বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈষম্যের দিক বিশ্লেশণ ও বর্তমান সরকারের করণীয় - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৮:২৫, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈষম্যের দিক বিশ্লেশণ ও বর্তমান সরকারের করণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০২৪ ৬:৫৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০২৪ ৬:৫৪ অপরাহ্ণ

 

মোঃ শাহজাহান মিয়া
বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণে প্রথমেই যদি কোন বৈষম্যকে চলত হিসেবে ধরা হয়, তাহলে তা হবে ভাষা আন্দোলন (১৯৫২) ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব (১৯৭০)।যা

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চাপিয়ে দিয়েছিল। আরো স্পষ্ট করে বললে , বলতে হবে এদুটি মূল বৈষম্যের প্রতিবাদের ফলশ্রুতি হল আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে (১৯৭৩) শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে, যা নিশ্চিত ছিল আগে থেকেই। কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ যেতে না যেতেই বাকশাল গঠন করে এবং সকল রাজনৈতিক নিষিদ্ধ করে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। তাছাড়া চারটি পত্রিকা ছাড়া বাকী সব নিষিদ্ধ করা হয়! এমনকি এসময় জাসদের প্রায় ৬০ হাজার নেতা কর্মীকে হত্যা করা হয়।সুতরাং আবারো বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈষম্য তৈরি হল এবং তার পরিণতিতে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হল এবং রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বিপ্লব প্রতি বিপ্লবের পরিক্রমায় জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে ও রাজনৈতিক স্হিতিস্হিশীলতা প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমান সামরিক অভ্যুথানে নিহত হলে আবারো এক প্রকার রাজনৈতিক সংকট ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়। তার পরিক্রমায় রাষ্ট্রপতি এরশাদ সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এবং বৈধতার সংকটে পতিত হন যার ফলশ্রুতিতে সর্বদলীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে তার পতন ঘটে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সোনালী অধ্যায় হল ১৯৯১-২০০৯ সাল পর্যন্ত। কেন এটা সোনালী অধ্যায় ? কারণ এ সময়ে জাতীয় নির্বাচনে সূক্ষ্ন কারচুপি কিংবা স্হূল কারচুপির এসবের অভিযোগ থাকলেও মোটামুটিভাবে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হার প্রতিফলন ছিল। যদিও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল । কিন্তু বেগম জিয়ার এ নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলেছিলেন এবং সত্যিকার অর্থেই পরবর্তীতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গভীর রাজনৈতিক সংকট এড়িয়ে যান এবং রাজনৈতিক দূরদর্শীতার পরিচয় দেন। তাছাড়া ২০০৭ সালে ১/১১ রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলেও খুব দ্রুতই ২০০৯ সালে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যেমে তার অবসান হয়।

বাংলাদেশ রাজনীতির কালো অধ্যায় ২০০৯-২০২৪ঃ
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ অনেকটা রফাদফা করেই ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে। মোদ্দাকথা হল, ১/১১ সরকারের বিতর্কিত অনেক সিদ্ধান্তের সাথে আপসের মাধ্যমে তাদের ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত হয়। যাই হোক আমার আলোচনার বিষয় হল, শেখ হাসিনার সরকার কিভাবে এবং কি কি রাজনৈতিক ব্যবস্হায় সংকট সৃষ্টি করেছে। তার আগে Daron Acemoglu & James A. Robinson তাদের Why Nations Fail বইয়ের কয়েকটি লাইন দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-২০২৪ মূল্যায়ন করতে চাই। তাদের বক্তব্য হল, “extractive economic and political institutions create a vicious circle, ….Nations fail today because their extractive economic institutions do not create the incentives needed for people to save , invest and innovate. Extractive political institutions support these economic institutions by cementing the power of those who benefit from the extraction.”
তিনি আরো দেখিয়েছেন যে, ৩৩ দেশের ক্ষেত্রে যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত হয়নি, সেখানে রাজনৈতিক ব্যবস্হা ভেংগে পড়েছিল।

এবার আসা যাক শেখ হাসিনার সরকার গত ১৫ বছরে কি কি করে গেছেন তার শিরোনাম তৈরি করি!

১. যেই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হার অসম্মানের জন্য পাকিস্তান ভেংগে বাংলাদেশ জন্ম হয়েছিল, সেই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ভোটাধিকার হরণ করা হয়, যার কারণে জেন জেড এর মধ্যে একটা ক্ষোভ সৃস্টি হয়।
২. ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত, একাডেমিক পড়াশোনায় জানতে পারি, এসময় জাসদের প্রায় ৬০ হাজার নেতা কর্মীকে হত্যা করা হয়। কিন্তু গত ১৫ বছরে ও বিরোধী দলের হাজার নেতা কর্মী ঘুম, খুন,ধর্ষণ, হেফাজতের নেতাকর্মীদের গণহত্যা, পিলখানা হত্যাকান্ড, সবশেষ ছাত্র জনতার নৃশংস গণ হত্যায় আইনের শাসন বলতে কিছু অবশিষ্ট ছিল না।
৩. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহক্ ধ্বংস করা, যার বিপরীতে দুষ্ট চক্র গড়ে উঠেছিল।
৪. মতামত প্রকাশের সুযোগ কেড়ে নিয়ে শেখ হাসিনা নিজেকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যান।
৫. উন্নয়নের নাম করে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়া , যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। এমনকি প্রায় সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার ও করেছেন।
৬. দু্র্নীতি , চাকুরী ক্ষেত্রে কোটা বাণিজ্য, লবিং বাণিজ্য, দ্রব্যমূল্যের দাম লাগামছাড়া, সিন্ডিকেট বাণিজ্য গোটা বাংলাদেশ একটা শোসক ও শোসিত শ্রেণীতে বিভাজন করা হয়েছে।
৭. বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে ভারতকে অযাচিত হস্তক্ষেপের সুযোগ, অসম ও অলাভজনক চুক্তি, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে জলান্জলী দিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্যে পরিণত করার সকল আয়োজন শেষ করেছিলেন।এমনকি ভারতীয় র এদেশকে নিয়ে বিশাল এক ষড়যন্ত্রের লিপ্ত রয়েছে। তাছাড়া তথাকথিত সংসদকে পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনার ইচ্ছায় অসংখ্য ভারতীয়কে এদেশে চাকুরী প্রদানের মাধ্যমে তিনি শপথ ভাগ করেছেন ও গুরুতর অপরাধ করেছেন, যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড তুল্য!

সুতরাং বলা যায় আওয়ামী দুঃশাসনে প্রভাব জনগণকে শোসক শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং সরকারের দুষ্টচক্র শুধুমাত্র তাদের নিজেদের মধ্যেই উন্নয়ন বন্টন হয়। তবে এজাতীয় স্বৈরাচারী সরকার জন আকর্ষণের জন্য কিছু কিছু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এজাতীয় উন্ন্য়নকে স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ভাষায় অলংকারিক উন্নয়ন ( Cosmatic development) বলা হয়। কারণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সাথে এসব উন্নয়নের কোন মিল নাই।
এমতাবস্হায়, শেখ হাসিনা দেশকে যে সংকটের গভীরে নিমজ্জিত করেছেন, তা থেকে উত্তরণের জন্য কোন inclusive economic and political institutions অবশিষ্ট রাখেননি। এখন দেখার বিষয় সরকার কিভাবে আগামী ছয় মাস বৈদেশিক ঋণ ও এলসি সচল রেখে দেশের অর্থনৈতিক স্হিতিশীলতা বজায় রাখেন। মোদ্দাকথা হল, স্বৈরাচারী সরকার বার বার একটা কথা বলত, আমরা ক্ষমতায় না থাকলে কেউ দেশ চালাতে পারবে না। কারণ এখন পরিস্কার, তারা জানত তারা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সব ধ্বংস। তারপরও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম ভাংগিয়ে দেশের মানুষের ভোটবিহীন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সফলকাম ছিলেন।

এখন উপরিউক্ত বিষয়সমূহের তুলনামূলক আলোচনায় যদি বিএনপি সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে বলতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উভয় দলেরই সাদৃশ্যমান লক্ষ্য করা যায় । তবে বিএনপি যেখানে পুকুর চুরি অভিযোগ ছিল, আওয়ামীলীগ সেখানে সাগর চুরি প্রমাণিত। প্রশাসনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয় মতাদর্শ ছাড়া বাকী প্রার্থীদের নিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে।

বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার প্রায় সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সাথে অসম চুক্তি করেছে, যাতে করে তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে সমর্থন করে। কিন্তু বিএনপি সেখানে চুক্তির এস টু এস বা সমতায় ভিত্তিতে চুক্তিতে বিশ্বাসী।

শুধু তাই নয়, গণতান্ত্রিক বিশ্বে একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ স্বৈরশাসক ছিল শেখ হাসিনা। অন্যদিকে শেখ মুজিবের শাসনামল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তিনিই দেশের প্রথম স্বৈরশাসক! তবে তার ুতনয়ার সাথে তার একটি শক্তিশালী মিল অমিল আছে। তা হলো শেখ মুজিব স্বৈরাচার কিন্তু দেশপ্রেমিক। কেন ও কিভাবে দেশপ্রেমিক? তার উত্তর হল, বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে তিনি ভারতীয় আগ্রাসন থেকে দেশকে নিরাপদ রেখেছেন। সেজন্য ও ১৯৪৭-১৯৭১ সালের ত্যাগের জন্য তাকে মনে রাখতে হবে।কিন্তু শেখ হাসিনা সেক্ষেত্রে ভারতকে সামরিক ও ব্যবসায়িক সবদিক থেকে উন্মুক্ত করে দিয়ে দেশের সাথে বেঈমানী ও শপথ ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য শোসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কিন্তু তিনি দেশপ্রেমিক ছিলেন না। তাই সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামল তাকে এক ভিন্নধর্মী স্বৈরশাসকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্বৈরশাসকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সুতরাং এটা প্রতিয়মান যে, গত ১৫ বছরের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও সাধারণ মানুষ তথা গোটা বাংলাদেশকে শাসন ও শোসনের এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। মোটকথা জনমানুষের ক্ষোভ ছিল আগে থেকেই চরমে। তাই সরকার হটানোর জন্য ছিল এমন একটা ব্রেকথ্রো যা অনুমানযোগ্য নয়, যা সরকার ও ভাবতে পারেনি, যা কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও এভাবে সরকার পতনের নজির নেই, এমনকি আন্দোলনকারীদেরও মুখ্য উদ্দেশ্য এটা ছিল না। এমতাবস্হায়, সরকার যেহেতু স্বৈরাচার ও ভিন্নমতের সহ্য করে না কিংবা বিগত অভিজ্ঞতায় তা শক্তভাবে দমন করতে চেয়েছিল, আর সেখানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সকলের ইচ্ছা শক্তির মিলন ঘটে এক মহাদানবের পতনের ঘটে। কারণ স্বৈরাচার সরকার ও তাদের দোসর বাহিনী ছাত্রলীগ যেভাবে নিষ্ঠুর কায়দায় সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও জনতাকে হত্যা শুরু করেছিল, তাতে যদি বিরুধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি সমর্থন না দিতেন, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিকতার পতনের সাথে আন্দোলনের ও পতন হতো। কেননা সরকারের কঠোরতার সাথে সাথে আন্দোলনের কঠোরতাও যুগপৎভাবে উচ্চতর গতি লাভ করে।সুতরাং এ আন্দোলনের উদ্যেক্তা
ছাত্র জনতা হলেও তার বাস্তবায়নকারী সকল বিরুধী রাজনৈতিক শক্তি, সাংস্কৃতিক শক্তি, শিক্ষক সমাজ, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষসহ সকলের অবদানই অনস্বীকার্য। বিশেষ করে ১৮ জুলাই সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর যখন নির্যাতন চরম আকার ধারণ করে , তার পরের দিন, সমস্ত সরকারী-বেসরকারী স্কুল, কলেজ ও বিশেষ করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে সাড়া দিয়েছে তা ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। কেননা ১৯ জুলাই”ই সরকার পতনের ১ দফার শেষ বাঁশি বাজতে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাতে পশ্চিমা বা যুক্তরাষ্ট্রের কোন সহযোগিতা ছিল কিনা তা একটি গবেষণার ও সময়ের পরিক্রমায় বিশ্লেষণের দাবী রাখে! এখানে উল্লেখ্য ২০০৫ সালে সাবক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারিকে টমাস বলেছিলেন বৃহত রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংস রাজনীতির কারনে জনগণ তৃতীয় শক্তি খুঁজতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাই এখন দেখার বিষয় এই লাল গণঅভ্যুথানে মার্কিন ভূমিকার গভীরতা কতটুকু! অন্যভাবে বলা যায় , সরকারের সাড়াপ্রদানের অসারশূন্যতা, দূরদর্শীতার অভাব ও অতিমাত্রায় নিষ্ঠুরতার প্রয়োগ করে সরকার নিজেও তাদের পতনের ভূমিকা পালন করেছে।

এবার আসা যাক, বর্তমান এই বিদ্যমান পরিস্হিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বর্তমান সরকারের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

এ বিষয়ে যদি সংক্ষেপে বলা হয় তা হলো, ছোট কিংবা বড় রাজনৈতিক দল গুলো ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা করে আসছে। যা এই আন্দোলনের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর দূরদর্শীতার বহিপ্রকাশ। তবে এ আন্দোলনের সমর্থন ও ইচ্ছার প্রতি যদি বর্তমান সরকার সমন্বয় করতে না পারেন, তাহলে রাজনৈতিক অচলাবস্হা সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে! তাই এ সরকারকে যে সমস্ত স্মার্ট কাজ করতে হবে, তা হলঃ

১. বর্তমান সরকারকে যে বিষয়ে আগে ঘোষণা করতে হবে তা হল নির্বাচনী রুপরেখা। কারণ নির্বাচনের নিশ্চয়তা ছাড়া কোন রাজনৈতিক দলেরই মধ্যেই সরকারের উদ্দেশ্য স্পষট হবে না। সুতরাং সরকার কাজকে টেকসই , দৃঢ় সমর্থন ও গতিশীলতার লক্ষ্যে এবং স্বৈরাচারী পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য তা অত্যাবশ্যকীয়।

২. সরকারের মেয়াদকাল নিয়ে ইতিমধ্যে নানামনির নানা মত প্রকাশিত হয়েছে। তা নিয়ে সরকার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন , তাতে সরকারের পক্ষে কোন রাজনৈতিক দলই মনে প্রাণে আশ্বস্ত হতে পারেনি। তথাপি রাজনৈতিক স্হিতিশীলতার স্বার্থে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। তাই সরকারকে তাদের সুশাসনের স্পষ্টতার জন্য এবিষয়ে পরিষ্কার ঘোষণা দিতে হবে। সরকারের যদি আরো কিছুটা সময়লাগে তার এসেসম্যান্ট করার জন্য তারও স্পষ্টতার প্রয়োজন । তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে উভয় বিষয়ের রাজনৈতিক সুরাহা অতীব প্রয়োজন।

৩. অর্থনৈতিক স্হিতিশীলতার জন্য সরকারের উদ্যেগকে সবার সমর্থন ও অভ্যাহত রাখতে হবে।তাছাড়া পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হবে বড় সাফল্য। এজাতীয় উদ্যেগ ইতিমধ্যে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
৪. আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধসহ প্রশ্নে সরকারকে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ দলের অপরাধের গভীরতা এতটাই অপ্রিয়তায় ভরপুর যা ক্ষমার যোগ্য নয়। এক্ষেত্রে দল ও ব্যক্তিকে ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ব্যক্তির অপরাধের বিচার করা অবশ্যকরণীয় কাজ। অন্যদিকে এদল যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দলের প্রয়োজন। সুতরাং এক্ষেত্রে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। কারণ মাও যে দং এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে বন্দুক যে চালায়, সে আসল, বন্দুকটি নয়। তারপরও যদি কোন কঠিন পদক্ষেপ নিতে হয় , তাহলে সরকারকে গণভোটের (Referendum) মাধ্যমে তা সুরাহা করতে হবে।
৫. বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকারকে বেশ সজাগ ও কৌশলী হতে হবে। ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছন্নতাবাদীদের নৈরাজ্যতা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং তার সাথে শেখ হাসিনা (আওয়ামী লীগ নয়), ভারত জড়িত। উদ্দেশ্য একটাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টি করে জনমনে আতংক সৃষ্টি করা। কারণ ভারত তার এক ও একমাত্র মদদ ও স্বার্থপুষ্ট সরকার হারিয়ে একপ্রকার প্রতিবেশী সংঙ্গীহীন হয়ে পড়েছে! সেই একই কারন মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উস্কানির দিয়ে যাবে। তাই বিদেশ নীতি কৌশলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অতিমাত্রায় পশ্চিমা নীতি গ্রহণ ও বুদ্ধিদীপ্ত হবে না। কারণ এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের কৌশলগত দিক ক্ষুব্ধ হতে পারে এবং চীন সরাসরি কিছু না বললেও মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করে তুলবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুই বড় পরাশক্তির রোষানলে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে স্পষ্ট করে বললে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও বাংলাদেশের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারবে না।
তাই বাংলাদেশকে পশ্চিমাদের সাথে বন্ধুত্বের পাশাপাশি চীনের সামরিক কৌশেলর সাথে যুগসূত্র থাকতে হবে। কারণ ভারতের পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আমাদের প্রতিবেশী নীতি শান্তিপূর্ণ হলেও তাদের প্রতিবেশী নীতি প্রতিবেশীদের সাথে বিরুধপূর্ণ।

৬. বর্তমান সরকারকে আওয়ামী লীগের তথ্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার ভুয়া তথ্য সন্ত্রাস ছড়িয়ে গণতন্ত্রের (Democracy) নামে ভন্ডতন্ত্র (Mobocracy) প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমানে ও তারা বিভিন্ন তথ্য সন্ত্রাস ছড়িয়ে গণতান্ত্রিক রোডম্যাপকে পুন্ডুল করতে সদা তৎপর। এক্ষেত্রে আমাদেরকে Martin Moore এর বিখ্যাত বই Democracy Hacked থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে প্রযুক্তি বিশ্বরাজনীতি ও একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্হাকে হ্যাক্ড করে পুন্ডুল (Destabilising) করে দিতে পারে। আওয়ামী লীগের এ কৌশল ও বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্র একসূত্র গাঁথা।ইতিমধধ্যে আমরা তার প্রমাণ ও পেয়েছি।

৭. বর্তমান সরকারকে অকার্যকর করতে শেখ হাসিনা এমন কোন হীন কাজ নাই যে করবে না। সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক স্যাবোটাজ , যেমন গার্মেন্টস সেক্টরে অরাজকতা, বিভিন্ন ধরণের হত্যা, প্রশাসনের অস্তিরতা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিষয়ে সরকারকে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। গণহারে বিভিন্ন জায়গায় মামলা করে জনমনে সরকারের প্রতি এক ধরণের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করবে। আর পরাজিত সরকার তা বেশি বেশি প্রচার করে সাধারণের মধ্যে ক্ষুব্ধতা তৈরি হবে। তাতে করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাই যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ঘুম, খুন, চাঁদাবাজি ইত্যাদির অভিযোগ নেই অর্থাৎ অপরাধমূলক কর্মকান্ড না থাকলে যেন কাউকে হয়রানি করা না হয় , সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মী বলে কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়। তাতে করে সরকারের ইমেজ যেমন বৃদ্ধি পাবে , তেমনিভাবে সামাজিক অস্তিরতা ও রক্ষা পাবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরের অবস্হা হল সর্বাঙ্গে ব্যাথা ঔষধ দিব কোথা! তাই সরকারকে স্বল্প মেয়াদে অগ্রাধিকারমূলক কাজে মনোযোগ হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদের কাজ গুলোর জন্য একটা পরামর্শমূলক দিক নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে।কেননা রাজনৈতিক ব্যবস্হায় নির্বাচনী সরকারের বিকল্প শাসন ব্যবস্হা আমাদের ভৌগোলিক অবস্হায় টেকসই নয়। আর তা না হলে রাজনৈতিক সমীকরন কখন কোন দিকে মিলিত হয় , তা বুঝা মুশকিল! আর আওয়ামী লীগ ও সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে!

মোঃ শাহজাহান মিয়া
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি (সিইউডিএস)
(বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত)
shahjahanau.bd@gmail.com
বার্তা প্রেরক
ইয়াসমিন আক্তার
বিশেষ প্রতিনিধি
জনতার আওয়াজ,লন্ডন

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ