ফৌজদারি অপরাধ ও বিচার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ-অনেক প্রফেশনাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধারণা গলদপূর্ণ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:২২, সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ফৌজদারি অপরাধ ও বিচার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ-অনেক প্রফেশনাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধারণা গলদপূর্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, মে ২৪, ২০২৬ ১০:০৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, মে ২৪, ২০২৬ ১০:০৭ অপরাহ্ণ

 

ফৌজদারি অপরাধ সংক্রান্ত মামলার বাদি হলো রাষ্ট্র। এ জন্য ফৌজদারি মামলাগুলোর শিরোনাম (citation) হয় ‘আসামি বনাম রাষ্ট্র’ বা ‘রাষ্ট্র বনাম আসামি’। যেমন Major (Retd) Bazlul Huda vs. The State [2010] 62 DLR (AD) 1। বৃটেনেও ঠিক একইভাবে বাদি হোন রাষ্ট্রের পক্ষে রাজা। সেখানে ক্রিমিনাল মামলাগুলোর শিরোনাম হয় এভাবে R [Short for Rex (King] v Jogee [2016] UKSC 8, [2017] AC 387. কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে রাষ্ট্র ভিকটিমদের পক্ষ থেকে আসামির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করবে, এরপর যথাযথ তদন্ত করে আপাতদৃষ্টিতে প্রমাণ (prima facie evidence) পেলে চার্জশিট দেবে। প্রসিকিউটর রাষ্ট্রের পক্ষে আসামিকে আদালতে প্রসিকিউট করবে। যথাযথ তথ্য-উপাত্ত, ডকুমেন্ট ও সাক্ষী উপস্থাপন করে রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে যুক্তিতর্ক ও সাবমিশন দিয়ে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করত: আইনের ভেতরে সর্বোচ্চ শাস্তির আহ্বান জানাবে।

অপরদিকে, আসামি যত গুরুতর অপরাধ করুক না কেন তাকে আইন ও সংবিধান কিছু অধিকার দিয়েছে। এটা তার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। যেমন সংবিধানের ৩৩(১) অনুচ্ছেদ প্রত্যেক আসামিকে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার অধিকার দিয়েছে। এই অধিকারগুলো কোনোভাবেই কেড়ে নেয়া যায় না । বা এ অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। এগুলো কেড়ে নিলে বা এগুলো থেকে তাকে বঞ্চিত করলে একদিকে যেমন তার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে, অপরদিকে এই ধরনের প্রসেসকে তো আর বিচার বলা যাবে না, বরং তা হবে প্রতিশোধ নেয়া, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা। প্রত্যেক আসামিকে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ স্বীকার বা খণ্ডন করার সুযোগ দেয়া বিচারব্যবস্থার অংশ। তার পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী আইনের ভেতর থেকে খালাস দেয়ার যুক্তি তুলে ধরবে। দোষী সাব্যস্ত হলেও আদালতে আইনের আওতায় সর্বনিম্ন শাস্তি প্রদানের সাবমিশন পেশ করতে পারবে আসামির আইনজীবী।

সব সময় মনে রাখা প্রয়োজন, আদালতে বিচার করেন ও রায় দেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক। আইনজীবীরা বিচারও করেন না, রায়ও দেন না। তারা নিরপেক্ষও নন বা নিরপেক্ষ হওয়া তাদের পেশার জন্য দরকার বা আবশ্যকীয় নয়। তারা তাদের স্ব স্ব মক্কেলের পক্ষের হয়ে থাকেন। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে- আইনের গন্ডির ভেতরে থেকে তাদের মক্কেলদের সর্বোচ্চ স্বার্থ (the best interest of clients) রক্ষা করা। তবে আইনজীবীদের বলা হয় তারা Officers of the court (আদালতের কর্মকর্তা)। তাদের প্রধান কাজ ও দায়িত্ব (overriding objective) হচ্ছে আদালতকে সহায়তা করা যাতে আদালত ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারে।

ফৌজদারি আদালতে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তা প্রমাণের দায় (the onus of proof) প্রসিকিউশন তথা রাষ্ট্রের। অপরাধ প্রমাণের মানদণ্ড (standard) হচ্ছে সন্দেহাতীতভাবে (beyond reasonable doubt) প্রমাণ করা। আসামিকে প্রমাণ করতে হয় না যে সে নির্দোষ। কেননা ফৌজদারি আইনের শাশ্বত বিধান হচ্ছে “everyone is innocent until proved guilty in a competent court of law (অর্থাৎ “উপযুক্ত আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই নির্দোষ”।

গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রায় সময় মিডিয়ায় দেখা যায় সাংবাদিকরা থানার গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে অনেক সময় থানার ওসি বলেন, “আমরা এখনও লিখিত অভিযোগ পাইনি, পেলে ব্যবস্থা নেব”। লিখিত অভিযোগ পেতে হবে কেন? ফৌজদারি অপরাধ ও বিচার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তো বটেই অনেক প্রফেশনাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধারণা গলদপূর্ণ। রাষ্ট্রের কোনো জায়গায় কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা স্বয়ংক্রীয়ভাবে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ক্রিমিনাল জুরিস্প্রোডেন্সের শাশ্বত নীতি এটি। এটি আধুনিক রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজের ভিত।

জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অনেক স্থানীয় আইনজীবীদের সংগঠন তথা বার এসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নেয় আমরা অপরাধীর পক্ষে দাঁড়াবো না। এটা কোনো বার এসোসিয়েশন কোনোভাবেই করতে পারে না। এই ভূমিকা বার কাউন্সিলের কোড্ ও এথিকসের লঙ্ঘন। প্রত্যেক আসামির আইনি সহযোগিতা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার আছে, সে যত বড় অপরাধীই হোক না কেন। আইনজীবী তার পক্ষে না দাঁড়ালে বরং সেই অপরাধীর উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেননা সে উচ্চ আদালতে সাবমিশন দেবে নিম্ন আদালতে আইনি সহায়তা না পাওয়ার কারণে তার আইনগত, মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং তার উপর অবিচার করা হয়েছে- এই মর্মে!

ফৌজদারি মামলার বাদি হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রসিকিউটর (নিম্ন আদালতে) এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস (উচ্চ আদালতে) ভিক্টিমকে রিপ্রেজেন্ট করবে। প্রয়োজনে দেশের সেরা ফৌজদারি আইনে বিশেষজ্ঞ এমন আইনজীবীকে বা একাধিক আইনজীবীকে তারা নিয়োগ দেবে। কোনো আইনজীবী তিনি যত বড় আইনজীবী হোন না কেন তার নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে বলা উচিত নয় যে, আমরা ভিকটিমের আইনজীবী হয়ে লড়বো। এটা অনেকটা ঘোড়াকে ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়ার মতো। শত বছরের ক্রিমিনাল জুরিস্প্রোডেন্স এটা সাপোর্ট করে না। উন্নত বিচারব্যবস্থার দেশ বৃটেনে এমনটি কখনও হয় না। বরং এমনটি করলে কিছু লোকের যে ধারণা “দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সঠিকভাবে ফাংশন করছে না” এটি বরং আরো জোরালো হবে।

আদালত ও বিচার আবেগ দিয়ে চলে না। আবেগে অনেক কিছু বলা যায়। জনগণের আবেগ নিয়ে রাজনীতিও করা যায়। কিন্তু রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থা চলে একটি নিয়ম ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও নিশ্চিত করতে হলে বিচারব্যবস্থার সব ধাপ (গ্রেপ্তার, তদন্ত, চার্জশিট, ট্র্যায়েল ও আপিল) যথাযথ ও সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে অতি তাড়াহুড়া করা অনেকটা বিচারকে কবর দেয়ার নামান্তর। কথায় বলে “justice hurried is justice buried” (অর্থাৎ “তাড়াহুড়ো করে বিচার হলো বিচারকে চাপা দেয়া”)। মনে রাখতে হবে, শত শত অপরাধী পার পেয়ে গেলেও একজন নিরাপরাধ ব্যক্তিও যেন অন্যায় ভাবে সাজা না পায় – এটি হচ্ছে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মূল মন্ত্র।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু লোমহর্ষক ঘটনা পুরো জাতিকে হতবাক করেছে। করেছে স্তম্ভিত। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলছে। তবে হ্যাঁ, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার ব্যাপারে সরকার ও বিচার বিভাগকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা অনেকটা অবিচারের সমান। William Ewart Gladstone বলেছেন “Justice delayed is justice denied (অর্থাৎ “বিচার বিলম্বিত হলে তা বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ারই সমান”)। আর এটা মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে ও আদালত থেকে আস্থা ফিরিয়ে নিতে প্ররোচিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় আসামি তার অপরাধ স্বীকার করে। তাছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন, ডিএনএ টেস্ট) মাধ্যমে আসামির সংশ্লিষ্টতা মোটামুটি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ১/২ সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতে শুনানি করে চুড়ান্ত রায় দেয়া সম্ভব। তাই এ ধরনের অপরাধের বিচারের জন্য বাছাই করে বিশেষজ্ঞ বিচারকদের নিয়ে “স্পেশাল দ্রুত বিচার আদালত বা ট্রাইব্যুনাল” স্থাপন করা যেতে পারে। প্রধান বিচারপতি চাইলে হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ গঠন করে দিতে পারেন শুধুমাত্র এই লোমহর্ষক মামলাগুলোর আপিল বা রেফারেন্স শুনানির জন্য। এতে হাইকোর্টে এ ধরনের মামলার আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রিতার অবসান হবে। আপিল বিভাগেও প্রধান বিচারপতি একটি এক্সক্লুসিভ বেঞ্চ গঠন করে দিতে পারেন। নিদেনপক্ষে সপ্তাহে নির্দিষ্ট করে একদিন বা দু’দিন আপিল বিভাগে এ ধরনের আপিলের শেষ (সর্বশেষ ধাপ) শুনানি জন্য প্রধান বিচারপতি ফিক্সড করে দিতে পারেন। এটি করলে এ ধরনের মামলার আপিলের সর্বোচ্চ ধাপের নিষ্পত্তি দ্রুততম সময়ে সমাপ্ত হবে।
সবকিছু মিলিয়ে সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে এবং প্রধান বিচারপতি যদি সক্রিয় (proactive) ও তৎপর হোন তাহলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো এমন লোমহর্ষক অপরাধের বিচারের সব স্টেজ সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে ট্রায়াল থেকে আপিলের সব ধাপ সমাপ্ত করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। এমনটি হলে অন্যান্য্য অপরাধীর জন্য এটি সত্যিকার Deterence (প্রতিরোধ) হিসেবে কাজ করবে। ভিকটিম ও তার পরিবার পাবে ন্যায় বিচার। আর এতে বিচার বিভাগের উপর মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাবে ও সুদৃঢ় হবে।

লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ