স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকা কঠিন:ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৯:২৬, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৯ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকা কঠিন:ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬ ৩:৪৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬ ৩:৪৮ অপরাহ্ণ

 

স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকা সবসময়ই কঠিন। কিন্তু রাজনীতিতে যখন সেই স্রোত জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, তখন তার বিপরীতে দাঁড়ানো কেবল কঠিন নয়—আত্মঘাতীও বটে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া প্রিয় দল বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস ছিল—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, নেতৃত্বকে সে কথা বুঝাতে সক্ষম হইনি।

আমার আগের কয়েকটি লেখায় আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলাম। রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো বিকল্প নেই। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি যে ইশতেহার দিয়েছিলো, এবারও অনেকগুলো একই ইশতেহার। প্রশ্ন হলো বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেগুলো বাস্তবায়ন করলো না কেনো – এ প্রশ্নের কি উত্তর আছে বিএনপির কাছে? যাক, আমি জনাব তারেক রহমানকে সরাসরি বার্তা দিয়েও চেষ্টা করেছি। শহীদ জিয়ার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দলটির প্রতি আবেগ থেকেই এই প্রচেষ্টা ছিল। ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নয়, বরং দল ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই আমার উদ্বেগ।

প্রশ্ন হলো—দেশের মানুষ কী চেয়েছিল?
মানুষ চেয়েছিল ফ্যাসিবাদের বিলুপ্তি। চেয়েছিল ভোটাধিকার ফিরে পেতে। চেয়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাপন, নাগরিক অধিকার এবং কথা বলার স্বাধীনতা। বিগত দেড় দশকে যে দমন-পীড়ন চলেছে, তার শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা—বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের হাজার হাজার কর্মী।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগোবে, এবং বিএনপির নেতৃত্বে আগামীর সরকার গঠিত হবে। জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটলো, তা জনআকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিএনপি এমন এক অবস্থান নিলো, যা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কে বা কারা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে — তা আজও আমার বোধগম্য নয়।

এরপর দেশে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো—খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি—এসবের অভিযোগে দলটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থানের অভাবে দেশবাসী হতবাক। ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির ফাঁদে পা না দিলে জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হতে পারতো। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় দেখা গেল, বিএনপির প্রতি মানুষের সমর্থন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করেছে।

শেষ ভরসা ছিল জনাব তারেক রহমান। কিন্তু তার সাম্প্রতিক জেলা সফরের বক্তব্যে দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। একটি জাতির নেতৃত্ব দিতে হলে শুধু আবেগ নয়, প্রজ্ঞা ও বাস্তব জ্ঞান অপরিহার্য।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে জনআকাঙ্ক্ষাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করেছে। তারা স্পষ্টভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান, সংস্কার এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার হয়েছে। ফলে তারা দ্রুত জনসমর্থনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। রাজনীতিতে শূন্যস্থান কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না—একটি শক্তি দুর্বল হলে অন্যটি সেই স্থান দখল করে।

বিএনপির অতীত ভুলের কারণেই ১৫ বছর ধরে জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা শাসনব্যবস্থা টিকে ছিল—এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেয়া যায় না। ফ্যাসিবাদী শাসন অপসারণের সংগ্রামে প্রায় দেড় হাজার প্রাণহানি ও ত্রিশ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে—এ এক নির্মম বাস্তবতা। এই আত্মত্যাগের মূল্য রাজনীতিকদের ভুল সিদ্ধান্তে ম্লান হতে পারে না।

৫ আগস্ট-পরবর্তী ভুলের জন্য বিএনপিকে কতদিন যে মাসুল দিতে হবে—তা সময়ই বলবে। যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুতি অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হবে। কারণ, একবার কোনো দল জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হলে, তাকে সরানো সহজ হয় না।

রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা অর্জন যেমন কঠিন, হারানো তত সহজ। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু যদি সেই স্রোত জনগণের হৃদয়ের স্পন্দন হয়—তবে তার বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ