ইতিহাসের সেরা নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ৭:৫১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ৭:৫২ অপরাহ্ণ

অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে গণতন্ত্রের নবযাত্রার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। এমন নির্বাচন দেশের ইতিহাসে আর হয়নি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবারই বলেছেন, ‘ইতিহাসের সেরা’ এবং ‘বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী’ নির্বাচন উপহার দেবেন। তার কথা মতোই তা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বারবার নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বলা বাহুল্য, প্রধান উপদেষ্টা ও তার পরিষদবর্গ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও তার সহকর্মী, সেনাপ্রধান এবং তার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর আন্তরিক যৌথপ্রয়াসে এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তাদের অল আউট এফোর্টের কারণে তা সম্ভব হয়েছে। সৎ ও আন্তরিক হলে যে উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নির্বাচন করা যায়, তা তারা করে দেখিয়েছেন। তাদেরকে অকুণ্ঠচিত্তে আমরা ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসারসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখতে যে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাই। সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী বিএনপি, জামায়াত জোটসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও পারস্পরিক বিদ্বেষে না গিয়ে নির্বাচনকে সফল করতে সহায়তা করেছে। সকল স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতার জন্যই এমন অসাধারণ একটি নির্বাচন হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এই নির্বাচনের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। দেশের মানুষের কাছে এ নির্বাচন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নির্বাচন হওয়া নিয়ে বিগত দেড় বছরে নানা শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার দোলাচাল ছিল। অব্যাহতভাবে নির্বাচন বানচালের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল। নির্বাচনের আগে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনা নির্বাচন বয়কট করার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। তবে তাতে দেশের মানুষ সাড়া দেয়নি। শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষের সহযোগিতায় অন্তর্বর্তী সরকার ঐতিহাসিক নির্বাচন করতে পেরেছে। শুধু আমাদের দেশের জন্য নয়, এ নির্বাচন অন্যদেশের জন্যও অনুসরণের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের দেশে অতীতের এমন কোনো নির্বাচন নেই, যাতে কম-বেশি সহিংসতা, সংঘাত, মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এসব ঘটনা উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের দিন কোথাও তেমন কোনো সংঘাত হয়নি, রক্ত ঝরেনি। ভোটের এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাই আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঈদ উৎসবের মতো ভোট দিতে গিয়েছে। দেড়যুগের বেশি সময় ধরে মানুষ এমনভাবে ভোট দিতে পারেনি। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলের তিনটি নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার বলে কিছু ছিল না। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে হুকুমের গোলামে পরিণত করে রেখেছিল। এবারের ইতিহাস সৃষ্টিকারি নির্বাচনের পর দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেছেন, শেখ হাসিনা আমাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রেখেছিল। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর এবারের নির্বাচনে স্বাধীনমতো ভোট দিয়ে নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরে সেই কলঙ্কমুক্ত হতে পেরেছি। বলা বাহুল্য, ’২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দেশের মানুষকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ জীবন দিয়ে দেশের উপর দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চেপে বসা হাসিনার ফ্যাসিজম উৎখাত করেছে। এ ধরনের গণঅভ্যুত্থান বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়। জেন-জিদের নেতৃত্বে ফ্যাসিজম উৎখাতে বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানের প্রভাব বিশ্বের অনেক দেশে পড়েছে। নেপালসহ বেশ কিছু দেশে দুর্বিনীত শাসক উৎখাতে এই অভ্যুত্থান প্রেরণা জুগিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি। ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ২১৬টি, জামায়াত জোট ৭৬টি এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য পেয়েছে ৭টি আসন। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৬১ শতাংশ ভোট পড়েছে। অন্যদিকে, গণভোটে ‘হা’ ভোট বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়কে আমরা অভিনন্দন জানাই। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাই, তার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব এবং জনগণের আস্থা অর্জনে তার কর্মপরিকল্পনা দলের এই অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। পাশাপাশি জামায়াত এবং এই জোটের অন্যতম তরুণ দল এনসিপিকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। এবারের জাতীয় সংসদ একটি শক্তিশালী ও বৈচিত্রপূর্ণ বিরোধীদল পাবে। ডা. শফিকুর রহমানের মতো বিরোধীদলের নেতাও পাবে। আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, আগামী জাতীয় সংসদ প্রাণবন্ত এবং গণতন্ত্রের নবযাত্রাকে এগিয়ে নিতে সক্ষমতার পরিচয় দেবে। এবারের সংসদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেক তরুণের বিজয়ী হয়ে আসা। বিএনপির যেমন অনেক তরুণ নির্বাচিত হয়েছেন, তেমনি এনসিপির তরুণ নেতৃত্ব, যারা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন যেমন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আখতার হোসেন, আব্দুল হান্নান মাসউদরা নির্বাচিত হয়েছেন। নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় সংসদ যে অনবদ্য হয়ে উঠবে, তা আমরা বলতে পারি। আমরা আশা করি, রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের যে আশা-আকাক্সক্ষা, তা নতুন জাতীয় সংসদ পূরণে সক্ষম হবে। খাদের কিনারে থাকা দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা সুসংহত করা, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণœ রাখাসহ দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা পালন করবে। এটাও বলতে চাই, বিএনপিকে সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষমতার আতিসয্যে ভেসে যাওয়া যাবে না। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, গ্রেট পাওয়ার কামস উইথ গ্রেট রেসপনসিবিলিটি। বিরোধীদলে যারা থাকবে, তাদেরও দায়িত্ব সরকার যাতে সঠিক পথে চলতে পারে, সেক্ষেত্রে ভ্যানগার্ড হয়ে থাকা। কারণ, গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তিশালী বিরোধীদলের বিকল্প নেই।
সম্পাদক
জনতার আওয়াজ
জনতার আওয়াজ/আ আ