সাংবাদিককে মারধরের ৩০ মিনিট পর তিনার ‘অসুস্থতার নাটক - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৮:১৯, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংবাদিককে মারধরের ৩০ মিনিট পর তিনার ‘অসুস্থতার নাটক

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জুলাই ১৩, ২০২৫ ১১:৫০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জুলাই ১৩, ২০২৫ ১১:৫৩ অপরাহ্ণ

 

ইবি প্রতিনিধি
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) অর্থনীতি বিভাগের দুই পক্ষের মারামারিতে সংবাদকর্মীর ফোন কেড়ে নিয়ে সংবাদ সংগ্রহে বাধা ও দফায় দফায় সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার ৩০ মিনিট পরে ‘অসুস্থতার নাটক’ করার অভিযোগ উঠেছে বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের আফসানা পারভিন তিনার ওপর। এছাড়াও ২২ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তথ্যশূন্য (ফ্যাক্টরি রিসেট দেওয়া) ফোন উদ্ধার করলে তা গ্রহণ করেননি ভুক্তভোগী। ভুক্তভোগী হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও জাতীয় দৈনিক আমাদের বার্তার ক্যাম্পাস প্রতিনিধি আরিফ বিল্লাহ।

রবিবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান ওই সংবাদকর্মীর নিকট ফোন হস্তান্তর করতে চাইলে সম্পূর্ণ ফোনের তথ্য উধাও হওয়ার অভিযোগ এনে তা গ্রহণ করেননি সাংবাদিক আরিফ বিল্লাহ।

উক্ত ঘটনায় আহত সাংবাদিকরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ বিল্লাহ (দৈনিক আমাদের বার্তা), একই বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রবিউল আলম (দৈনিক আজকালের খবর) এবং একই শিক্ষাবর্ষের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুর-এ-আলম (বার্তা২৪)।

অপরদিকে অভিযুক্তরা হলেন, অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের আফসানা পারভিন তিনা, নাহিদ হাসান, সাব্বির, মিনহাজ, সৌরভ দত্ত, রিয়াজ মোর্শেদ, সৌরভ সোহাগ ও পান্না এবং একই বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের অজিল, সাইফুল, রাকিব, মশিউর রহমান রিয়ন ও হৃদয়সহ ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী।

জানা যায়, গত শনিবার বিকাল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ফুটবল মাঠে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি বিভাগের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। সাংবাদিক আরিফ বিল্লাহ মারামারির ভিডিও করতে গেলে তার মোবাইল কেড়ে নেন অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের আফসানা পারভিন তিনা। পরে অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. পার্থ সারথি লস্করের নিকট শিক্ষার্থীরা ফোনটি জমা দেন। পরবর্তীতে সভাপতি ফোনটি প্রক্টরের নিকট জমা দেন। তবে দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা পর সাংবাদিক আরিফ বিল্লাহ প্রক্টরের কাছ থেকে ফোনটি সংগ্রহ করতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উধাওয়ের অভিযোগ তুলে তা গ্রহণ করেননি।

ফ্যাক্টরি রিসেট দিয়ে মোবাইলের সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উধাও করার অভিযোগ তুলে সাংবাদিক আরিফ বিল্লাহ বলেন, “ভিডিও করার সময় এক মেয়ে এসে আমার মোবাইল কেড়ে নেয়। আমি মোবাইল কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ৮-১০ জন ছেলে এসে আমাকে ঘিরে ধরে এবং চড়, থাপ্পড়, ঘুষি মারা শুরু করে। প্রক্টর অফিসে যাওয়ার পর ২২ ঘণ্টা পর আমার ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়। তবে ফোনটি চালু করে দেখি ফোনে কোনো তথ্য নেই। ফোনটি ফ্যাক্টরি রিসেট বা ফ্ল্যাশ করা হয়েছে। ফোনে আমার ও আমার বাবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ছিল। তাই প্রক্টর অফিস থেকে ফোনটি ফেরত নিইনি। এ ঘটনার তদন্তপূর্বক বিচার এবং আমার ফোনের সমস্ত তথ্য ফেরতপূর্বক ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি।”

অন্য ভুক্তভোগী রবিউল আলম বলেন, “তারা আমাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। বিশেষ করে অর্থনীতি বিভাগের নাহিদ হাসান আমার তলপেটে লাথি মারে।”

আরেক ভুক্তভোগী নূর-ই-আলম বলেন, “আমি ভিডিও ধারণ করতে গেলে ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী আমাকে মারধর করে। এর কিছুক্ষণ পরে অন্য সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে এলে তাদের ওপর ফের হামলা চালান তারা। আমি হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

অভিযুক্ত নাহিদ হাসান বলেন, “আমাদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হয়। এ সময় আমি সাংবাদিক কাউকে মারিনি। আমার গলা ধরছে তখন আমি কী করব?”

অন্য অভিযুক্ত আফসানা পারভিন তিনা ও রিয়াজ মোর্শেদ বলেন, “বিভাগের শিক্ষকেরা বিষয়টি সমাধান করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”

এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নারী শিক্ষার্থীকে ভিকটিম সাজিয়ে নতুন ইস্যু তৈরি করার চেষ্টা করছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযোগ করছেন, প্রক্টরের সামনে তাদের বিভাগের বান্ধবী আফসানাকে সাংবাদিকরা মারধর করেছে। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাও নিয়েছেন ওই ছাত্রী। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ইশতিয়াক ফেরদৌস ইমন বলেন, “আমি যত সময় সেখানে ছিলাম, কোনো মেয়ের ওপর হামলা হতে দেখিনি।”

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সহ-সমন্বয়ক গোলাম রাব্বানী বলেন, “আমি প্রায় পুরো ঘটনার সময়ে সেখানে ছিলাম। আমি ওই মেয়েকে মারধর করতে দেখি নি। আমার দেখার বাইরে কিছু হয়েছে কিনা জানি না। তবে ঘটনা শেষ হওয়ার পর প্রক্টর স্যার ও সমন্বয়ক সুইট ভাই শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলছিলেন। এ সময় সেই মেয়ে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে সে নিজেকে অসুস্থ দাবি করলে তাকে প্রক্টর স্যারের গাড়িতে মেডিকেলে পাঠানো হয়।”

এদিকে একই হলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী তিনার সম্পর্কে বলেন, “তিনা হলে একদিন নাচতে নাচতে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ওর অজ্ঞান হওয়ার রোগ আছে তাহলে। খালি নাটক করছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. সাহেদ আহম্মেদ বলেন, “ছাত্রীর গায়ে কোনো আঘাত লাগার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে আতঙ্কগ্রস্ত বা প্যানিক অ্যাটাকে এমন হতে পারে।”

এছাড়া মেডিকেল সেন্টারের একাধিক সূত্র জানায়, মেয়েটিকে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে। আক্রান্ত না হয়েও সে আক্রান্তের অভিনয় করছে বলে মনে হচ্ছে।

এই বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভাগের শিক্ষকরা আমাদের কাছে ফোন হস্তান্তর করেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিককে ফোন ফেরত দিতে গিয়ে প্রক্টর অফিসে ফোনটি চালু করলে দেখা যায়, ফোনে কোনো তথ্য ছিল না। পরে ওই সাংবাদিক ফোনটি আমাদের কাছে রেখে গেছে।”

আপনার সামনে মেয়েকে মারধর করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, “আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না।”

অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি ড. পার্থ সারথি লস্কর বলেন, “আজকে অর্থনীতি বিভাগের আন্তঃশিক্ষাবর্ষ খেলা ছিল। সেখানে ২০১৯-২০, ২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের খেলা ছিল। শুনেছি মারামারির ঘটনা ঘটেছে। তবে সেখানে ঠিক কী হয়েছে জানি না। বিষয়টি নিয়ে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।”

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এয়াকুব আলী বলেন, “সাংবাদিকদের অবমাননা করা উচিত হয়নি। প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করলে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ ছাড় দেওয়া হবে না। সাংবাদিকদের কারণেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ভালো আছে। সাংবাদিকদের তাদের পেশাগত দায়িত্ব সম্মানের সঙ্গে পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনেরও সহযোগিতা করা উচিত।”

উল্লেখ্য, এই ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে উপযুক্ত বিচার দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র শিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, খেলাফতে মজলিস ও জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া। এছাড়াও রবিবার (১৩ জুলাই) দুপুর দেড়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেন।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ