শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি: একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:২৩, বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি: একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, আগস্ট ৩১, ২০২৫ ৩:২৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, আগস্ট ৩১, ২০২৫ ৩:২৩ পূর্বাহ্ণ

 

অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ

একাডেমিক ফিল্ডে নিষ্কাশন ব্যবস্থার মডেল যেমন ডেনড্রাইটিক, ট্রেলিস, রেডিয়াল বা আয়তক্ষেত্রাকার নিয়ে আলোচনা করার সময়, ‘জিয়া মডেল’ একটি অত্যন্ত সফল ও অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার ডেনড্রাইটিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খালের ট্রেলিস নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এর বাস্তব প্রমাণ হিসেবে জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি অতুলনীয় সাফল্যের সাক্ষী। এই মডেলটি শুধু পানি ব্যবস্থাপনায় নয়, গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাতেও একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (শহীদ জিয়া) ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যে খাল খনন (canal-digging) কর্মসূচি চালু করেছিলেন। ওই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে কৃষি কাজে সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সহজ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের মডেল তৈরি করা। যাকে মানুষ ‘জিয়া মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করে। শহীদ জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে প্রথম খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে বগুড়ার উলশি যদুনাথপুরে। এটি ছিল স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খাল খননের প্রথম উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি।
এভাবে স্থানীয় জনগণ দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়ে সহানুভূতি, আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলেছিল, যা আধুনিক যুগে সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিটিভিত্তিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বর্তমানে, যেখানে সায়েন্টিফিক মডেল গ্রহণযোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি, সেখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী মডেল উপস্থাপন করেন। এই মডেলটি বাস্তবায়ন করে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বে পরিচিত করেছিলেন। যদি এই মডেলটি চালু থাকতো, তবে বর্তমানে বর্ষাকালে প্রতি বছর হওয়া বন্যা এবং শীতকালে পানির অপর্যাপ্ততা এতটা তীব্র হতো না।

একাডেমিক ফিল্ডে নিষ্কাশন ব্যবস্থার মডেল যেমন ডেনড্রাইটিক, ট্রেলিস, রেডিয়াল বা আয়তক্ষেত্রাকার নিয়ে আলোচনা করার সময়, ‘জিয়া মডেল’ একটি অত্যন্ত সফল ও অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার ডেনড্রাইটিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খালের ট্রেলিস নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এর বাস্তব প্রমাণ হিসেবে জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি অতুলনীয় সাফল্যের সাক্ষী। এই মডেলটি শুধু পানি ব্যবস্থাপনায় নয়, গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাতেও একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।
(২)
এই খাল খনন কর্মসূচি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল এবং এই সময়ে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৫০০ টি খাল খনন করা হয় যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩,৬৩৬ মাইল (U.S. Department of State, 1980; https:/ww/w.bssnews.net/others/278110)। এর মাধ্যমে প্রায় লক্ষাধিক একর জমিকে সেচের আওতায় আনা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বকালে এই কর্মসূচি চালু হয়, যা কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খাল খনন করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন এবং খাদ্য স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করেছিল (U.S. Department of State, 1980; https:/ww/w.bssnews.net/others/২৭৮১১০)। এই কর্মসূচির ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ স্বনির্ভরতা বাড়ে, যেখানে বিভিন্ন এলাকার মানুষ অংশগ্রহণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পায় (https://twitter.com/revolt_71/status/১৮৪৩৭০৫৬৪৬২৪১৪৪০০০৯)। ফলে, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি বিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।
তবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যায়। যদি এটি অব্যাহত থাকতো, তবে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএং) বাস্তবায়নে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারতো। তাই বর্তমান সরকারের উচিত হবে এই কর্মসূচি পুনরায় চালু করা। আমরা আশা করবো, ভবিষ্যৎ সরকার এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করবে। এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের চরম ক্ষতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ফেনীর বন্যার দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার একটি প্রধান কারণ সেখানকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
(৩)
কৃষি কাজে সেচের জন্য বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের (বরেন্দ্র অঞ্চলের) খালগুলো শীতকালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। কিন্তু বর্তমানে খাল ও নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়াতে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে, এই অঞ্চলে পানির অভাব দিনদিন তীব্রতর হচ্ছে, একইসঙ্গে বর্ষাকালে বন্যার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে পানি-নিরাপত্তা অনেক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ ঝুঁকির মাত্রা ১৯৮০ সলের দিকে ছিল মাত্র ০.০২% তা ২০২১ সালের গিয়ে দাঁড়ায় ১৭.০৮% তে এবং ২০২৬ সালে এটি ৩০.৪২% এ দাঁড়াবে (টষষধয ধহফ অযসবফ, ২০২৫)। যদি খালগুলো রক্ষা করা যেতো, তবে এই সংকট এতটা তীব্র হতো না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ ছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে যা শীতকালে সাধারণ মানুষ হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ডিপ টিউবওয়েল বা শ্যালো টিউবওয়েল বসাচ্ছে। যে সকল পরিবার তা করতে পারছে না, তারা অন্যদের থেকে পানি কিনে ব্যবহার করছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ওই অঞ্চলে যারা পানি কিনে ব্যবহার করছে, তাদের মাসিক গড় খরচ প্রায় ১,৮০০ টাকা (টষষধয ধহফ অযসবফ, ২০২৫)। এর ফলে, পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ বাড়ছে এবং তারা ক্রমেই দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদি খালগুলো রক্ষিত থাকতো, তবে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্নবায়ন হতো এবং সহজেই পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যেতো। এ অঞ্চলে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে শুধু পানি সংকট নিরসন হতো না, বরং তা এসডিজি লক্ষ্যসমূহও অর্জনে সহায়তা করতো।
মধ্যাঞ্চলের নদী, খাল ও প্লাবনভূমি অতিরিক্ত বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশনে সাহায্য করতো। একইসঙ্গে শীতকালে পানি ধরে রেখে সেচের সুবিধা নিশ্চিত করতো। কিন্তু খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং নদীগুলোর নাব্য কমে যাওয়ার কারণে বর্তমানে বর্ষাকালে তীব্র বন্যা দেখা দেয় এবং শীতে পানির সংকট তৈরি হয়। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে। ১৯৭০-এর দশক থেকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর উপরের দিক থেকে সুপেয় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দিনদিন তীব্রতর হচ্ছে (জধযসধহ বঃ ধষ., ২০২০; ঐড়ংংবহুুঁধসধহ বঃ ধষ., ২০২৪)। এর ফলে, ১৯৭০ থেকে ২০২০ মধ্যে প্রায় অতিরিক্ত ৪ লাখ হেক্টর জমিতে নতুন করে লবণাক্ততা লক্ষ্য করা গেছে (ইডউই, ২০২১)। শুষ্ক মৌসুমে এ লবণাক্ততা ৫০-১০০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রসারিত হয়, যা মাটির উর্বরতা ও পানির গুণমানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে (অযসবফ বঃ ধষ., ২০২২)।
ফলে খাওয়ার পানি তীব্র সংকট সৃষ্টি ও কৃষি জমিতেও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যদি কর্মসূচি চালু থাকতো, তবে খালগুলো মিষ্টি পানি ধরে রাখতে সাহায্য করতো এবং নদীগুলো সঠিকভাবে খনন হলে লবণাক্ততা এতটা বিস্তার লাভ করতো না। খাল খননের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় মিষ্টি পানির সংরক্ষণ শুধু কৃষিতে নয়, মাছ চাষেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতো।
(৪)
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশের গ্রাম, কৃষি, ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। এই মডেল প্রয়োগের ফলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করে, বন্যা-খরা নিয়ন্ত্রণ করে এবং দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা কমিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়েছিল। অন্যদিকে, বিএনপি’র ভিশন ২০৩০-এর খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা, এবং জনগণের অংশগ্রহণের লক্ষ্যের সঙ্গে এই মডেলটি সরাসরি সম্পৃক্ত। এ ছাড়া বিএনপি’র ৩১ দফা সংস্কারের কৃষি (দফা ২৭), জলবায়ু (দফা ২৯), পানিপথ (দফা ২৮), অর্থনীতি (দফা ১৫, ১৭), ও স্থানীয় ক্ষমতায়নের (দফা ২১) সঙ্গেও এই মডেলটি জড়িত। এই মডেল প্রয়োগের মাধ্যমে এসডিজি ১ (দারিদ্র্য), ২ (ক্ষুধা), ৬ (পানি), ১৩ (জলবায়ু), ও ১৫ (পরিবেশ) পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এর লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ করে বরেন্দ্রের খরা, মধ্যাঞ্চলের বন্যা, ও দক্ষিণের লবণাক্ততার সমাধান এবং জন-সম্পৃক্ত পানি ব্যবস্থাপনায় জিয়ার খাল খনন মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে, কৃষি কাজে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং সুপেয় খাবারের পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি ‘জিয়া মডেল’ আবার জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে।
লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এবং কনভেনর, সাদা দল, আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ