সংরক্ষিত নারী আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৪:২৮, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সংরক্ষিত নারী আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জুন ১৫, ২০২৫ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জুন ১৫, ২০২৫ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

 

ছবি: সংগৃহীত
জনতার আওয়াজ ডেস্ক
সংরক্ষিত নারী আসন একশোতে উন্নীত করে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করেছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

তারা বলেছেন, আগামীতে জাতীয় সংসদের আসন হবে ৪০০টি। এরমধ্যে একশো আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলো ওই আসনে শুধুমাত্র নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিবে।

পর্যায়ক্রমে চারটি নির্বাচনে ৪০০টি আসনেই নারী প্রার্থীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। যার মাধ্যমে নারী নেতৃত্বের উন্নয়ন ঘটবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
আজ রবিবার ডেইলি স্টার সম্মেলন কেন্দ্রে নাগরিক কোয়ালিশনের আয়োজনে ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সংসদে সরাসরি ভোটে নারী প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন : প্রয়োজনীয়তা, চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা।

নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় সভায় উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, নারীর নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা ও আসন নিশ্চিত করার জন্য দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে।

বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য অবশ্যই ৩:১ পদ্ধতিতে ১০০ আসনে নারীর সরাসরি নির্বাচন দিতে হবে। পরবর্তী দুই নির্বাচনে এই অনুপাত পরিবর্তন করে সংসদের মোট আসনের ৫০ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ আসনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে অন্ততঃ ২৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, যা পর্যায়ক্রমে বেড়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে।

প্রস্তাবে আরো বলা হয়, ২০২৬ সালে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী মনোনয়নে ৩০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।

পর্যায়ক্রমে তা পরবর্তী দুই নির্বাচনে ৪০ ও ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। নির্বাচনী এলাকা পুনর্গঠিত করে, কিংবা দায়িত্ব ও কার্যপরিধি পুনর্বিন্যাস করে নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী, এবং বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে সংসদের আসন ৪০০ থেকে আরো বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
এছাড়া উচ্চকক্ষে একই ভাবে প্রথমে ৩০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব, তা পর্যায়ক্রমে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। নারী কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রত্যেক দল থেকে সমানসংখ্যক নারী ও পুরুষ জিপার পদ্ধতিতে মনোনীত হবে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বিষয়েও নারী কমিশনের প্রতিবেদনে দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা এখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

ওই প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, নারীদের বাস্তবিক উন্নয়ন হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে নারী কমিশনকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। নারীদের মর্যাদা নেই। এমন বাস্তবতায় সংসদে নারী এমপির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়েও নারীদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। বিশেষ করে উপজেলা পরিষদেও তাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাতে হলে নারী প্রার্থীকে কমপক্ষে দুই বছর আগে পরিচয় করাতে হবে। তবে এক্ষেত্রেও যাকে মনোনয়ন দিলে দল জিতবে, দল তাকেই মনোনয়ন দেয়। তিনি আরো বলেন, এমন কাঠামো দাঁড় করাতে হবে, যেখানে নারী প্রতিনিধিদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং সেটি সরকার ও দলের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হবে। এতে করে নারী জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে জন্ম নেওয়া হীনম্মন্যতা দূর হবে।

নারী কমিশনের ৩০০ সাধারণ আসনের বিপরীতে ৩০০ সংরক্ষিত নারী আসনের প্রস্তাব তুলে ধরে শ্যামা ওবায়েদ বলেন, একই সংসদীয় আসনে নারী-পুরুষের দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব সম্ভব নয়। এটি গণ্ডগোল বাড়াবে। তবে সংরক্ষিত নারী আসন একশতে উন্নীত করতে বিএনপি একমত। সংরক্ষিত আসনের নারীরা যেন হীনম্মন্যতায় না ভোগেন সে বিষয়টিও দেখতে হবে।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই নারীদের ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। বিগত জুলাই আন্দোলনে নারীদের অবস্থান থাকলেও সেখানেও অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে নারীদের হয়রানির বিষয়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

একই আলোচনায় অংশ নিয়ে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার একই সংসদীয় আসনে পুরুষ ও নারী, দুজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকলে সেটা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব হলে এর সমস্যা হইল, ওই যে আমাদের গ্রামবাংলায় যে কথা আছে, এক ঘরে দুই পীর হইতে পারে না। বর্তমান যে নির্বাচনপদ্ধতি, সেখানে অনেক সংসদীয় আসনেই সংসদ সদস্যরা নারী সংসদ সদস্যদের যেতেই দেন না। ফলে দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সংরক্ষিত নারী আসন ১০০টি করা হলে ভয়াবহ মনোনয়ন-বাণিজ্য হবে বলেও মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার মাধ্যমে সারা দেশে একঝাঁক নারী নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে সংরক্ষণপদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। সংসদীয় আসন সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এখনই সীমানী পূননির্ধারণের কাজ শুরুর আহ্বান জানান তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নারীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে। নারী ও পুরুষের জন্য সর্বজনীন ভোট দিতে হবে। এতে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ বাস্তবায়িত হলে আনুপাতিক বিতর্ক এড়ানো যেতে পারে।

তিনি বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের নারী এমপিরা হিনম্ন্যতায় ভোগেন। তিনটি সংসদীয় এলাকা তাকে দেখতে হয়। কিন্তু সে অবস্থান অনেকের থাকে না। অনেকের দলীয় প্রভাবও থাকে না। যদি নারীর শক্তিশালী অবস্থান বা শ্রম শক্তিতে অংশগ্রহণ না থাকে, বা তারা বাল্য বিয়ের শিকার হন, তাহলে তো নারীর কোনও অগ্রগতি হলো না। নারী কিন্তু অবিভাজিত জনশক্তি নয়। সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের অবস্থান কতটুকু। সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নে নারীদের অগ্রাধিকার বিষয়টি সহজ। নারী কমিশন নিয়ে যা হয়েছে, তা অনভিপ্রেত। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০০ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একটি সাধারণ আসন এবং নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন থাকবে। যেখানে উভয় আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হবে।

তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা মূলতঃ আইন প্রণয়েন কাজ করবে। স্থানীয় সরকারের কাজে তাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। নারী নেতৃত্ব বিকাশে রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে।

সংরক্ষিত নারী আসন এখনো আয়না ঘরে আছে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনুভা জাবিন।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের অলংকার হিসেবে নারী আসনের এমপিদেরকে রাখা হয়। সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি যেভাবে মাঠ থেকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন, জনগণের কাছে ছুটে যান, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন এবং একটি নির্দিষ্ট আসনের জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, সেটা সংরক্ষিত আসনের কোনো সংসদ সদস্য করতে পারেন না। তাই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন চাইলে সংরক্ষিত নয়, বরং জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে অন্ততঃ ১০০ জন নারীর প্রতিনিধিত্ব সংসদে প্রয়োজন।

আগামী নির্বাচন থেকে এটা কার্যকর করা হলে নারী আসন আয়না ঘর থেকে বেরিয়ে আলোর মুখ দেখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিষ্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের যে কোন সিদ্ধান্ত নিবে হবে। ১৭ বছর আগে আমরা রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবে ১০শতাংশও হয়নি। গত ৫০ বছরে আমরা ৫০জন নারী প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে আমরা আগামী নির্বাচনে অন্ততঃ ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারি কিনা সেই উদ্যোগ নিতে হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ