তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি পারবে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে? – জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:১২, বুধবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি পারবে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে?

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, আগস্ট ১৪, ২০২২ ৯:২৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, আগস্ট ১৪, ২০২২ ৯:২৬ অপরাহ্ণ

 

রুমিন ফারহানা

‘বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হতে চলেছে, নিদেনপক্ষে শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা’ অর্থনীতিবিদ, গণমাধ্যম, বিরোধী দলসহ নানা মহল থেকে ওঠা এই কথাগুলো এতদিন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে সরকার। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে আমার বাজেট বক্তৃতার শুরুতে আমি বলেছিলাম “অর্থমন্ত্রী বাজেটের শিরোনাম করেছেন ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’; আর আমি মনে করছি এই বাজেট শ্রীলঙ্কা হবার পথে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়ার বাজেট”। মজার ব্যাপার হলো আমার বাজেট বক্তৃতার পরদিনই সংসদে প্রত্যেক সদস্যের কাছে সংসদের তরফ থেকে নোট বিতরণ করা হয় বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার পার্থক্য দেখিয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে সেদিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সরকার যে নিজেও শ্রীলঙ্কা হবার বিষয়টি উড়িয়ে দিতে পারেনি, আমার বক্তৃতার জবাব দেবার চেষ্টা সেই প্রমাণই বহন করে। বেশি দিন আগের কথা নয়, গত বছর ডিসেম্বরে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, সারা বিশ্বকে নাকি আমরাই ঋণ দেব। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের অর্থনীতির সব সূচক আশানুরূপ হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন ডলার হওয়ার আশা করেছিলাম, সেটা হয়নি। তবে চলতি অর্থবছরে রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন ডলার হবে- সেদিন বেশি দূরে নয়, সারা বিশ্বকে আমরাই ঋণ দেবো।

ইতিমধ্যে রিজার্ভ থেকে ঋণ দেয়া শুরু করেছি। মেগা প্রকল্পেও রিজার্ভ থেকে ঋণ পাচ্ছে’ (যুগান্তর, ২৪শে ডিসেম্বর, ২০২১)। ৬ মাসও পার হয়নি, সরকারি বয়ান মতেই দেশের রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে।

আর আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমএফের হিসাব এবং আরও কয়েকটি খাতের ঋণ ধরলে এর পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। অনেকে সন্দেহ করেন, তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ সরকারের হাতে এই মুহূর্তে নেই। এটা মনে করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে বলে আমি মনে করি। বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন সরকার খুব গলা চড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে সিঙ্গাপুর, ইউরোপ বা আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করছিল। এমনকি পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময়ও বিশ্বব্যাংক, এডিবি কিংবা জাইকার মতো আন্তর্জাতিক দাতাদের নিয়ে প্রতি মুহূর্তে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছে সরকার। সেতু নির্মাণে অকল্পনীয় ব্যয় এবং দুর্নীতি নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে অবলীলায় ব্যঙ্গভরে জানিয়েছে ফিরে এসেছিল বিশ্বব্যাংক। নিজের টাকায় সেতু বানাবে বলে সরকার ফিরিয়ে দিয়েছিল তাদের। এরপর এক মাসও পার হয়নি সরকার ছুটে গেছে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং জাইকার দরজায় মোট সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পাবার আশায়। বলে রাখি অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে আইএমএফের দ্বারে ঋণের জন্য ধরনা দেয়ার তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে আছে শ্রীলঙ্কা আর পাকিস্তান।

দেশের অর্থনীতির অবস্থা বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করি। মানবাধিকার পরিস্থিতি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সংকট, সর্বত্রই আছে সরকারের লুকোচুরি, তথ্য গোপনের মারাত্মক প্রবণনতা। এই একই প্রবণতা দেখা গেছে আইএমএফের ক্ষেত্রেও। আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে যাবার পর অর্থমন্ত্রী জানান তারা আইএমএফের কাছে ঋণের কোনো আবেদন করেননি। পরে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়ে আইএমএফের কাছে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে, এমন খবর দেশের পত্রিকায় আসলে সেটা স্বীকার করেনি সরকার। পরে সেই তথ্য ব্লুমবার্গের মতো অতি স্বনামধন্য পত্রিকাসহ অনেক বিদেশি গণমাধ্যম যখন আইএমএফের বরাতে প্রকাশ করলো, তখন অর্থমন্ত্রী সেটা স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। এই দ্বিচারিতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানালেন- ‘আইএমএফের একটি দল এসেছিল, প্রতিবছরই আসে। দলটি ছিল তখনো। সে সময় যদি বলি, আমাদের অর্থের দরকার, তখন তারা অর্থ দিলেও সুদহার বাড়িয়ে দিতে পারে। গ্রাহক (বায়ার) হিসেবে আমরা খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করি। আমরা ভাব দেখাই আমাদের অর্থের দরকার নেই। এটাই হলো মূল কথা।’ অর্থমন্ত্রী সম্ভবত ভুলে গেছেন তিনি আইএমএফের ঋণ বিষয়ে কথা বলছেন, পথের পাশে কোনো হকারের কাছ থেকে জিনিস কেনার দরাদরি নিয়ে নয়। অবশ্য উনি সেই অর্থমন্ত্রী যিনি বলেছিলেন দেশ থেকে টাকা পাচারের কোনো তথ্য তার কাছে নেই। অর্থাৎ নানা ধরনের লুকোচুরি, মিথ্যা তথ্য, অবান্তর কথা তার স্বভাবজাত।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, এই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল পেট্রোল, অকটেনের মতো জ্বালানি আমরা নিজেরাই উৎপাদন করি। গ্যাস উত্তোলনের বাই-প্রডাক্ট হিসেবেই পেট্রোল, অকটেন পাই আমরা। তাই যদি সত্য হয় তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন কমে আসছে তখন হঠাৎ কেন ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হলো জ্বালানির? সরকার কি জানে না জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে? দুটি কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক। প্রথমত বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় দাম বৃদ্ধি আর হয়নি। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে। করোনার সর্বগ্রাসী ক্ষতিকর প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমরা। দেশের একটা বড় অংশের মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে। পাল্টে গেছে শ্রেণি কাঠামো। এ ছাড়াও আছে মূল্যস্ফীতির বড় ধরনের চাপ। দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী। তাহলে এই সিদ্ধান্ত কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় নেয়া হলো? এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায়। বলে রাখি- ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ এই সাত বছরে বিপিসি লাভ করেছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়াও ভ্যাট, ট্যাক্স বাবদ এ খাত থেকে সরকার প্রতি বছর আয় করে ৯-১০ হাজার কোটি টাকা। আর সব তথ্যের মতো মূল্যস্ফীতির তথ্যও সরকার বিকৃত করে।

সরকার যখন বলছিল দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের কিছু বেশি, তখনই অর্থনীতি বিষয়ক থিংকট্যাংক সানেম সরকারের হিসাবকে চ্যালেঞ্জ করে জানিয়েছিল মূল্যস্ফীতির হার ১২ শতাংশের বেশি। এখন সরকারের হিসাবই বলছে এই হার সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে আরও আগেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই অর্থবছরের বাজেটে সরকার তার বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই প্রধান উদ্দেশ্য হিসাবে দেখিয়েছে। তাহলে জ্বালানির দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে কী করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে তারা? এটা সত্যি রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করার পর বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের মূল্য বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে তেলের দাম নিম্নমুখী (ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে)। সবচাইতে বড় কথা হলো-করোনার সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব একটা অর্থনৈতিক সংকটে আছে এবং মন্দার মুখে পড়তে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। অর্থাৎ সহসা তেলের মূল্য বাড়ার কোনো কারণ নেই। তেলের মূল্য বরং কমবে। এই পরিস্থিতিতে এত বড় মূল্যবৃদ্ধি অনেকের কাছেই অকল্পনীয় বলে ঠেকেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র নেপালে তেলের মূল্য আমাদের চাইতে সামান্য বেশি, আর সব দেশের ক্ষেত্রে এটা কম। বিশেষ করে একেবারে প্রান্তিক মানুষের ব্যবহার্য কেরোসিনের দাম আমাদের তুলনায় অনেক কম। আমাদের দেশে তেলের মূল্য ভারতের চাইতে কম থাকলে সেটা ভারতে পাচার হয়ে যাবে বলে বলা হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে তেলের মতো এমন পণ্য পাচার করা সম্ভব নয়। আর যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই পাচার হয়েছে তাহলে পাচার রোধে কাজ করার জন্য যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে তারা কি করলো? বলা বাহুল্য এই মন্তব্য বিজিবি’র মতো একটি পেশাদার বাহিনীর প্রতি খুবই অবমাননাকর। বিজিবি’র পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান এই প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, “সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের চেষ্টা খুবই অপ্রতুল।

এই পাচারের চেষ্টাগুলো সাধারণত ১০-১২ লিটার হয়। এ কারণে আমি মনে করি না যে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার হচ্ছে। ডিজেল ব্যাগে করে পাচার করা যায় না। যদি ব্যারেল ব্যারেল জ্বালানি তেল সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়, তবেই অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে। সীমান্তে তো আর বাতাস দিয়ে ব্যারেল ব্যারেল জ্বালানি তেল পাচার হতে পারবে না”। একসঙ্গে এত বেশি মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণ করেছে সরকারের নগদ টাকার চরম সংকট আছে। যেহেতু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সরকারের মনোপলি আছে, তাই যে দামই সরকার নির্ধারণ করুক না কেন, আমাদের আর উপায় কি? তাছাড়া বহুদিন ধরে ক্ষয় হতে থাকা অর্থনীতির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, আইএমএফের শর্ত নিয়ে ন্যূনতম কোনো দর কষাকষির অবস্থায় নেই সরকার। ঋণ দেবার পূর্বশর্ত হিসেবে আইএমএফ যখন বাজেটে ভর্তুকি কমানোর কথা বলেছে সঙ্গে সঙ্গেই জ্বালানি তেলের দাম অবিশ্বাস্য পরিমাণে বাড়িয়েছে সরকার। এর কয়েক দিন আগেই সারের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রশ্ন হচ্ছে জনগণের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে দেবার মতো পদক্ষেপ নিয়েও সরকার কি পারবে দেউলিয়া হওয়া থেকে দেশকে বাঁচাতে?

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ