সার্চ কমিটির মাধ‍্যমে কতটুকু যোগ‍্য ও দক্ষ নির্বাচন কমিশনারদের আমরা পেয়ে আসছি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:১১, বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সার্চ কমিটির মাধ‍্যমে কতটুকু যোগ‍্য ও দক্ষ নির্বাচন কমিশনারদের আমরা পেয়ে আসছি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৫ ২:০৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৫ ২:০৮ অপরাহ্ণ

 

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

সার্চ কমিটি গঠন করা হয় নির্বাচন কমিশনের জন্য নির্বাচন কমিশনারদের খুঁজে বের করতে। সার্চ কমিটিগুলোর অতীত কাণ্ড, কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা দেশের জন্য মোটেই সুখকর নয়। গত দুটি সার্চ কমিটির কথা বলি। প্রথমটিতে এর সদস্য ছিলেন পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, তখন তিনি ছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি এবং পরেরটিতে ছিলেন সার্চ কমিটির প্রধান তখন তিনি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি। কী তারা সার্চ করে বের করে নিয়ে আসলেন? এ যেন পর্বতের মূষিক প্রসব! প্রথমটিতে হুদা কমিশন নিয়ে আসলেন এবং পরেরটিতে আউয়াল কমিশন নিয়ে এসেছেন। শুধু মাহবুব তালুকদার ছাড়া এই দুটি কমিশনের কমিশনারদের কথা শুনলে রাগ উঠে যেত। কিভাবে তারা ফ্যাসিবাদের দালালী ও চাটুকারী করে গেছেন এবং কী প্রকারের নির্বাচন তারা জাতিকে দিয়ে গেছেন তা তো জাতি ভাল করে দেখেছে। নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করে গেছেন তারা।

সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ সার্চ কমিটি গঠনের ব্যাপারে বলে না। সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া] বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন”। সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪ নং আইন)-এর ৪২ ধারাবলে ‘‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করিবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া’’ শব্দগুলি ও কমার পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত। উল্লেখ্য, অনেকটা এক তরফা সংসদে (তিন-চতুর্থাংশ মেজরিটি ছিল আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের) পাসকৃত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর অনেক অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই অবৈধ ঘোষণা করেছেন।

সার্চ কমিটি গঠন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ মোতাবেক। এই আইনটি করেছে পতিত সরকার অনেকটা তাদের স্বার্থে। সার্চ কমিটি এক পদের জন্য দুজনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করেন যার মধ্য থেকে একজনকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। পাঁচ জন কমিশনারের জন্য ১০ টি নাম সুপারিশ করা হবে। সার্চ কমিটি দিয়ে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে জনগণকে দেখালেও বস্তুত: ক্ষমতাসীন সরকারই স্ট্রিং পুল করে পর্দার আড়াল থেকে। রাষ্ট্রপতির নামে কার্যত আইনমন্ত্রী এবং মূলতঃ প্রধানমন্ত্রী ফাইনালি সিলেক্ট করেন কে কে নির্বাচন কমিশনার এবং কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন। এমনটিই হয়ে আসছে অতীতে।

বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায়। তারা কোনো দলের কাছে দায়বদ্ধ নয়। তাদের কোনো পিছুটান নেই। সুতরাং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই আইনটাকে যথাযথ, যুগোপযোগী ও মানানসই করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারতেন যাতে করে কোনো দল বা নির্বাহী বিভাগের একক হস্তক্ষেপ না থাকে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে। অন্তর্বর্তী সরকার সার্চ কমিটিকে যোগ‍্য ব্যক্তিদের সার্চ করে নিয়ে আসতে তাদের টার্মস অব রেফারেন্স, এখতিয়ার, ক্ষমতা ও পদ্ধতি বাড়াতে পারতেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের দায়িত্ব নিয়েই পতিত সরকারের করা পুরাতন আইনে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করার দরকার ছিল না। ঐ সময় কোনো নির্বাচন আসন্ন (due) ছিল না বা এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে জাতীয়ভাবে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হয়নি। বর্তমান নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে কতটুকু সক্ষম তা অচিরেই আমরা দেখতে পারবো। তাদের পারফরমেন্সের ব‍্যাপারে এখনই কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে কথায় আছে না “morning shows the day” (অর্থাৎ দিন কেমন যাবে তা সকাল দেখেই বুঝা যায়”)!

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে সার্চ কমিটির জনৈক সদস্যের সাথে সাক্ষাতে বেশ লম্বা আলাপ হলো। আলাপের সূত্র ধরে যা জানতে পারলাম তা হলো – সার্চ কমিটি প্রথমেই তারা বসে দেখেছেন কোন কোন রাজনৈতিক দল কাকে কাকে নমিনেট করেছেন। অনেকটা “টিক মার্ক” এক্সারসাইজের মতো। যাকে যাকে একাধিক বা বিশেষ করে বড় দলগুলো নমিনেট করেছে তাদেরকে তারা অগ্রাধিকার দিয়ে নিঃসংকোচে নিয়োগের জন্য শুপারিশ করেছেন। এই হলো সার্চ করে যোগ‍্য ব‍্যক্তিদের বের করার নমুনা!

বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে সম্ভবত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আলোচিত ও গণমাধ্যমে কাভারেজ প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কেননা এই প্রতিষ্ঠান ডিল করে রাজনীতিবিদদের সাথে যারা দেশ পরিচালনাকারী। তারা দেশের স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, সংসদে আইনপ্রণেতা ও রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ফেসিলিটেট করেন। দেশের জনগণের চোখ ও গণমাধ্যমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে নির্বাচন কমিশনের উপর। তাই নির্বাচন কমিশনারদের শুধু সৎ হলেই হবে না। তাদেরকে হতে হবে যোগ‍্য ও চৌকস। রাজনীতিবিদ ও মিডিয়াকে ফেইস করার মতো দক্ষতা থাকতে হয়। মেরুদণ্ড থাকতে হবে সোজা ও শক্ত। রাশভারী ও প্রচণ্ড ব‍্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বভাবের গুনাবলী থাকা দরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের যার কথায় জাতি আশ্বস্ত হবে, পাবে জাতির ক্রান্তিকালে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

অনেকে মনে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতিদের মধ্য থেকে হলে ভাল হয়, কেননা তারা দীর্ঘদিন বিচারাঙ্গনে নিরপেক্ষভাবে বিচারকাজ পরিচালনা করে নিরপেক্ষ থেকে কাজ করার অভ‍্যাস, অভিজ্ঞতা ও গুন অর্জন করেছেন। আবার অনেকে বলেন ১৮ কোটি (প্রকৃত জনসংখ্যা অনেক বেশি হবে) মানুষের দেশে নির্বাচন পরিচালনা করা একটি মাইক্রো ও মেক্রো ম‍্যানেজমেন্টের ব‍্যাপার। সে কারণে ম‍্যানেজমেন্টে দক্ষ আমলা থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিলে ভাল। উভয় পক্ষের কিছুটা যুক্তি আছে।

বিচারপতিরা নিরপেক্ষ থাকার অভ‍্যাস ও গুন অর্জন করতে পারলেও ম‍্যানেজারিয়াল স্কিলে হয়তো ঘাটতি থাকতে পারে। অতীতে রাজনৈতিক সরকার উচ্চ আদালতে প্রতিভা বা মেধার স্থলে রাজনৈতিক ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছে। ফলে নিরপেক্ষ থাকার অভ‍্যাস ও গুন কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আবার দীর্ঘকাল আমলাদের পলিটিক্যাল মাস্টারদের আদেশ ও নির্দেশ শুনতে ও পালন করতে করতে (স‍্যার স‍্যার ডাকতে ডাকতে) ঐভাবে অভ্যস্ত হওয়ার একটি ঝোঁক থাকে। তবে এটা পার্সন ট‍্যু পার্সন ভেরি করে। আমলা হয়েও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ কিংবা বিচারপতি হয়েও বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুর রউফ মেরুদণ্ড উঁচু করে জাতিকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিয়েছেন যেমন সত‍্য, ঠিক তেমনি আমলা হয়েও নূরুল হুদা বা রকিবুদ্দিন অথবা বিচারপতি হয়েও বিচারপতি এম এ আজিজ জাতিকে হতাশ করেছেন। তাই কোনো বিশেষ পেশার সদস্যের ব‍্যাপারে চুড়ান্ত উপসংহার টানা ঠিক নয় বরং বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে যে কোনো পেশার সবচেয়ে দক্ষ ও যোগ্যতম ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হলো কিনা সেটা বড় কথা।

যোগ্য, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দেশের ভেতরে পাওয়া না গেলে ১/২ জনকে দেশের বাইরে বসবাসকারী দেড় কোটি প্রবাসীদের মধ্য থেকে সার্চ কমিটি সার্চ করে নিতে পারতেন। বৃটেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্য বাংলাদেশি ব্যক্তিত্বরা আছেন যারা চমৎকারভাবে এমন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ৫৪ বছরে তো অনেক দলদাস আমলা ও বিচারকদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দেখা হয়েছে। একবার দেখতে পারতেন আপনাদেরই রত্নদের যারা দেশের বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সুনাম অর্জন করে চলছেন। তখন দক্ষ ও যোগ্যতার তুলনা করতে পারতেন। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করে নমিনেশন আহ্বান করা হলো, এমনকি ইমেইল নাম্বার দিয়ে সরাসরি নমিনেশন পাঠাবার অনুরোধ করা হলো। আমার জানামতে বৃটেন থেকে অত‍্যন্ত যোগ‍্য পাঁচজন প্রার্থী তাদের নমিনেশন ইমেইল পাঠিয়েছেন। সার্চ কমিটি তাদের ইমেইলে পাঠানো নমিনেশনের প্রাপ্তি স্বীকার (acknowledgement) পর্যন্ত করার সৌজন্যতাবোধ দেখানোর প্রয়োজন অনুভব করেননি।

বৃটেনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও মেকানিজমের মাধ‍্যমে পাবলিক বডি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোত্তম প্রার্থী বা প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হয়। প্রথমে পর্যাপ্ত ও নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর প্রাপ্ত আবেদনপত্র থেকে বাছাই করত: শর্টলিস্ট করে ইন্টেনসিভ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এই সাক্ষাৎকারে প্রার্থীদেরকে সমান প্রশ্নসমুহ করে মার্কিং দেয়া হয় এবং সর্বোচ্চ মার্ক প্রাপ্তরাই সিলেক্ট হোন। সাক্ষাৎকারে প্রার্থীদেরকে কাঙ্খিত যোগ‍্যতা ও ক্রাইটেরিয়া কিভাবে তারা পূরণ (fulfil বা meet) করেন তা এক বা একাধিক উদাহরণ দিয়ে ডেমোন্সট্রেট করতে হয়। তখনই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতা ইন্টারভিউ প‍্যানেলের কাছে ধরা পড়ে বা পরিস্ফুটিত হয়। সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীদের ব‍্যাপারে বিস্তারিত লিখিত রেফারেন্স নেয়া হয়। এরপর সব ধাপে সফল হওয়া প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। এমন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সার্চ কমিটি বাংলাদেশে অনুসরণ করলে দক্ষ, যোগ‍্য ও মেরুদন্ডসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদেরকে জাতি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে পেতো।

লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ