শপথ প্রশ্নে বিভ্রান্তি বনাম সংবিধানের নির্দেশনা - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ১০:২৬, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৯ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

শপথ প্রশ্নে বিভ্রান্তি বনাম সংবিধানের নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতার ফল। সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা যেকোনো সময় একটি সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে কোনো ‘সাংবিধানিক শূন্যতা’ নেই। বরং সংবিধান এমন পরিস্থিতির পূর্বানুমান করেই একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নির্ধারণ করে রেখেছে, যাতে রাষ্ট্রের কার্যক্রম কোনোভাবেই স্থবির না হয়।
শপথ গ্রহণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়-এটি জনপ্রতিনিধির সাংবিধানিক বৈধতার সূচনা। শপথ ব্যতীত নির্বাচিত সদস্য সংসদের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। ফলে শপথ বিলম্বিত হওয়া মানে জনগণের রায়ের কার্যকারিতা বিলম্বিত করা। এ কারণেই সংবিধান শপথের বিষয়টিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ করেছে এবং কোনো অচলাবস্থা যেন সৃষ্টি না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও যুক্ত করেছে।


সংবিধানের স্পষ্ট নির্দেশনা
সংবিধানের ১৪৮ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘এই সংবিধানের অধীনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নিকট শপথ গ্রহণ আবশ্যক হইলে অনুরূপ ব্যক্তি যে রূপ ব্যক্তি ও স্থান নির্ধারণ করিবেন সেইরূপ ব্যক্তির নিকট সেইরূপ স্থানে শপথ গ্রহণ করা যাবে। ত্রয়োদশ সংসদ সদস্যদের শপথ প্রশ্নে স্পিকারের কোনো নির্দেশনা নেই; কারণ স্পিকার কার্যত অদৃশ্য।

আবার ১৪৮ (২ ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
“সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে, এই সংবিধানের অধীন ‘এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যেকোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করতে ব্যর্থ হলে বা না করিলে’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।”
এই বিধানের মধ্যেই সমাধানের পথ নিহিত। প্রথমে সংবিধান শপথ পরিচালনার জন্য একজন ‘নির্দিষ্ট ব্যক্তি’ নির্ধারণ করেছে-অর্থাৎ স্পিকার। কিন্তু যদি তিনি ব্যর্থ হন বা শপথ পরিচালনা না করেন, তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ক্ষমতা লাভ করেন। এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে-“যেন সংবিধানের অধীন তিনিই নির্দিষ্ট ব্যক্তি।” অর্থাৎ, সিইসি (CEC) এখানে কেবল বিকল্প নন; বরং তিনি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সমমর্যাদা ও পূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। এখন শপথের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার অনিবার্য।

বর্তমান বাস্তবতা: প্রথম বিকল্প কার্যত শূন্য
সংবিধানিক কাঠামোতে বিকল্প কর্তৃত্বের ধারণা মূল কর্তৃপক্ষের বৈধ ও কার্যকর অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল; অতএব জাতীয় সংসদের স্পিকার পদ যদি কার্যত শূন্য, অনুপস্থিত বা অকার্যকর থাকে এবং তিনি কোনো ক্ষমতা অর্পণ না করেন, তবে ডেপুটি স্পিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না। ফলে ডেপুটি স্পিকার এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
আইনগতভাবে যার অস্তিত্ব নেই, তাকে কার্যকর বিকল্প বলা যায় না। ‘বিকল্প’ তখনই কার্যকর হয়, যখন উভয় কর্তৃপক্ষই বিদ্যমান থাকে। যেহেতু প্রথম পক্ষটি অনুপস্থিত, সেহেতু বর্তমানে কার্যকর কর্তৃপক্ষ একমাত্র প্রধান নির্বাচন কমিশনার।

তিনদিন অপেক্ষা: বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সর্বোচ্চ সময়সীমা
কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন যে, সিইসি-কে শপথ পাঠ করাতে হলে তিনদিন অপেক্ষা করতে হবে। এই ব্যাখ্যা যান্ত্রিক এবং সংবিধানের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থি। স্পিকারের অনুপস্থিতির অজুহাতে এক মুহূর্ত দেরি করা মানে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে (Sovereign Will) স্থগিত রাখা।
তিনদিনের কথা বলা হয়েছে একটি সর্বোচ্চ সময়সীমা হিসেবে-এটি বিলম্ব করার কোনো ‘লাইসেন্স’ নয়। সংবিধান কোথাও বলেনি যে, প্রথম তিনদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। বরং গেজেট প্রকাশের পর (মোট) তিনদিনের মধ্যে শপথ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
যখন এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ‘নির্দিষ্ট ব্যক্তি’ (স্পিকার) অনুপস্থিত এবং তার শপথ পরিচালনার সক্ষমতা নেই, তখন অপেক্ষা করা নিছক নিরর্থক আনুষ্ঠানিকতা। সংবিধানের ভাষায় “ব্যর্থ হন বা না করেন”-এই পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। স্পিকার না থাকা নিজেই একটি ‘স্থায়ী ব্যর্থতা’র নামান্তর।

সংবিধানের উদ্দেশ্য: দ্রুত বৈধতা নিশ্চিত করা
সংবিধানের ব্যাখ্যায় তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Object and Purpose) সর্বাগ্রে বিবেচ্য। সংবিধানের মূল আকাঙ্ক্ষা হলো:
জনপ্রতিনিধিদের বৈধতা দ্রুত নিশ্চিত করা। সংসদের কার্যক্রমে অচলাবস্থা রোধ করা। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
যখন স্পিকার পদটিই অকার্যকর, তখন সময় গণনার প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। প্রথম বিকল্পটি কার্যত শূন্য থাকা সত্ত্বেও অপেক্ষা করা মানে সংবিধানের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করা। বাস্তবে এখানে কার্যকর কর্তৃপক্ষ একমাত্র সিইসি। যদি মূল কর্তৃপক্ষ (স্পিকার) অস্তিত্বহীন হন, তবে বিকল্প কর্তৃপক্ষই ‘একমাত্র ও আদি’ কর্তৃপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হন।
রাষ্ট্রপতির বিবেচনামূলক ক্ষমতার প্রশ্ন: সংসদ সদস্যদের শপথের ক্ষেত্রে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে কোনো বিবেচনামূলক ক্ষমতা (উরংপৎবঃরড়হধৎু চড়বিৎ) দেয়নি। তৃতীয় তফসিলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতিদের জন্য পৃথক শপথ কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত আছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে স্পিকারের বিকল্প হিসেবে কেবল প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অতএব, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি বা প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে শপথ গ্রহণের ধারণা সাংবিধানিক কাঠামোর বহির্ভূত।

বর্তমান বাস্তবতায়:
১. স্পিকার অনুপস্থিত।
২. নির্ধারিত প্রাথমিক কর্তৃপক্ষ কার্যকর নয়।
৩. সংবিধান সিইসি-কে ‘নির্দিষ্ট ব্যক্তির’ সমমর্যাদা দিয়েছে।
৪. সংবিধানের উদ্দেশ্য হলো দ্রুততম সময়ে শপথ সম্পন্ন করা।
অতএব, গেজেট প্রকাশের প্রথম দিন থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাতে পারেন এবং তা করাই উচিত। তিনদিন অপেক্ষা করা কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত নয়; বরং তা সংবিধানের চেতনা ও কার্যকারিতাকে অযথা বিলম্বিত করা।
রাষ্ট্রের কার্যক্রম কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতির কারণে স্থবির হতে পারে না-এটাই ১৪৮ (২ ক) অনুচ্ছেদের মূল দর্শন। এই প্রেক্ষাপটে অনুচ্ছেদটি কেবল একটি বিকল্প পথ নয়, এটি একটি ‘সেফটি ভালভ’ (ঝধভবঃু ঠধষাব)। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে অবিলম্বে শপথ পাঠ পরিচালনা করা কেবল আইনি নয়, বরং সংবিধানের পবিত্রতা ও জনগণের ম্যান্ডেট রক্ষার একমাত্র নৈতিক পথ।

লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ