বহিষ্কৃত-বিদ্রোহী’দের নিয়ে এখনই ভাবছে না বিএনপি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬ ৫:১৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬ ৫:১৩ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর এখন সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত বিএনপি। এ অবস্থায় নির্বাচনে বিএনপি ও জোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া’ বহিষ্কৃত নেতাদের ব্যাপারে এখনই ভাবছে না দল। ফলে বিএনপিতে ফিরতে বহিষ্কৃত-বিদ্রোহী নেতাদের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হতে পারে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে ধানের শীষের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে দলকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছিল বিদ্রোহীরা। এখন তাদের তো কিছুদিন বসিয়ে রাখতেই হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপির জন্য এখন বিদ্রোহীদের দলে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সে কারণে বিএনপিও হয়তো এ বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাববে না। অবশ্য বহিষ্কৃতরা নিজেদের এখনো ‘বিএনপি’ হিসেবেই দেখেন। যথাসময়ে তারা করণীয় নির্ধারণ করবেন। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হলেও তারা বিএনপির ‘সমর্থক’ হিসেবেই দলের জন্য কাজ করে যেতে চান।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালবেলাকে বলেন, ‘নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়েছে। দল এখন সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত। নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছিল, বহিষ্কৃত সেসব নেতার বিষয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি।’
তপশিল ঘোষণার পর প্রথম দিকে ধানের শীষ না পেয়ে ১১৭টি আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রায় ১৯০ জন বিএনপি নেতা মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে দলীয় নানান উদ্যোগের পর অধিকাংশ নেতা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলেও শেষ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক আসনে নির্বাচনী লড়াইয়ে ছিলেন বিদ্রোহীরা। বিএনপির দপ্তর বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, এমন অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর দলীয় বা দল সমর্থিত জোট প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি।
ভোটের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ২০টির মতো আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থীরা সুবিধা পান। এ ছাড়া সাতটিতে জিতেছেন বিদ্রোহীরা। তারা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, টাঙ্গাইল-৩ আসনের লুৎফর রহমান খান আজাদ, চাঁদপুর-৪ আসনের আব্দুল হান্নান, কুমিল্লা-৭ আসনের আতিকুল আলম শাওন, ময়মনসিংহ-১ আসনে সালমান ওমর রুবেল এবং দিনাজপুর-৫ আসনের রেজওয়ানুল হক। সব মিলিয়ে ২৭টির মতো আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রাখেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
ঢাকা-১২ আসনে ‘ধানের শীষ’ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীকে ভোট করে পরাজিত হন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকার এই আসনটি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ছেড়ে দেয় বিএনপি। তবে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় এই আসনে জয় পান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
জানতে চাইলে সাইফুল আলম নীরব কালবেলাকে বলেন, ‘আমি শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনীতি করেছি, এখনো করি; আমি বিএনপি করি, এটা আমার মূল কথা। সদস্যপদ না থাকলেও বিএনপি করি, বহিষ্কার করলেও বিএনপি করি, বিএনপিই আমার শেষ ঠিকানা।’
নাটোর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ফারজানা শারমিন পুতুল। এ আসনে ধানের শীষ না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। এজন্য তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি।
তাইফুল ইসলাম টিপু কালবেলাকে বলেন, ‘আমি বিএনপিতে ছিলাম, আছি। আগে পদে ছিলাম, এখন সমর্থক হিসেবে আছি। এখন দল যদি মনে করে, আমাকে দলের জন্য কাজে লাগাবে, তাহলে কাজ করব। আর যদি এমনটা মনে না করে, তাহলে সমর্থক হিসেবেই দলের জন্য কাজ করে যাব।’
পটুয়াখালী-৩ আসনটি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। দলীয় ‘ট্রাক’ প্রতীক নিয়ে তিনি বিজয়ী হন। এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। অবশ্য তিনি আগেই দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন বলে জানা যায়।
বিএনপিতে ফেরা নিয়ে কী চিন্তা করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান মামুন বলেন, ‘এখনই কোনো কিছু চিন্তা করছি না। চিন্তা করার সময় এখন নয়। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার চেষ্টা করছি। পরিবেশ তৈরি হলে তখন করণীয় ঠিক করব।’
বিএনপিতে যোগদান করে ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে ধানের শীষ পান গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। অন্যদিকে, ধানের শীষ না পেয়ে কাপ-পিরিচ প্রতীকে বিদ্রোহী প্রার্থী হন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। দুই প্রার্থীর কারণে তৃণমূলে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়ায় এ আসন থেকে বিজয়ী হন জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবু তালিব।
সাইফুল ইসলাম ফিরোজ কালবেলাকে বলেন, ‘দল আমাকে বহিষ্কার করলেও নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবেই মনে করি। না হলে অন্য কোনো দলে যোগ দিতাম, সেটা তো করিনি। পরিস্থিতি বুঝে করণীয় ঠিক করব।’
নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোয় তাদের ফেরানো নিয়ে দল এত সহজে ভাববে না বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দেশে প্রতিযোগিতার আবহে একটা অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়। এ সময়ে যখন ঐক্যবদ্ধ থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল, তখন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অর্ধশতাধিক আসনে ধানের শীষের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হন বিএনপি নেতারা। যারা দলের সিদ্ধান্ত মানেননি, তারা তো দলকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছিলেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে দল তো সাফার করেছেই। ৫০ থেকে ৬০টি আসন কিন্তু অনেক। মনে রাখা দরকার, নির্বাচনে তাদের কারণে বিএনপির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত, অনেক আসন কমে যেতে পারত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনই দল হয়তো তাদের ফেরানোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। তাদের কর্মকাণ্ড, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। পরবর্তী সময়ে দলের বাইরে থেকে দলের জন্য তাদের কার্যক্রম-সমর্থন কী হয়, ক্ষমা চেয়ে দলে ফিরতে আবেদন করে কি না, সেসব নানা বিষয় দেখে দল হয়তো একটা সময় তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। সেটাও যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ হবে। কেননা, তাদের ফিরিয়ে নেওয়া দলের এখন তো কোনো প্রয়োজনই নেই। বিএনপি যদি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন না পেত, তখন তাদের দলের প্রয়োজন হতো। বিএনপি তো এককভাবেই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘যেসব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন, সেখানে এখন তৃণমূলের জন্য দলকে বার্তা দিতে হবে, তৃণমূলকে সংগঠিত করতে হবে। ফলে তৃণমূলকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চলবে। কিন্তু বিদ্রোহীদের ফেরানো নিয়ে দল এখনই হয়তো ভাববে না।’
জনতার আওয়াজ/আ আ