স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ : অন্তর্বর্তী সরকার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ায়নি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:১৯, বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ : অন্তর্বর্তী সরকার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ায়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, মে ১৮, ২০২৬ ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, মে ১৮, ২০২৬ ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি :সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের নিয়মিত ক্যাম্পেইন না হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি বলেছেন, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের পর দেশে আর কোনো ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনিং হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, হামে আক্রান্ত অনেক শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পায়নি বলে অপুষ্টিজনিত নানা জটিলতায় ভুগছে।

রবিবার (১৭ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-(ড্যাব) আয়োজিত ‘হাম ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা সপ্তাহ’- উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ড্যাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনানের সভাপতিত্বে এই আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন সংসদ সদস্য ও ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ডা. মো. আব্দুস সালাম; শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান, অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম; মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাকারিয়া আজিজ।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর দুবার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে তা যথাযথভাবে করেনি বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হামের টিকার সংকট নিয়েও ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি।

নিয়মানুযায়ী প্রতি চার বছর পর দেশে হামের (মিজেলস) বড় ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর আর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে হামের পর্যাপ্ত টিকার মজুত ছিল না। বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে তহবিল গঠন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘কোভিডের তহবিলে প্রায় ৯ কোটি টাকা পড়ে ছিল। সেই টাকা ইউনিসেফকে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। কিন্তু তারা টিকা দিতে এক বছর সময় চায়। এরপর আমরা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি)-র মুখোমুখি হই। আমি তাদের কাছে গিয়ে একেবারে ভিক্ষুকের মতো টিকা চেয়েছি। গ্যাভি তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হয়।’

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়ে যত গাফিলতি
শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে ১৯৭৩ সাল থেকে দেশে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়, যা তখন ‘জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে পরিচিত ছিল। ২০০৩ সাল থেকে এর নাম দেওয়া হয় ‘জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’।

সাধারণত প্রতিবার ৬ মাস পরপর ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশের ৬-১১ মাস বয়সী শিশুকে নীল রঙের এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে লাল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। প্রতিবার গড়ে সোয়া ২ কোটি শিশুকে এই ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চে এই ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

একই সঙ্গে শরীরে কৃমি থাকলে ভিটামিন ‘এ’র পূর্ণ শোষণ বাধাগ্রস্ত হয় বলে ২০০৩ সাল থেকে এর সঙ্গে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো শুরু হয়। তবে ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় গত দুই বছর ধরে নিয়মিত কৃমিনাশক সপ্তাহও পালন করা যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন হওয়ার নিয়ম থাকলেও জটিলতার কারণে গত দুই বছরে হয়েছে মাত্র দুবার। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) নবায়ন না হওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে গেছে ক্যাপসুল কেনা ও মাঠপর্যায়ের বিতরণ কার্যক্রম।

পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় এই ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের রাতকানা রোগ, দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণজনিত ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়তে পারে। এমনকি দেশে বর্তমানে দেখা দেওয়া হামের প্রাদুর্ভাবকেও এই ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতির একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত বলে মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)’-এর ওপির মাধ্যমে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল কেনা ও বিতরণ হতো। এরপর ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি আর অনুমোদন পায়নি। পরবর্তী সময়, ২০২৫ সালের মার্চে কর্মসূচিটি বাতিল করে রাজস্ব খাতের মাধ্যমে সব কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দে বিলম্বের কারণে পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।

জাতীয় পুষ্টিসেবা প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, ওপির মাধ্যমে ভিটামিন এ ক্যাপসুল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রচার করা হতো। নতুন ওপি না থাকায় এবং ২০২৪ সালের জুনের পর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো ভেঙে পড়ায় গত এক বছর কোনো ক্যাম্পেইন করা যায়নি।

কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) মাধ্যমে এই ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা ছিল। ২০২৫ সালের শেষে একটি ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা থাকলেও বরাদ্দ অনুমোদন, অর্থসংকট এবং ক্যাপসুল কেনায় জটিলতার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

সংকট উত্তরণের চেষ্টা
রবিবারের সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, আগামী জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইউনিসেফের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেশে পৌঁছাবে। এরপরই দেশব্যাপী পুরোদমে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো শুরু হবে। দুই ধাপে ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়ায় হবে।

হামের প্রকোপ কমলেও বাড়ছে নিউমোনিয়ার শঙ্কা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ব্যাপক টিকাদানের ফলে দেশে নিশ্চিত হামের প্রকোপ ও মৃত্যু প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামের রোগী ছিল ৭ হাজার ৭৬৭ জন; সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৮৪৬ জন। শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মারা গেছে এক শিশু, এ ছাড়া আরও পাঁচ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

চিকিৎসকদের বরাতে সতর্ক করে দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে শিশুরা হাম থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ‘সেকেন্ডারি ইনফেকশন’ হিসেবে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আসলে অনেক শিশু হামে নয়, বরং পরবর্তী নিউমোনিয়া ও পুষ্টিহীনতার কারণে মারা যাচ্ছে।

মায়েদের পুষ্টিহীনতা ও সিজারিয়ান প্রবণতার সমালোচনা
হাসপাতাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলের মায়েরা চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন, যার প্রভাব পড়ছে শিশুর শরীরে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলেও সিজারিয়ান (অস্ত্রোপচার) অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘ম্যাক্সিমাম সিজারিয়ান বাচ্চার মায়েরা শিশুদের শালদুধ দেয় না, যা নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রধান উৎস। ৬ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত শিশু মায়ের দুধ থেকে যে ন্যাচারাল ইমিউনিটি পায়, তা এখন আর পাচ্ছে না। আমাদের মায়দের ব্রেস্ট ফিডিং বা স্তন্যপানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এটিই আসল প্রিভেনশন।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার দেশের ১০টি জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল, ঢাকার শিশু হাসপাতাল এবং কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে নতুন ১০টি আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর, নিওনেটাল ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর চালু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ওষুধশিল্পের মালিকদের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া ৩০টি এবং আমেরিকা থেকে আমদানি করা ১০টি ভেন্টিলেটর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যুক্ত করা হয়েছে। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের রোগীদের জন্য রাজশাহী, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ এবং মাতুয়াইল শিশু কেন্দ্রে আইসিইউ ইউনিট বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত অভিযান
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, দেশের সব পৌরসভা এবং জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনদের নিয়ে সমন্বিত মশা নিধন কার্যক্রম চলছে। প্রতি শনিবার দেশব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মশার লার্ভা ও উড়ন্ত মশা মারতে চলতি সপ্তাহ থেকে আবারও বিশেষ স্প্রে কার্যক্রম শুরু হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তায় মোবাইল হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ