টিকাসংকটে বাড়ছে শিশুমৃত্যু হাম প্রাদুর্ভাবের পেছনে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভাঙন - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১০:৪১, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

টিকাসংকটে বাড়ছে শিশুমৃত্যু হাম প্রাদুর্ভাবের পেছনে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভাঙন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, এপ্রিল ৩, ২০২৬ ৩:০৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, এপ্রিল ৩, ২০২৬ ৩:০৯ অপরাহ্ণ

 

বিশেষ প্রতিনিধি
ছবি সংগৃহীত
রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন কেরানীগঞ্জের সোহেল মিয়ার ৬ মাসের কন্যাশিশু মরিয়ম। ছবি: মাসুদ মিলন

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু একটি সংক্রামক রোগের বিস্তার নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন–এমনটাই বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গত এক বছরে স্বাস্থ্য খাতে নীতিগত অস্থিরতা, টিকাসংকট, কর্মসূচি স্থবিরতা এবং জনবলসংকট মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের সেক্টর কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করা। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা এই কাঠামোর মাধ্যমে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, পুষ্টি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কিন্তু ২০২৪ সালে আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিকল্প কোনো কাঠামো ছাড়াই এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পর্যন্ত এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

এই স্থবিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে। ইতোমধ্যে দেশের বহু এলাকায় নিয়মিত টিকা সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের আন্দোলনের কারণে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইপিআই কেন্দ্র বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা হামসহ অন্য সংক্রামক রোগের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রয়োজনীয় টিকার মজুত কমে যাওয়া, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং নীতিগত জটিলতায় সময়মতো টিকা সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। ফলে শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড়সংকট তৈরি হয়েছে জনবল ব্যবস্থাপনায়। অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যবস্থাপনায়।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অসন্তোষ ও আন্দোলন। দীর্ঘদিন বেতন বন্ধ থাকা, বেতন বৈষম্য এবং পদমর্যাদার দাবি নিয়ে স্বাস্থ্য সহকারী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা আন্দোলনে নেমেছেন। এতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যার ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।

ওপি বন্ধের কারণে শুধু টিকাদান নয়, যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও শিথিল হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট জনবল বেতন না পেয়ে কর্মবিরতিতে যাওয়ায় এসব রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। এতে ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগের বিস্তার আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও সংকট দেখা দিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা, জ্বালানি সরবরাহ, এমনকি হাসপাতালের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়েও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় এন্টিভেনমের সংকট, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জরিপ বন্ধ এবং সচেতনতা কার্যক্রম না থাকা–সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে পরিকল্পনার অভাব ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে গত এক বছরে একটি স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ওষুধ, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ–সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।’

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া না গেলে হামসহ অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব আরও বাড়তে পারে। তারা জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবন, স্বাস্থ্যকর্মীদের সমস্যা সমাধান এবং একটি কার্যকর নীতিগত কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের এই সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়–এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম তালুকদার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারে যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তারা স্বাস্থ্যই বুঝতেন না। ফলে তারা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাটআপ করে দেশের মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে দেন। যার ফলে আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যাদের অযোগ্যতা ও অদক্ষতায় এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ