বিএনপির বর্জন, আ'লীগের অর্জন ও পাবলিকের প্রায়শ্চিত্য - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৮:৩৫, শনিবার, ২রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপির বর্জন, আ’লীগের অর্জন ও পাবলিকের প্রায়শ্চিত্য

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৪ ৪:৩৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৪ ৪:৩৯ অপরাহ্ণ

 

মেসবাহ শিমুল

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। রবিবার শেষ হওয়া এই ভোটে নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে ভোট পড়েছে ৪০ শতাংশের মতো। মোট ২৯৯ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে ২ শ’ ২৫ টি আসনে জয়ী হয়েছে। এরপর রয়েছে স্বতন্ত্র যার মধ্যে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত জিতেছে ৬১াট এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকছে জাতীয় পার্টি ১১টি জিতে।

এই নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে জামায়াতসহ ৬৩টি রাজনৈতিক দল। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন অতীতে সুষ্ঠু হয়নি এ নির্বাচনও হবে না এমন অভিযোগ তুলে বিরোধীদের এই ভোট বর্জনকে যৌক্তিক বলে মনে করেছে দেশের সাধারণ মানুষও। যার প্রমাণ রবিবার সারা দেশের কেন্দ্রগুলোতে দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোর অসংখ্য ছবি, ভিডিও ক্লিপ মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। তাতে বেশিরভাগ ভোট কেন্দ্রই ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও কুকুর, গরু-ছাগল ও ভেড়া চরতে দেখা গেছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনকে বিএনপি ‘কুত্তা মার্কা’ নির্বাচন চলে অভিহিত করেছিলো। এবারের নির্বাচনের যে ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেখছি তাতে বিএনপি যদি এবার একই বিশেষণে বিশেষায়িত করে হয়তো তাকে অযৌক্তিক বলবেন না। বিরোধী দলগুলোর দাবি তারা এতোদিন ধরে সাধারণ জনগণকে ভোট বর্জনের যে আহ্বান জানিয়ে আসছে তাতে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন। এ জন্য দলীয়ভাবে বিএনপি ও অন্যান্যরা জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন। প্রহসনের একতরফা নির্বাচন বর্জন করে জনগণের এই ভোট বিমুখতাকে রাজনৈতিক অর্জন হিসেবেই দেখছে বিএনপি।

এই নির্বাচনে সরকার যে আওয়ামী লীগই থাকছে সেটি পাগলেও জানতো। কেবল কে কোথায় এমপি হবে সেটি দেখার বাকি ছিলো। তাও খুব বেশি আসনে নয়। ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ২০০ আসনে এমপি কে হচ্ছে সেটি আগে থেকেই এক প্রকার স্পস্ট ছিলো। বাকিগুলোতে স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ দলীয়) কে তার দলীয় অপর (নৌকা)’র প্রার্থীকে হারিয়ে দলে ফিরতে পারেন সেই প্রতিযোগিতা ছিলো। সেখানে কিছুটা ভাইয়ে-ভাইয়ে লড়াই হয়েছে। বাকিগুলো সব পূর্ব নির্ধারিত গেইম। তাই সাধারণ জনগণের মধ্যে এ নির্বাচন নিয়ে কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনার বিপরীতে উষ্মা দেখা গেছে। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীও এমন একতরফা নির্বাচন নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। তাই এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অর্জন বলতে কেবল সরকার গঠনের বৈধতা পাওয়াই।

নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ যে আসনগুলোতে স্বতন্ত্রের সঙ্গে লড়েছে সেখানে দলের মধ্যে দুটি গ্রুপ এখন কার্যত সরকারী ও বিরোধী দলের ভূমিকায়। নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি থেকে শুরু করে হামলা-মামলায় জড়াচ্ছে তারা। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভবিষ্যতে অবস্থা আরো ভয়াবহ হতে পারে। অর্থাৎ এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ তুলে সেখানে বিবাদের বীজ বুনে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোয় এই বিবাদ রক্তক্ষয়ী সম্পর্কে নিয়ে গেলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এছাড়া এই নির্বাচন যে একতরফা ও প্রহসনের সেটি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বুঝতে পেরেছেন। অনেকে এটিকে আওয়ামী লীগের জন্য আত্মঘাতি বলেও উল্লেখ করেছেন। এমনকী নির্বাচনে শুধু সরকার দলীয়রাই ভোট দিয়েছে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিও আঙুল তুলেছেন। তারা বলছেন, ‘বাংলাদেশে উত্তর কোরিয়া মডেল বিরাজ করছে’। সরকারের এই অর্জন সামনের দিনগুলো নি:সন্দেহে বিপদ ডেকে আনবে।
এবার আসি ইতিহাসের বিগ বাজেটের এই নির্বাচন থেকে পাবলিক বা আম জনতা কী পেলো সে প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের আকাঙ্খা ছিলো তারা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবে। সেখানে সকল দলের প্রার্থী থাকবে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দিবেন। বিগত দুটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা এই জনগণ এবার বুঝেছিলো দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারনে হলেও সরকার একটি অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে। যেখানে তারা তাদের পছন্দের প্রর্থীকে ভোট দিবেন কোনো বাধা ছাড়াই। কিন্তু প্রতিবেশি দেশটির প্রত্যক্ষ মদদে সরকার জনগণের সেই আকাঙ্খার মুখে ছাই ঢেলে দিয়েছে। যে কারনে ভোটের আগে মিছিল কিংবা জনসভায় বেশ লোক সমাগম দেখা গেলেও ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রে সে অনুপাতে ভোটার চোখে পড়েনি। অর্থাৎ, সাধারণ জনগণ তাদের হাতে থাকা ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছে। ভোটের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হলেও সরকারের এই পাতানো খেলায় তাদের অংশগ্রহন ছিলো একেবারেই নগন্য। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, তারা ভোটারের যে উাপস্থিতি দেখেছেন তাতে ৬ থেকে ৮ শতাংশের বেশি ভোট কাস্ট হওয়ার কথা নয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভোটের পর দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের চাপ উপেক্ষা করে এমন এক তরফা নির্বাচন আয়োজন করায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ নানামুখী প্রেসারে পড়তে পারে আওয়ামী লীগ সরকার। এতে করে আরো খারাপের দিকে যেতে পারে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে, বেড়ে যেতে পারে নিত্যপণ্যের দর। যদিও অর্থনীতিবিদদের এই আশঙ্কা সত্যি হয় তবে পাবলিককেই তার প্রায়শ্চিত্য করতে হবে। কেনন রাষ্ট্রের সকল সমস্যা-সঙ্কটে জনগণই আসল ভিকটিম। সবকিছুতে তাকে মূল্য চুকাতে হয়।

সারা দেশের ফাঁকা ভোট কেন্দ্র এবং ঘণ্টা হিসেবে ভোট কাস্ট হওয়ার আনুপাতিক হার হিসাব করলে বিষয়টি হয়তো তেমনই দাঁড়াতো। কিন্তু আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন তাদের পূর্বসুরীদের মতোই এ ক্ষেত্রে উদার ও করিতকর্মা। তারা ভোট গ্রহন শেষ হতে না হতেই একটা অংশ বলে দিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বিকেলে গণমাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে বলেন তাদের কাছে যে হিসাব এসে তাতে ২৮ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে তিনি সেটিকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন। তার দেওয়া শেষ অংকটাই সরকারি হিসাব। অর্থাৎ সারাদিন ভোটের মাঠ যতই ফাঁকা থাকুক ভোটের বাক্স ফাঁকা থাকা কোনো ভাবেই সমীচীন হবে না। আমাদের নির্বাচন কমিশন বরাবরই এই উদারতা দেখিয়ে থাকেন। বিগত দুটি নির্বাচনে অন্তত সেটাই দেখেছি।

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ