ধারাবাহিক গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৫:১১, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ধারাবাহিক গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৩ ৫:৪৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৩ ৫:৪৬ অপরাহ্ণ

 

ডেস্ক নিউজ

টানা দুই মেয়াদে ১০ বছর ৪১ দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর গতকাল সোমবার বঙ্গভবন ছেড়েছেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। দেশে প্রথমবারের মতো একজন বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে রাজসিক বিদায় জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে এমনটি আর কখনোই হয়নি। জাঁকজমক রাষ্ট্রাচারে এমন বিদায় অনুষ্ঠানও দেখেনি বঙ্গভবন, দেখেনি দেশবাসী।

সবার আগে ঝান্ডা হাতে অশ্বারোহী দল, তাদের পেছনে তিন বাহিনীর ব্যান্ড দল বাদ্যযন্ত্রে তুলছিল দেশাত্মবোধক গানের সুর। বঙ্গভবনের কর্মীরা দুই সারিতে লাল কাপড়ে মোড়ানো দুটি রশি ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন প্রধান ফটকের দিকে; সেই রশি বাঁধা পুষ্পশোভিত এক প্যারেড কারে, সেখানে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিলেন আবদুল হামিদ ও তার স্ত্রী রাশিদা খানম। দুপাশ থেকে তখন চলছে পুষ্পবৃষ্টি। আর বিদায়ী অনুষ্ঠানে যোগ দেন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রীসহ দেশের বিশিষ্টজন। নতুন ও বিদায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সেলফি তোলা থেকে শুরু করে হাসি-আনন্দ আর বিষাদের ছিল নানা মুহূর্ত। বিদায়ী অনুষ্ঠানের নানা দৃশ্যের ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি হাসিমুখে বঙ্গভবন ছেড়ে আসেন।

ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের এমন বিদায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অভিযাত্রায় মাইলফলক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া অনেকেই। কারণ, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে এ ধরনের অনুষ্ঠান করার মতো পরিবেশই ছিল না। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে এ রকম আয়োজন সত্যিই বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

রাষ্ট্রপতি হামিদের বিদায় অনুষ্ঠান স্মরণীয় হয়ে থাকবে মন্তব্য করে তার প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এটা এই কারণে স্মরণীয় যে, ৫২ বছরে বাংলাদেশে ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রপতির এভাবে বিদায় হয় নাই।’ আবদুল হামিদের আগে বাংলাদেশে ২০ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কেউ কার্যত আনুষ্ঠানিক বিদায় পাননি।

নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবনের দরবার হলে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নেন তিনি। সকাল ১১টায় দেশের ২২তম নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর আগে সকাল ১০টায় নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বঙ্গভবনের দরবার হলে প্রবেশ করেন। তারপর চেয়ার বদলের মাধ্যমে তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সারেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। কিছুক্ষণ পর বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল মাঠে শুরু হয় তার বিদায় পর্ব।

দুপুর ১টার পর শুরু হওয়া বিদায় অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্টের সুসজ্জিত একটি দল বিদায়ী গার্ড অব অনার দেয় আবদুল হামিদকে। অগ্রভাগে ঝান্ডা হাতে অশ্বারোহী দল, তাদের পেছনে তিন বাহিনীর ব্যান্ড দল বাদ্যযন্ত্রে তোলে দেশাত্মবোধক গানের সুর। লাল গালিচায় হেঁটে গার্ড পরিদর্শন করেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি।

গার্ড অব অনার পর্ব শেষে আবদুল হামিদ ও তার সহধর্মিণী রাশিদা খানম ফুল দিয়ে সাজানো খোলা জিপে ওঠেন। বঙ্গভবনের বক ফোয়ারা থেকে প্রতীকী কায়দায় সেই ‘প্যারেড কার’কে দুটি রশি ধরে মূল ফটকে টেনে নিয়ে যান বঙ্গভবনের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ধীরগতিতে গাড়ি এগোচ্ছিল, দুই পাশ থেকে ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন বঙ্গভবনের কর্মীরা। হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দিচ্ছিলেন আবদুল হামিদ।

খোলা জিপটি বঙ্গভবনের মূল ফটকে পৌঁছলে আবদুল হামিদ ও রাশিদা খানম একটি কালো রঙের গাড়িতে ওঠেন। দুপুর পৌনে ২টার দিকে বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি।

পরে সর্বোচ্চ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী আবদুল হামিদকে নিজ বাসা নিকুঞ্জের ৬, লেক ড্রাইভ রোডের রাষ্ট্রপতি লজে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বাইরের মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়।

২০১৩ সালের মার্চ মাসে অস্থায়ী এবং ২৪ এপ্রিল প্রথম দফায় দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন কিশোরগঞ্জের সন্তান আবদুল হামিদ। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ২১তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি। প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবদুল হামিদ ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নবম জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

মেয়াদ পূরণ হয়নি কারও : দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার কারণে ২০১৩ সালের ১১ মার্চ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি; ২৪ এপ্রিল শপথ নেন দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে। এরপর ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেন।

বাংলাদেশে এত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি থাকার রেকর্ড আর কারও নেই। বাংলাদেশের আইনে দুই মেয়াদের বেশি কারও রাষ্ট্রপতি থাকার সুযোগও নেই। দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার প্রবর্তন হলে মেয়াদ পূর্ণ না করেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বিদায় নেন চতুর্থ রাষ্ট্রপতি মুহম্মদউল্লাহ। সে সময় আবারও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। অভ্যুত্থান- পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্যে ৬ নভেম্বর তাকে বিদায় নিতে হয়।

পরে রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম, তাকে সরিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল ক্ষমতায় বসেন সেনা শাসক জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি হত্যার শিকার হন।

তারপর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং ১৯৮১ সালের ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তাকে সরিয়ে তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এএফএম আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসান। পরে তাকে সরিয়ে নিজেই দেশের রাষ্ট্রপতি বনে যান ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর।

তীব্র গণআন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আসেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে। পরে নির্বাচন দিয়ে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে যান।

সে সময় বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরে। ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস।

মেয়াদ শেষে তার বিদায়ের পর তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার আবারও রাষ্ট্রপতি করে সাহাবুদ্দীন আহমদকে। তার আগেই তিনি সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসরে গিয়েছিলেন। পাঁচ বছর রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সামলে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি বিদায় নেন।

এরপর বিএনপি আমলে রাষ্ট্রপতি হন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন।

বদরুদ্দোজার বিদায়ের পর মুহম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তারপর বিএনপি রাষ্ট্রপতি করে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে। মেয়াদ শেষে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিদায় নেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস, সাহাবুদ্দীন আহমদ ও ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলেও তাদের বিদায়ে কোনো আনুষ্ঠানিকতা হয়নি। অনেকটা নীরবে তাদের বঙ্গভবন ছাড়তে হয়।

২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিল্লুর রহমান। চার বছরের মাথায় তার মৃত্যু হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোঃ আবদুল হামিদ। টানা দুই মেয়াদে ১০ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেন, যা তার আগে কেউ করেনি।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ