তিতুমীরে সমন্বয়ক রুপে ফিরলেন ছাত্রলীগের জায়েদ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:৪২, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

তিতুমীরে সমন্বয়ক রুপে ফিরলেন ছাত্রলীগের জায়েদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৪ ১:০৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৪ ১:০৮ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
তিতুমীর কলেজে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দেন রেজায়ে রাব্বী জায়েদ। অতীতে নারী হেনস্থা কিংবা ছাত্রলীগ পরিচয়ে হুমকিসহ নানান অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে সমন্বয়ক পরিচয়ে নতুন করে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন তিনি। কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন জায়গায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে জায়েদের বিরুদ্ধে।

তথ্য মতে, প্রথম বর্ষে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়েই জায়েদ যোগ দেয় তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগে। সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ছাত্রলীগের মিডিয়া উইং হিসেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিতুমীর কলেজের নানা ফেসবুক গ্রুপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপে ছাত্রলীগের প্রচারণা‌ই ছিল তার কাজ। ছাত্রলীগের এই প্রভাবকে পুঁজি করে অপরাধ করেও পার পেয়ে গেছেন বহুবার।

জানা যায়, জায়েদ নিজ বিভাগের এক নারী সহপাঠীর সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে উদ্দেশ্যে মেসেঞ্জার গ্রুপে বিরূপ মন্তব্য করেন। সেই স্ক্রিনশটটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কোন এক অজানা কারণে গ্রুপগুলো থেকে সেটি কেটে দেয়া হয়। এই বিষয়ে সেই নারী শিক্ষার্থী মুঠোফোনে জানান, আমি এই বিষয়ে সিনিয়রদের জানিয়েও কোন সমাধান পাইনি।

জায়েদের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ আসে সাংবাদিককে হুমকি দেয়ার বিষয়ে। জানা যায়, তিতুমীর কলেজের একটি অনুষ্ঠানে নিউজের তথ্য সংগ্রহে যান সেই সাংবাদিক। তথ্য সংগ্রহের সময় জায়েদ সেই সাংবাদিককে ছবি তুলে দেয়ার জন্য আদেশ দেন। পরে সেই সাংবাদিক নাকোচ করলে জায়েদ তার উপর চড়াও হয়। এই বিষয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক বলেন, আমি সেই সময় ক্যাম্পাস রিপোর্টার ছিলাম। ক্যাম্পাসের খবরাখবর গণমাধ্যমে তুলে ধরাই আমার কাজ। দায়িত্ব পালনকালে ছবি তুলে দিতে না চাওয়ায় জায়েদ আমাকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে, তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতি নিয়ে কটুক্তি করে। এক পর্যায়ে মারতে আসলেও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ থাকায় নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা দাবি করে মারার হুমকি দিয়ে চলে যায়।

৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর তিতুমীর কলেজের হলগুলো থেকেও পালিয়ে যায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এরপর তিতুমীর কলেজের ছাত্রীনিবাসে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন জায়েদ। জানা যায়, ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত থাকার কারণে হালিমা নামের এক মেয়েকে সুফিয়া কামাল ছাত্রীনিবাসে না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় হল কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে জায়েদ সেখানেও হস্তক্ষেপের করার চেষ্টা করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী শিক্ষার্থী জানান, ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত সেই মেয়েকে হলে রাখার জন্য জায়েদ সুপারিশ করেন, সুফিয়া কামাল ছাত্রীনিবাসের অন্য আরেক শিক্ষার্থীর কাছে। তবে তার এই সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা জানান, হলে কে থাকবে না থাকবে তা সিদ্ধান্ত নিবে হল কর্তৃপক্ষ ও হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এখানে জায়েদ হস্তক্ষেপ করার কে!

তাছাড়া তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বনলতা বিউটিকে পুলিশে দেওয়া নিয়েও এক নারী সমন্বয়কের ঝামেলায় জড়ান জায়েদ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বনলতা বিউটি যেই অপরাধ করেছে তার প্রেক্ষিতে নারী সমন্বয়ক আফিয়া অর্ণি তাকে পুলিশে দিতে চান। তবে জায়েদ মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়, এক পর্যায়ে জায়েদ আফিয়া অর্ণিকে রাগান্বিত হয়ে ধমক দেয়। এই বিষয়ে সমন্বয়ক আফিয়া অর্ণি বলেন, আমি নিজেও একজন সমন্বয়ক। উনি আমার সাথে এই আচরণ কেন করলো জানি না।

আফিয়া অর্ণি আরও বলেন, আমি একজন সমন্বয়ক হওয়ার আগে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমি আমার ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব চাই না। যারা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন করেছেন, তারা কোনো দলের হওয়ার আগে একজন শিক্ষার্থী। আন্দোলনকারীদের মধ্যে যেমন বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনকারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন তেমনি এর আগে ছাত্রলীগ করতো, পরে পদ অব্যাহতি দিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন। সেই ক্ষেত্রে তারা আমাদের কাছে আমাদের মতোই। তবে কেও যদি আন্দোলনের পর আবার তার দলে ফিরে গিয়ে আমাদের ওপর প্রভাব খাটায় তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমরা অবশ্যই সেটির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। তিনি আরও বলেন, আরও অনেক অনুপ্রবেশকারী আছে। যারা সরকার পতনের সাথে সাথে নিজেদের খোলস পরিবর্তন করছে, তাদের আইনানুগ ব্যবস্থা নিব। যেমন বনলতা বিউটি।

জায়েদ প্রসঙ্গে তিতুমীরের সহ-সমন্বয়ক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, আমি নিজেও একজন সহ-সমন্বয়ক। কখনো এ পরিচয় বহন করিনি। কেননা তাদের কার্যকলাপের সাথে কোন প্রকার মিল দিতে পারছি না। একা একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। বিশেষ করে এই জায়েদ, ওকে নিয়ে এর আগেও সমন্বয়ক গ্রুপে কথা হয়েছে। যেমন: হলের নাম পরিবর্তন, সেটা জায়েদ একা করার কে? এটা নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম গ্রুপে। সেটার উত্তর আজ পর্যন্ত পাইনি। এদিকে সে একা একা নানান কুকর্ম করেই চলছে। আসলে সমন্বয়কের যে মজাটা কোথায় এটাই বুঝছিনা। অতি দ্রুত সমন্বয়ক কমিটি বিলুপ্ত করাটাই ভালো মনে হয়। আমাদের সমন্বয়ক প্যানেলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এই দোয়া রইলো।

এদিকে একাধিক অভিযোগের বিষয়ে জায়েদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে। নারী সহপাঠীর সাথে কটুক্তি ভাষায় কথা বলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই ঘটনাটি ২০১৯ সালের। এখন কেউ উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে সেটাকে সামনে আনার চেষ্টা করছে। আমি আমার বান্ধবীকে তুই তোকারি করে বলেছি মাত্র এবং সেটার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি এখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হইনি। বরং আমাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের ট্যাগ দিয়ে হুমকি এবং হামলা করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জায়েদ বলেন, ছাত্রদল যেন ক্যাম্পাসে মিছিল-শোডাউন না করে সে বিষয়ে আমরা তাদের সাথে কথা বলেছি। তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতিকে নিয়ে করা মন্তব্যের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সাংবাদিক সমিতিকে আমি পকেটে রাখি এমন কোনো মন্তব্য করেছি বলে মনে হয় না। সমিতি ছাত্রলীগ থাকাকালীনও তাদের বিরুদ্ধে নিউজ করেছে।

এদিকে জায়েদ কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নয় জানালেও অতীতে যেমন ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়েছেন, বর্তমানে নিজ সুবিধার্থে বিএনপির পরিচয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন একাধিক শিক্ষার্থী।

একাধিক অভিযোগকারী বলেন, তিতুমীর কলেজে অনেক সমন্বয়কের‌ই একটি রাজনৈতিক আদর্শ আছে। তবে সেটি অন্যায় না। অন্যায় হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়ে সমন্বয়কদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা। আর জায়েদ সেই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছেন বহুবার। অভিযোগ থাকলেও প্রভাব বিস্তারের কারণে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, ১১ই আগস্ট তিতুমীর কলেজ অধ্যক্ষকে বিতারিত করাকে কেন্দ্র করে জায়েদ নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিল। তবে সাধারণ কোন শিক্ষার্থী তার নেতৃত্বে সাড়া দেয়নি। পরে সে নিজেদের মধ্যে একটি কথা বলে যেটি আমি শুনতে পাই। সে বলেছিল, ‘জুনিয়ররা খুব‌ই বেয়াদব। এদের সাইজ করতে আমার সময় লাগবেনা। আমার পাওয়ার দেখালে এরা টিকবে কিভাবে!’ সেদিনই বুঝেছিলাম সে কতটা উগ্র।

এদিকে একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, জায়েদকে যখন থেকে চিনি, তখন‌ থেকে দেখতাম শুধু সে আলোচনায় থাকতে পছন্দ করে। তিতুমীর কলেজের একাধিক ক্লাবে যোগদান করলেও উগ্র মেজাজসহ একাধিক কারণে কোন ক্লাবেই বেশিদিন টিকতে পারেনি। আর তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সাথে সম্পর্ক ছিল শুরু থেকেই। পরবর্তীতে তাদের হাতেই মারধরের শিকার হয়েছে। এরপর ক্যাম্পাসে দেখিনি অনেকদিন। বর্তমানে আন্দোলন শেষে সম্মনয়ক রূপে ফিরে এসেছে। তাও প্রভাব বিস্তারে বাঁধা পেলে নানা ইঙ্গিতে নিজেকে বিএনপির পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করে।

শিক্ষার্থীরা আরো বলেন, আমাদের ক্যাম্পাস বর্তমানে রাজনৈতিক মুক্ত ক্যাম্পাস। এখানে সবাই সমান। কেউ যদি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায় তাহলে শিক্ষার্থীরাই প্রতিহত করবে। প্রয়োজনে আইনের সহায়তায় পুলিশে সোপর্দ করা হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা বিএনপির একাধিক নেতার বক্তব্যেও তাই আহ্বান করা হয়েছে।

তিতুমীর কলেজের বেশ কয়েকটি ক্লাবের দায়িত্বশীলরা জানান, এই ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে, আমরা তা কোনোভাবেই সহ্য করব না। শিক্ষা এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সকলকে আহ্বান জানাই, কলেজের সুনাম ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে সকলেই দায়িত্বশীল আচরণ করুন।

বিভিন্ন স্ক্রিনশট ফাঁস ও জায়েদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিতুমীর কলেজ সমন্বয়ক নীরব হাসান সুজন বলেন, জায়েদের ব্যাপারে ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটগুলো আমি দেখেছি। ব্যাপারটা আমরা খতিয়ে দেখছি। তাছাড়া আমরা কোন উগ্র আচরণ বা সহিংসতাকে সমর্থন করিনা। যদি সেরকম কোন ঘটনা ঘটে থাকে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিব।

কোন সমন্বয়ক রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না জানতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক সমন্বয়কের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ