হামের প্রকোপ: ছাড়ের আগেই দ্বিগুণ ভর্তি রোগী – জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৭:৫৬, সোমবার, ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৫শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

হামের প্রকোপ: ছাড়ের আগেই দ্বিগুণ ভর্তি রোগী

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, এপ্রিল ১৩, ২০২৬ ৩:৩৮ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, এপ্রিল ১৩, ২০২৬ ৩:৩৮ পূর্বাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত

দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। বাড়ছে মৃত্যুও, যার বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই পরিস্থিতিতে দেশের হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ, অনেক জায়গায় শয্যাসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় অভিভাবকরা আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে রাজধানীমুখী হচ্ছেন, ফলে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বেড়ে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। হাম সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় আক্রান্ত শিশু থেকে ১৫ জন শিশু সংক্রমিত হতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, একজন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়ার আগেই তার স্থানে একাধিক নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, সামগ্রিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে ৫৬টি আইসিইউ শয্যার সবগুলোই পূর্ণ। গত এক দিনে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৭০ জন রোগী, এ সময়ে ছাড়া পেয়েছে ৪৪ জন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩১০ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

ঢাকার শিশু হাসপাতালগুলোতেও একই চিত্র। ৭০টি বেডের বিপরীতে রোগীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগীকেই শয্যা না পেয়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে।

দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, হাম আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে পরে অধিকতর জটিলতা নিয়ে আবারও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। হাম-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও চরম দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারটি শিশুর হামে মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি ছয়টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৬২টি শিশু। এদের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫০ জনের। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৬৩৪ শিশু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, শেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ২৬৮ জনের মধ্যে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৯ দিনে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫১টি শিশুর। এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ১৫ হাজার ৬৫৩ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ২২৫ জন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৬৩৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

অভিভাবকদের অসচেতনতার অভাব রয়েছে
চিকিৎসকের মতে, হামের বিস্তার ঘটার পেছনে অভিভাবকদের অসচেতনতা একটি বড় কারণ। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর জ্বর বা ফুসকুড়িকে গুরুত্ব না দিয়ে দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা নিয়মিত হাত ধোয়া, ভিড় এড়িয়ে চলা এবং জীবাণুনাশক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা করোনাকালের মতোই প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে।

ডিএনসিসি হাসপাতালের ডাক্তার আসিফ আহমেদ হাওলাদার বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা দেখা যাচ্ছে। করোনার মতো সতর্ক থেকে ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।

চার সিটিতে টিকাদান কর্মসূচি
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ঢাকাসহ চারটি সিটি করপোরেশনে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রচলিত নির্দেশনার বাইরে গিয়ে টিকাদানের বয়সসীমাও শিথিল করা হয়েছে। আগে যেখানে ৯ মাস বয়সের পর টিকা দেওয়া হতো, এখন ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিস্তার রোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তবে দেশের অনেক এলাকায় এখনো সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। টিকাদানের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রবিবার (১২ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। ঢাকা ছাড়াও ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় এই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। মূলত ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের এই মরণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষা দিতেই সরকারের পক্ষ থেকে এই জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আয়োজিত এই জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬-এর আওতায় মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিএসসিসি এলাকাজুড়ে সর্বমোট ৫৪০টি টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯০টি স্থায়ী এবং ৪৫০টি অস্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে সেবা প্রদান করবে। ক্যাম্পেইন চলাকালে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হবে। ১২ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত মাসব্যাপী এই টিকাদান কার্যক্রম চলবে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হামসহ অন্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গত ৫ তারিখ থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হলেও আজ থেকে ঢাকা দক্ষিণসহ গুরুত্বপূর্ণ চার সিটি করপোরেশনে একযোগে এই কার্যক্রম শুরু হলো।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ‘হামের প্রকোপ বাড়া উদ্বেগজনক। বর্তমান সরকার এই কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। গণমাধ্যমকে অনুরোধ করব, তারা যেন সচেতনতা বাড়াতে কাজ করেন, বিশেষ করে শ্রমজীবী অভিভাবকদের কাছে টিকার গুরুত্ব পৌঁছে দেন।’

এদিকে রবিবার রাজধানীর কড়াইল এলাকায় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। যেখানে ১০টি অঞ্চলে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ৫৯৯ কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ

 
 
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com