মার্কিন ভিসা নীতির পিছনের দুর্বল কূটনীতি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৪৩, বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

মার্কিন ভিসা নীতির পিছনের দুর্বল কূটনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, জুন ১৪, ২০২৩ ১২:২০ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, জুন ১৪, ২০২৩ ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

 

এম সিরাজুল ইসলাম

২৪ মে ওয়াশিংটন কর্তৃক ঘোষিত নতুন ভিসা নীতির সাপেক্ষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে মোমেনের বিবৃতিটি বেশ আকর্ষণীয়। তিনি দাবি করেছেন যে, এই ভিসা নীতি শুধুমাত্র ধনী ব্যবসায়ী ও সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে আওয়ামী লীগ নেতাদের এটি আরেকটি চাল । এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে ,ওয়াশিংটন তার নতুন ভিসা নীতিতে আওয়ামী লীগ শাসনকেই টার্গেট করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সর্বশেষ বিবৃতিটি আকর্ষণীয় কারণ তিনি মার্কিন ট্রেজারিকে পরোক্ষে সাহায্যই করেছেন। ট্রেজারি বিভাগ অন্য দেশগুলির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় নেতৃত্বদানকারী একটি দপ্তর। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বর্তমানে কৌশলগত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নীতিগুলি পর্যালোচনা করছে। লক্ষ্য হলো – সরকার এবং এর নেতাদের উদ্দেশে তৈরি করা নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ক্ষতি করছে কিনা তা খুঁজে বের করা । ড. মোমেন অজান্তেই মার্কিন ট্রেজারি সংক্রান্ত একটি প্রধান উদ্বেগের উত্তর দিয়েছেন- ”যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি বেশির ভাগ বাংলাদেশির ক্ষতি করবে না!”

তা সত্ত্বেও, নতুন মার্কিন ভিসা নীতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নতুন ভিসা নীতি দেশের জন্য অপ্রীতিকর হতে পারে। এটিকে উদ্দেশ্যের বিপরীতে ব্যবহার করলে তা স্পষ্টতই দেশের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তারা সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির বার্তাটিকে ভুল বুঝেছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।

তারা বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে যে একটি ভিসা নীতি দেশের বিশেষ অধিকারের মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলের এই কর্তাদের উচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি এবং এর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে দেশকে প্রস্তুত করা । কিন্তু তারা তা করেনি। প্রথমে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ডেমোক্রেসি সামিট থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে; দ্বিতীয়ত, ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ জন্য র‌্যাবকে দায়ী করে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকায় বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল প্রতিনিধিদল পাঠানোর মাধ্যমে ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিলো।
যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই লক্ষণগুলিকে একপাশে রেখেছিল। সম্ভবত তারা ভেবেছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ শাসনকে পুরোপুরি চীনা শিবিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সমর্থন করবে। দ্বিতীয়ত, ভারত ও চীন ফ্যাক্টর নিয়ে আওয়ামী লীগ শাসনকে সমর্থন করবে এবং কৌশলগত স্বার্থে আওয়ামী লীগকে আরেকটি মেয়াদ দিতে সাহায্য করবে । সবশেষে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব এবং সেখানে তার কৌশলগত স্বার্থের কারণে যুক্তরাষ্ট্রও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে, যার জন্য আওয়ামী লীগ শাসনের প্রত্যাবর্তন হবে তার সেরা পছন্দ। এই কৌশলগত বিশ্বাস দুর্ভাগ্যবশত আংশিক বা বহুলাংশে ত্রুটিপূর্ণ। মনে রাখতে হবে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব থাকা এটি সত্ত্বেও বাংলাদেশের উঠোন নয়। এটা ভাবা নির্বোধ হবে যে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকে বর্তমানে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে, সর্বোপরি সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর কৌশলগত স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এর বিরুদ্ধে থাকবে কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তারা প্রকাশ করেছে যে এই অঞ্চলে চীনকে সামরিকভাবে উসকানি দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। বাইডেন প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই অঞ্চলে সামরিকভাবে জড়িত না হওয়ার বিষয়ে তার উদ্দেশ্যগুলির একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে ।

ভারত তার নিজস্ব স্বার্থে আওয়ামী লীগকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় রাখতে চায় কারণ আওয়ামী লীগ তার স্বার্থ সিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার পেছনে ভারতেরও সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের ২০০৮, ২০১৪এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের যে ভূমিকা ছিলো, এখন আর ভারত সেই অবস্থানে নেই। সেই সময়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এবং বিএনপিকে ইসলামী সন্ত্রাসের ইস্যুতে বাইরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্ররা এবং জাতিসংঘ দলটিকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। গণতন্ত্র, মানবিক এবং নির্বাচনী অধিকার এখন এমন বিষয় যা যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্ররা এবং জাতিসংঘ দক্ষিণ এশিয়া সহ বিশ্বব্যাপী অনুসরণ করছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামলে এখন বাংলাদেশ বিপদের মধ্যে রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে আ.লীগকে সমর্থন দিতে ভারতকে এসব বিষয়ের বিরুদ্ধে যেতে হবে। তাই বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারত খুবই অস্বস্তিকর অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার ভিয়েনা কনভেনশনের অধীনে তাদের কূটনৈতিক সুবিধা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , তার মিত্র এবং জাতিসংঘের সাথে লড়াইকে তাদের দোরগোড়ায় নিয়ে এসে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঢাকা ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে দোলাচলে রয়েছে । রাষ্ট্রদূত হাস এবং একজন প্রাক্তন বৃটিশ হাইকমিশনার সহ দুই মার্কিন রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রক এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বেশ কয়েকজন হাই প্রোফাইল রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রণালয় তাদের আনসার বাহিনীর কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিতে বলেছে। হাই-প্রোফাইল বাংলাদেশীদের সুরক্ষার জন্য আনসাররা পছন্দের বাহিনী হবে না। তাই, এই হাই-প্রোফাইল রাষ্ট্রদূতদের জন্য আনসারের সুপারিশ করার অর্থ গুরুতর কিছু ঘটেছে।

এদিকে, পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে ”বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সীমা অতিক্রম এবং হস্তক্ষেপকারী রাষ্ট্রদূতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাপানের নতুন রাষ্ট্রদূত নির্বাচন কমিশন পরিদর্শন ও বিএনপির সঙ্গে দেখা করার পর তার এ বক্তব্য সামনে এসেছে। ভিয়েনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৪১(১) ,কূটনীতিকদের স্বাগতিক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করে। এটি বাস্তবায়িত হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে । অতএব, এটি খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ঢাকায় চলমান কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন যে তার শাসনের বিরুদ্ধে গোটা বিষয়টি পরিচালিত করা হচ্ছে । আওয়ামী লীগ, সম্ভবত অজান্তেই, ক্ষমতায় থাকার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে লড়াই করছে। শুধু বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের সঙ্গেই নয়, যে কোনো পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নত ও শক্তিশালী করা । পরিবর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলির বিরুদ্ধে কূটনৈতিক দ্বন্দে নেমেছে বাংলাদেশ, বিশেষ করে যাদের সমর্থন এবং শুভেচ্ছা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। সবশেষে বলতে হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি যেভাবে তৈরি করা তাতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ জড়িত, এটি কোনো পরিপক্ক কূটনীতির ফল নয় ।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত, কূটনৈতিক বিশ্লেষক

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ