ভোটাধিকার নিশ্চিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে হবেই - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:৪৩, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ভোটাধিকার নিশ্চিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে হবেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জুলাই ৯, ২০২৩ ১২:৫১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জুলাই ৯, ২০২৩ ১২:৫১ অপরাহ্ণ

 

আমিরুল ইসলাম কাগজী

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচন হবে সংবিধান অনুসারে। দেশের উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেআইনি ঘোষণা করেছেন। সে অনুসারে পরে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। ফলে, এ বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো সংলাপের সুযোগ নেই। বিএনপি যদি সংবিধান মেনে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, তাহলেই কেবল সংলাপ হতে পারে।
বুধবার, জুলাই ৫, ২০২৩, সকালে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ-বিডার ভবনে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নাইজেল হাডলস্টন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ কথা বলেন সালমান এফ রহমান। — প্রথম আলো, জুন ৬, ২০২৩।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে ছেটে ফেলে সেখানে কিভাবে শেখ হাসিনার একক ইচ্ছাতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার বিধান চালু করা হয়েছে আজকের আলোচনা সেটা নিয়ে। আর এটা বাতিলও হবে শেখ হাসিনার অনিচ্ছাতেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলো ২০১০ সালের ১০ মে । তবে পরবর্তী দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের প্রস্তাব রাখা হয় রায়ে। কিন্তু সে সব প্রস্তাব-সুপারিশ বাদ দিয়ে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাস হয়।
মাত্র ১২ বছর আগের কথা। মোটামুটি বুঝদার মানুষ মাত্র প্রায় সবার কাছে সে সময়কার ঘটনা এখনো টাটকা। তারপরও নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করার বদ নিয়তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কাহিনি সংক্ষেপে বলে রাখি।
সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছর অর্থাৎ ২০১০ সালের ২১ জুলাই ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে দেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তিন সাবেক প্রধান বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতা, সম্পাদক এবং সুশীল সমাজের সদস্যসহ ১০৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে আলোচনার পর এই সংসদীয় কমিটি ২০১১ সালের ২৯ মে সুপারিশ করে।
পরদিন এই কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে একই বছরের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস করা হয় যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাঁর পরিষদবর্গ হরহামেশা বলে থাকেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত, তাদের কী করার আছে? দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বিলটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার ৭৯দিন পর অর্থাৎ ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
এই সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের দুটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেমন হয়েছে সেই নির্বাচন, সেটা ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রনব মুখার্জি জানেন, সুজাতা সিং জানেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি জানেন, অমিত শাহ জানেন, এস জয়শংকর জানেন, বাইডেন জানেন, চীন জানে, রাশিয়া জানে, জাপান জানে এবং জানে ইউরোপ। তারা দেখেছে কি চমৎকারভাবে জনগণের ভোট ছাড়াই ১৫৪ আসনের ফল ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হলো। এরপর ২০১৮ সালে তো গোটা পৃথিবীর টাশকি লাগা অবস্থা, আগের রাতেই হয়ে গেল দিনের ভোট। জনগণকে আর ভোট দিতে হলো না। এই কথা বলতে গেলে শেখ হাসিনা তার পেটোয়া বাহিনী দিয়ে বিরোধী দলকে ঘরছাড়া করেছে, গুম করেছে, খুন করেছে, আবার মামলা দিয়ে জেলখানা ভরেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তোমরা এসব করে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছো, তোমরা জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছো, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছো, সভাসমাবেশ করার অধিকার কেড়ে নিয়েছো। জোরপূর্বক গুম করা, বিচার বহির্ভূত হত্যা করা এবং তুলে নিয়ে নির্যাতন করার জন্য র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে অতীতে যারা কারচুপির সাথে জড়িত এবং ভবিষ্যতে যারা জড়াবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাদের ছেলে-মেয়ে, নাতিপুতিও এই ভিসা নীতির আওতায় পড়বে।অতএব সাধু সাবধান!
যুক্তরাষ্ট্র খুব সরল ভাষায় বলে দিয়েছে তারা বাংলাদেশে একটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশ গ্রহণমুলক নির্বাচন দেখতে চায়। জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে তাদের সরকার গঠন করুক এটাই যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া। কে ক্ষমতায় গেল কিংবা কে গেল না সেটা নিয়ে তাদের কেনো মাথা ব্যাথা নেই। তারা এখানে গণতন্ত্র দেখতে চায়। গণতন্ত্র চাইলে এটুকু ছাড় না দিলে সরকারের গায়ে ফ্যাসিস্ট তকমা লাগবেই।
ইদানীং একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে যে সেন্টমার্টিন দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিলে তারা নাকি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখবে। কিন্তু শেখ হাসিনাও বলে দিয়েছেন তিনি সেন্টমার্টিন দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চান না। মজার ব্যপার হলো যুক্তরাষ্ট্র কবে কোনদিন সরকারের কাছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ চেয়েছে সেটা তিনি খোলাসা করে কিছু বলেন না। এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে তিনি এতদিন যে ক্ষমতায় থাকলেন সেটা কিসের বিনিময়ে? ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শেখ হাসিনা জনগণকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করে থাকেন। এটাও তার একটা কৌশল। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি আগে মাঠে নামিয়ে দিলেন মেনন আর ইনুকে। তারা সংসদে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে গিয়ে বললেন যুক্তরাষ্ট্র চায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ। কিন্তু মেনন-ইনুরা কিছু দিন আগেও বলেছেন দিনের ভোট আগের রাতে হয়ে গেছে। বিনা ভোটের সংসদেও তারা রাজত্ব করেছেন। সব রেকর্ড আছে। জনগণ এত বোকা না তারা সব হিসেব কষে কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নেবে।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ঘোষণা দিয়েছেন ২০ হাজার কিলোমিটার আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন না, অন্য মহাদেশ খুঁজে নেবেন। সেই মহাদেশ দেখছি ব্রাজিল, রাশিয়া, চিন, ইন্ডিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে যোগ দিচ্ছেন তিনি। সেখানে লেনদেন হবে ইউয়ান, রুবল, রূপি এবং টাকায়। বেশ ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সেখানে পণ্য মূল্য নির্ধারণ হবে ডলারে। ঘুরে ফিরে আমেরিকার কাছেই ধর্ণা দেওয়া। আমেরিকা এখনো সুপার পাওয়ার। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া জাহাজ কেন বাংলাদেশের বন্দরে নোঙর করতে পারলো না। ভারতও সাহস পায় নাই। আমেরিকার বিরোধিতা করতে গিয়ে যাদের সঙ্গে শেখ হাসিনা জোট বাঁধতে যাচ্ছেন সেই জোটই আলগা হয়ে যাচ্ছে। চিনের বিরুদ্ধে ভারত ঠকাঠকি লেগে গেছে রোড এন্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ-বিআরআই নিয়ে। তাইতো ভারতও সুর পাল্টাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর বলে দিয়েছেন বাংলাদেশের যে কোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে তাদের সমস্যা হবে না। ম্যাসেজ ক্লিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্র এবার যেমন কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে তাতে ২০১৪ এবং ২০১৮ মার্কা নির্বাচন করা যাবে না। এবার পুলিশ, সেনাবাহিনী, আমলা কাউকে ব্যবহার করা যাবে না। বিগত দুটো নির্বাচনে তারা চরকির মতো ঘুরে ঘুরে নৌকায় সিল মেরে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে এবার সেটা তারা করবে না। এবার তাদের এই কাজে বাঁধা দেবে স্বয়ং তাদের পরিবারের সদস্যরা। কারণ তাঁদের অনেকেই আমেরিকায় স্বর্গীয় জীবন যাপন করে অভ্যস্ত। তারা কেন শেখ হাসিনার জন্য স্বেচ্ছায় নরক জীবন বেছে নেবে। তারা জানে শেখ হাসিনার চাই ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতা এনে দিতে পারে এই প্রশাসন। এই দলীয় সরকার। দরবেশরা যতই বলুক সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে অর্থাৎ শেখ হাসিনার অধীনেই। সেটা আর হচ্ছে না। কারণ এই সংবিধান সংশোধন হয়েছে সম্পূর্ণ শেখ হাসিনার ইচ্ছাতে।এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে সম্পূর্ণ শেখ হাসিনার ইচ্ছাতে। উচ্চ আদালত কিংবা জাতীয় সংসদ কোনটাকেই তিনি পাত্তা দেননি, এগুলো তিনি ব্যবহার করেছেন অনিবার্য উপাদান হিসেবে। তাই জনগণের ভোট দেবার অধিকার নিশ্চিত করতে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান ফিরিয়ে আনতে হবে সম্পূর্ণ শেখ হাসিনার অনিচ্ছাতেই।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ