জাতীয় সঙ্গীত, জিয়া ও নতুন প্রজন্ম
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৪ ১:৩২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৪ ৩:১৯ অপরাহ্ণ

মারুফ কামাল খান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাঙলা’ গানটি আমার কাছে বড়ই সুমধুর লাগে। এ গান আমার পরাণের অথৈ গহীনে নাড়া দেয়। আবেগ সঞ্চার করে। আমি এ সমগীতে আলোড়িত, আন্দোলিত ও প্রাণিত হই। কিন্তু এ গান তো সকলের মধ্যে সমঅনুভূতি সৃষ্টি করে না। অনেকের কাছেই এ গান ম্যাড়মেড়ে, এর সুর আবেদনহীন ও পানসে লাগে। এই গানের বাণী আমার মতো সকলের প্রাণে আবেদন সঞ্চার করে না। তো কী করতে হবে? জোর করে কোনো কিছু কাউকে তো ভালো লাগানো যায় না।
এই যে আবেগের কথা বললাম, সে আবেগ সকলের সমান না। তাছাড়া আবেগের ব্যাপারটা সময়, পরিস্থিতি, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ওপরেও অনেকটা নির্ভর করে। মানুষের বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং তার আদর্শ, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিও আবেগকে প্রভাবিত করে। আমরা যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের লোক তাদের বেশিরভাগের আবেগ এবং নতুন জেনারেশনের আবেগ, অনুভূতি ও উচ্ছ্বাস সবক্ষেত্রে এক নাও হতে পারে। আর এই এক না হলেই যে সব কিছু উচ্ছন্নে গেলো, এমন নয়। আর এক না হলেই যে শোরগোল তুলতে হবে, মাতম সৃষ্টি করতে হবে, এটাও কোনো সভ্যতা ও আধুনিকতার লক্ষ্মণ নয়।
দীর্ঘকাল ধরে ফ্যাসিবাদ-কবলিত ও স্বৈরাচার-শাসিত দেশে-সমাজে-পরিবেশে বসবাস করতে করতে আমাদের মধ্যে খুবই টোটালিটারিয়ান বা সর্বগ্রাসী কিছু মনোভঙ্গি শেকড় গেড়ে বসেছে। আমরা নিজের মতবাদ, ধারণা, অনুভূতি ও আবেগের বিপরীত কোনো কিছুই সহজ ভাবে নিতে পারিনা। আমরা উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠি এবং উৎকট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি। অথচ রবি ঠাকুরই আমাদেরকে পরামর্শ দিয়ে গেছেন :
“মনেরে আজ কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।”
আমার মতবাদ ও অনুভূতি যেমন সত্য, ঠিক তেমনই অন্যের মতবাদ ও অনুভূতিও সমান সত্য। তাই সকলের মতামত ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এবং সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে যে মতামত ও অনুভূতি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবে তাকে গ্রাহ্য করা ও মেনে নেয়াই গণতন্ত্রের দাবি।
আমাদের দেশের পাকিস্তানি পর্বে যে রাজনীতি ও সংস্কৃতির চর্চা চলেছে তাতে শাসক আর শাসিতের অনুভূতি বিপরীত হয়ে উঠেছিল। শাসকেরা রবীন্দ্র-সাহিত্যকে পাকিস্তানি তাহজিব-তমুদ্দুন পরিপন্থী বিবেচনা করে নিরুৎসাহিত করার নীতি গ্রহন করলে শাসিতেরা রবি ঠাকুরকেই নিজস্ব সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ রূপে আঁকড়ে ধরেছিল। জননায়ক মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পর্যন্ত রবি ঠাকুরকে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে গ্রহন করেন। এমনকি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরাও রবীন্দ্রসাহিত্যের মধ্যে মানবতার বাণীর সন্ধান পান। যদিও ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ জমিদার ও বৃটিশ শাসকদের মিত্র হিসেবে নিপীড়ক পংক্তিভূক্তই ছিলেন।
পাকিস্তান-পর্বের সেই ধারায় মুক্তিযুদ্ধকালে রবীন্দ্রসাহিত্য আমাদের প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষকেই উদ্দীপ্ত করেছে। স্বাধীন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রবি ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাঙলা’ গানকে আমরা সাদরেই গ্রহন করেছি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম সেই সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট নয়। তাদের অনুভূতিও আমাদের অনুরূপ নয়। কাজেই জাতীয় সংগীত হিসেবে রবি ঠাকুরের ওই গানকে তারা সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখতেই পারে। এতে আঁৎকে ওঠার কিছু নেই। এমনকি ওরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে জাতীয় সংগীত বদলেও ফেলে তাতেও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে-না। গরিষ্ঠের মতামত ও সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে আমাদের মধ্যে।
‘আমার সোনার বাঙলা’কে জাতীয় সঙ্গীত রূপে বহাল রাখার ব্যাপারে শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের মনোভাব ছিল অনড়। গত দুই দশক ধরে আওয়ামী প্রচারবিদেরা কল্পিত ও ভিত্তিহীন নানান কাহিনী ও রটনা অবাধে ও অবিরত প্রচার করে জিয়াউর রহমানকে জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের ব্যর্থ উদ্যোক্তা হিসেবে চিত্রিত করার হীন অপপ্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের প্রকৃত সত্য হচ্ছে, তিনি তাঁর সময়ে উত্থাপিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের সব দাবিকে দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করেছেন।
১৯৭৮ সালে এদেশে প্রথম বারের মতো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনের একজন প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান ভোটের আগে ৭ মে এক সংবাদ-সন্মেলন করেন। পরদিন তার বিবরণ দেশের প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। সে সংবাদ-সন্মেলনে জিয়াউর রহমানকে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা বদলের ব্যাপারে কতিপয় লোকের দাবির ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন : “এ-গুলো খুবই গুরুতর বিষয় এবং হালকাভাবে তা’ আলোচনা করা উচিৎ নয়। জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা স্থায়ীভাবে গৃহীত হয়েছে এবং এগুলো থাকবে।”
শহীদ জিয়া তাঁর নিজের অনুভূতি এবং সমকালীন বাস্তবতার নিরীখে ওই অবস্থান গ্রহন করেছিলেন। তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দু’-একজন প্রার্থীও জাতীয় সঙ্গীত বদলকে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। তারও আগে খোন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার জাতীয় সঙ্গীত বদলের একটি উদযোগ সময়াভাবে সম্পন্ন করে যেতে পারেনি। তৎকালে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে তৎপর ছিল। তারা ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিন দিন ব্যাপী এক সিরাত সন্মেলনের আয়োজন করে। সন্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিমানবাহিনী প্রধান এম. জি তাওয়াব। সন্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আজমের লিখিত বক্তৃতা পড়ে শোনানো হয়। দাবি ওঠে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা বদলের। স্লোগান দেওয়া হয় : “তাওয়াব ভাই – চাঁদতারা পতাকা চাই”। জিয়াউর রহমানকে তখন ভারতীয় আধিপত্য মোকাবিলার সঙ্গে যুগপৎভাবে পাকিস্তানিকরণের প্রচেষ্টাকেও রুখে দিতে হয়েছিল।
জাতীয় সঙ্গীত বদলের দাবি ১৯৭৯ সালের পার্লামেন্টেও তুলেছিলেন তৎকালীন আইডিএল নেতা মওলানা আবদুর রহীম। জিয়াউর রহমানের আমলে রাজনৈতিক দলবিধি (পিপিআর)-এর আওতায় জামায়াত নামে দল গঠনের অনুমতি না পেয়ে তারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকার সংসদে তোলা তাদের প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়েছিল।
অধ্যাপক গোলাম আজমের এক পুত্র আবদুল্লাহিল আমান আযমী সম্প্রতি জাতীয় সঙ্গীত বদলের সেই তুফান-তোলা দাবি পুনরায় তুলেছেন। আযমী বাংলাদেশ আর্মিতে খুব মেধাবী ও চৌকস অফিসার ছিলেন। গোলাম আযমের ছেলে বলে আওয়ামী সরকার বৃগেডিয়ার থাকা অবস্থায় তাকে চাকুরিচ্যুত করে। পরে তাকে অপহরণ করে কুখ্যাত আয়নাঘরে এক দশক বন্দী করে রাখা হয়। এই জঘণ্য নিবর্তনের শিকার হবার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এবং দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রবল সহানুভূতি পেয়েছেন।
জনাব আযমী দলীয়ভাবে জামায়াতের কেউ নন। অবশ্য জামায়াতের অন্তর-লালিত একটি দাবিই তিনি তুলে ধরেছেন। তবে রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে অনভিজ্ঞ লোক হিসেবে এই দাবি কতোটা সময়োচিত হয়েছে সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
দল হিসেবে জামায়াত এখন উদারনৈতিকতার পরিচয় দিতে মরিয়া। তারা ইউরোপ-আমেরিকার কাছে গ্রহনযোগ্য হবার চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে একটি ওয়ার্কিং রিলেশন স্থাপন এবং একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চাইছে তারা। এ সময়ে জনাব আযমী জাতীয় সঙ্গীত বদলাবার পুরনো দাবি তুলে দলটিকে বিব্রত করলেও সেটা তারা প্রকাশ্যে বলতে পারবে না। তবে এই দাবির বিরুদ্ধে বামপন্থী কালচারাল সংগঠনগুলো সোচ্চার হবে এবং তাদের ছত্রছায়ায় আওয়ামীলীগও মাঠে নেমে পড়ার সুযোগ নিতে পারে। একটি অপ্রধান ইস্যুকে এ মুহূর্তে সামনে আনা কতটা হঠকারিতা হয়েছে তা সময়ই বলে দেবে।
জামায়াত এখনো এদেশের মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই বলে সমাজে তাদের মতামত অবাধে তুলতে বাধা দেয়ার অবকাশ থাকা উচিত নয়। আবার তাদের মতামতের বিরোধিতা করার অধিকারও সকলের আছে। তবে তার প্রকাশ শোভন, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক পন্থায় হওয়া উচিৎ।
কেবল জাতীয় সঙ্গীত নয় কোনো ব্যাপারেই আমাদের ভাবনা অনড় ও নিশ্চল হওয়া উচিত নয়। পরিবর্তনশীলতা ও যুগের দাবিকে মেনে নেয়ার প্রস্তুতি আমাদের থাকতে হবে। রবি ঠাকুরের গান বাংলাদেশ ও ভারত এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত। কিন্তু দু’টি গানের কোনোটিই জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রচিত হয়নি। রবি ঠাকুরের ‘জনগণমন-অধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গানটিকে ভারত স্বাধীন হবার আগেই সে-দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন নেতাজী সুভাস বসু। উপনিবেশ ভারতে বৃটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের আগমন উপলক্ষে তার মহিমাকীর্তন করে রচিত এই গান যেন জাতীয় সঙ্গীত না থাকে সে ব্যাপারে ভারতে এখনো অনেকেই অবিরাম দাবি করে যাচ্ছেন। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রচিত ‘আমার সোনার বাঙলা’ গানটিও বর্তমান বাংলাদেশের মানুষদের স্বার্থবিরোধী অবস্থান থেকে রচিত বলে অনেক সমালোচকের অভিমত।
সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে রবি ঠাকুরের বিরোধিতা থেকে উৎসারিত জাতীয় সঙ্গীত বদলের দাবিকে আমরা অগ্রাহ্য করতেই পারি। তবে আরো অনেক কারণকে যুক্ত করে সময়ের দাবি মেটাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠে যদি কখনো বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বদলের দাবি ওঠে তখন আমরা কি তাকে কেবল আবেগ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো?
লেখক: বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব।
জনতার আওয়াজ/আ আ