দায়হীন অবহেলাজনিত মৃত্যু আর কত? – জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:০১, বুধবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

দায়হীন অবহেলাজনিত মৃত্যু আর কত?

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, আগস্ট ২০, ২০২২ ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, আগস্ট ২০, ২০২২ ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ

 

মাসুমা সিদ্দিকা

অনেক আগে শোনা এক গল্পের কথা আজ বারবার মনে হচ্ছে। তিন দেশের তিন জন লোক নৌকাতে করে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে সুইজারল্যান্ডের ভদ্রলোকটি তার হাতের ঘড়ি খুলে পানিতে ফেলে দেন। অন্য আরোহীরা জিজ্ঞেস করেন, ব্যাপার কী? তিনি কেন এমন করলেন? তখন উত্তরে ভদ্রলোক জানান, তার দেশে এমন অনেক ঘড়ি আছে, একটা গেলে কোনও কিছু যায় আসে না। তখন জাপানের ভদ্রলোকটি তার হাতের মোবাইল ফোন ফেলে দেন পানিতে। অন্যরা জিজ্ঞেস করলে উনিও একইভাবে বলেন, আমাদের দেশে এরকম অনেক মোবাইল ফোন আছে, একটা-দুইটা গেলে কিছু যায় আসে না। তখন বাংলাদেশের ভদ্রলোকটি সুইজারল্যান্ডের লোকটিকে পানিতে ফেলে দেন। তখন জাপানের লোকটি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে উনি বেমালুম বলেন, আমাদের দেশে এরকম অনেক মানুষ আছে, দুই একটা গেলে কোনও ক্ষতি নেই। আজ মনে হচ্ছে এই গল্পের বাংলাদেশের কথাটা একদমই সঠিক। বাংলাদেশে এত মানুষ প্রতিনিয়ত অবহেলাজনিত মৃত্যুবরণ করে যে এটাকে এখন আর তেমন কোনও গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করা হয় না। মেনে নেওয়া হয় নিয়তির অমোঘ বিধান হিসেবে এবং এর প্রতিরোধকল্পে কোনও উপযুক্ত ব্যবস্থাও তেমন করে চোখে পড়ে না। এমনকি এটাও হতে পারে যে হত্যাকাণ্ডের চেয়েও অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ অবহেলাজনিত মৃত্যুর শিকার হন।

প্রতিদিনই সংবাদপত্র খুললে আমরা যে বিভিন্ন দুর্ঘটনার খবর পাই তাতে মনে হয় সেসব খবর কর্তৃপক্ষের চোখ সওয়া হয়ে গেছে। না হলে এত কিছু হওয়ার পরেও কেন উপযুক্ত ব্যবস্থা প্রশাসন নেয় না। তাই গতকাল রাজধানী উত্তরার জসীমউদদীন রোড এলাকার আড়ং শোরুমের সামনে বিআরটিএ’র একটি গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে প্রাইভেট কারের আরোহীদের যে মৃত্যু হয়েছে তাতে এই কথাটিই আমার মনে বারবার বাজছে।

গতানুগতিকতার ধারা মেনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। কোনও তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না, কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বটে। কিন্তু বলাই বাহুল্য তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কখনোই সেভাবে মানুষের চোখের সামনে আসে না; তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন তো আরও অনেক দুরস্ত।

এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে এই ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের একটি সরকারি সংস্থার একটি বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়। যখন একটি সরকারি সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সেই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কারও অবহেলার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, সাধারণ মানুষের প্রাণ হারাতে হয়, তাহলে তা নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।

রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে নাগরিকের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। উন্নয়ন প্রকল্প জনগণের কল্যাণে। মানুষের অমূল্য প্রাণের প্রতি অবজ্ঞা করা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই সরকারের জবাবদিহির স্বার্থে এই ঘটনাটির ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদিও ইতোমধ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থারও নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। এখানে জায়গা খুব অল্প কিন্তু লোক সংখ্যা অনেক বেশি। মানুষের প্রাণ এখানে অতি সস্তা। এখানে একজনের পরিবারের কিছু হয়ে গেলে অন্য জনের যেন কিছুই যায় আসে না। কারণ, সবাইকে তো নিজেদের জন্য মরিয়া হয়ে ছুটে চলতে হচ্ছে। মানুষের কোনও দুর্ঘটনায় প্রাণ ঘটলে এখানে ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। মানুষের প্রাণ অমূল্য। ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে মানুষের জীবনের দাম দেওয়া যায় না। কিন্তু বিপদগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের যে কিছুটা হলেও আর্থিক ক্ষতি পোষানো যায় তা অনস্বীকার্য। দুর্ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে যদি আমাদের দেশে একটা ইন্স্যুরেন্সের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রাণহানির পর যে অপ্রতুল ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তারও পরিবর্তন ঘটতে পারতো। তাই এই বিষয় নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে।

বাংলাদেশে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, প্রতিদিন বিভিন্ন রকমের অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু যথোপযুক্ত শাস্তির আইনি বিধান থাকলেও তা কার্যকর কতটুকু হয় তা আমাদের অজানা। আর তাই তো প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টিকে না দেখে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হিসেবে দেখে আসছেন। দুর্ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে এবং আমাদের চোখের সামনে পত্রিকায় কয়েক দিন আসার পরেই সংবাদটা আর থাকে না, তখন সবকিছু আবার আগের মতোই চলতে থাকে। আমরা যেন প্রস্তুত হয়ে থাকি পরবর্তী দুর্ঘটনার জন্য, পরবর্তী তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য, যার রিপোর্ট যেন একটা গোপন রাষ্ট্রীয় দলিল; জনসমক্ষে যার কোনও প্রবেশাধিকার নেই। অবহেলায় ঝরে পড়া প্রাণের তালিকায় প্রতিনিয়ত যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন নাম। মানুষ হতে থাকে সংখ্যা মাত্র। কিন্তু যার পরিবার থেকে কেউ হারায় সেই পরিবারটি কেবল তার অভাব বোধ করতে থাকেন এবং এই ক্ষতি যে কত বড় অপূরণীয় তা কেবল ওই পরিবারটি বুঝে। অবহেলাজনিত মৃত্যুর শিকার মানুষগুলো তার পরিবারের কাছে কখনোই শুধু একটা সংখ্যা নন, তারা রয়ে যান চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস হিসেবে। আমরা শুধু চোখ দিয়ে দেখে কিছুক্ষণ হা-হুতাশ করে আবার ফিরে যাই নিজেদের জীবনে। কিন্তু এর কি কোনও প্রতিকার হবে না, এভাবেই চলতে থাকবে দিনের পর দিন? এ ধরনের করুণ অবহেলাজনিত মৃত্যুকে যদি শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে যাদের অবহেলার জন্য এই ঘটনাগুলো ঘটে তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তবে এ ধরনের অবহেলা কমবে এটা আশা করা দুরাশা হবে না। অবশ্যই স্বজনদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কার্যকর করাও আশু প্রয়োজন। একটি মানবিক বাংলাদেশের জন্য এটি সময়ের দাবি। তা না হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অবহেলা অনেক মানুষের জীবনে দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে থাকবে।

লেখক: রন্ধনশিল্পী ও কলামিস্ট

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ