘শর্ট-টার্ম গেইন’ বা সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ‘কালেক্টিভ মেমোরি’ বা ‘যৌথ স্মৃতি’র সঙ্গে প্রতারণা। যদি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধের জন্য ক্ষমা না চাওয়া একটি শক্তির সঙ্গে জোট করা যায়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করার নৈতিক পথও প্রশস্ত হয়।

রাষ্ট্র গঠনে রাজনৈতিকদল কেবল সংখ্যার হিসাব বা নির্বাচনী কৌশলের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি যৌথ ঐতিহাসিক স্মৃতি ও নৈতিকভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধ সেই ভিত্তির কেন্দ্রবিন্দু। এনসিপি’র যুক্তি হতে পারে-বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঐক্যের সীমা কোথায়? ইতিহাস ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করে গড়া ঐক্য টেকসই হয় না; বরং তা ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকট তৈরি করে। নতুন বাস্তবতার রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হলে প্রথমে পুরনো বাস্তবতার অন্যায়গুলোর সঙ্গে স্পষ্ট বিচ্ছেদ ঘটাতে হয়। এনসিপি যদি একটি নতুন ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ চায়, তবে তাকে অবশ্যই শক্তিশালী নৈতিকঅবস্থান গ্রহণ করতে হবে। পুরনো ব্যবস্থার অংশীদারদের নিয়ে নতুন ব্যবস্থা গড়া যায় না। এটি অনেকটা পুরনো দুর্গন্ধযুক্ত ভিতে নতুন প্রাসাদ গড়ার মতো। এতে প্রাসাদের জৌলুস বাড়লেও ভিতের পচন দূর হয় না।

পরিশেষে বলা যায়, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি’র এই মিলন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক মেরূকরণ নয়; এটি একটি ‘আদর্শিক আত্মসমর্পণ’। রাজনীতি যখন কেবল সংখ্যার খেলায় পরিণত হয় এবং ইতিহাসকে যখন ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই রাজনীতি আর মুক্তির পথ দেখাতে পারে না। এনসিপিকে বুঝতে হবে-ইতিহাস কোনো মৃত অতীত নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত আদালত। সেই আদালতে দাঁড়ানোর মতো নৈতিক মেরুদণ্ড যদি কোনো দলের না থাকে, তবে তারা নতুন বাংলাদেশের স্থপতি হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগটি হারাবে।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees @gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ