বাংলাদেশি পাসপোর্ট: ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাহীনতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৫ ১:২১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৫ ১:২১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথিই নয়, বরং এটি নাগরিকদের সবচেয়ে গোপনীয় তথ্যের ভাণ্ডার। একটি পাসপোর্টে ব্যক্তির নাম, পিতা-মাতার নাম, স্বামী/স্ত্রীর নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, রক্তের গ্রুপ — এমন কোনো ব্যক্তিগত তথ্য নেই যা এতে সংরক্ষিত হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অতিসংবেদনশীল তথ্যগুলো পাসপোর্টে রাখার প্রয়োজনীয়তা কী? যদি এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকে, তবে এটি একটি সাংবিধানিক অপরাধ। আর যদি অজ্ঞতাবশত হয়ে থাকে, তাহলে এটাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের যোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় আছে।
কেন এই তথ্যগুলো পাসপোর্টে রাখা বিপজ্জনক?
পাসপোর্ট একটি সর্বজনীন নথি, যা বিভিন্ন সময়ে হোটেল, এয়ারলাইন, ভিসা প্রসেসিং বা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হয়। প্রতিবারই এই তথ্যগুলো তৃতীয় পক্ষের কাছে উন্মুক্ত হচ্ছে, যা পরিচয় চুরি, ফিশিং, আর্থিক জালিয়াতি এবং সাইবার অপরাধের সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ:
- টেলিফোন নম্বর ও ঠিকানা ফাঁস হলে ব্যক্তিগত হয়রানির শিকার হতে হয়।
- পারিবারিক তথ্য (যেমন পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রীর নাম) জাল ডকুমেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।
- রক্তের গ্রুপ এমন একটি তথ্য, যা পাসপোর্টের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, কিন্তু এটি ফাঁস হলে মেডিকেল জালিয়াতির আশঙ্কা থাকে।
রাষ্ট্রীয় অবহেলা নাকি ষড়যন্ত্র?
১. ডেটা প্রটেকশন আইন নেই: বাংলাদেশে এখনও ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট কার্যকর হয়নি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চরম লঙ্ঘন।
২. দায়িত্বপ্রাপ্তদের অদক্ষতা: যারা পাসপোর্টে এই তথ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তারা কি জানেন না যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পাসপোর্টে শুধু বেসিক তথ্য (নাম, জন্মতারিখ, জাতীয়তা) থাকে?
৩. নজরদারির অভাব: রাষ্ট্র কি কখনও এই বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে? নাকি যারা পাসপোর্ট ব্যবস্থাপনায় জড়িত, তাদের নিজেদেরই পাসপোর্ট নেই?
জরুরি সমাধান: কী করা উচিত?
১. অনাবশ্যক তথ্য সরানো:
- পাসপোর্ট থেকে টেলিফোন নম্বর, রক্তের গ্রুপ (জাতীয় পরিচয়পত্রে), স্বামী/স্ত্রীর নাম, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।
- শুধুমাত্র আইনানুগ প্রয়োজনীয় তথ্য (নাম, জন্ম তারিখ, ফটো, বায়োমেট্রিক ডেটা) রাখা হোক।
২. দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতা:
- যারা এই সিস্টেম ডিজাইন করেছেন বা অনুমোদন দিয়েছেন, তাদের তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
- ডেটা লিকের দায়ে কঠোর শাস্তি (জরিমানা, চাকরিচ্যুতি, ফৌজদারি মামলা) নিশ্চিত করতে হবে।
৩. কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ:
- পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ডেটা প্রাইভেসি ও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড (যেমন ICAO-এর গাইডলাইন) অনুসরণ করা হোক।
৪. ডেটা প্রটেকশন আইন জারি:
- তথ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
- GDPR বা অনুরূপ আইনের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।
৫. জনসচেতনতা বৃদ্ধি:
- নাগরিকদের জানাতে হবে কোন তথ্য শেয়ার করা বিপজ্জনক।
- পাসপোর্ট স্ক্যান বা কপি অপরিচিত কাউকে দেওয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
উপসংহার: রাষ্ট্রকে এখনই জাগতে হবে
একটি পাসপোর্ট নাগরিকের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার প্রতীক হওয়া উচিত, নয় তথ্য ফাঁসের হাতিয়ার। বাংলাদেশ যদি ডিজিটালাইজেশনের দাবি করে, তবে ডেটা সুরক্ষায় এই ঔদ্ধত্য মেনে নেওয়া যায় না। সরকারকে অবিলম্বে এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে, নতুবা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাইবার ও আর্থিক সংকট অবধারিত।
লেখক – Barrister, Principal of Raiyad Solicitors, Social Analyst, Former Employee at Reuters London Head Office. Rafique Ahmed, London, 17 April 2025
জনতার আওয়াজ/আ আ