জারহাট উপজেলা হাসপাতালে জনবলের অভাবে সার্জারি করেন রাঁধুনি-মালি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:৫৯, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জারহাট উপজেলা হাসপাতালে জনবলের অভাবে সার্জারি করেন রাঁধুনি-মালি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, মে ২৪, ২০২৩ ১১:২৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, মে ২৪, ২০২৩ ১১:২৮ অপরাহ্ণ

 

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

জনবল সংকটের কারণে কুড়িগ্রামের রাজারহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন, সার্জারিসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি কার্যক্রম মুখ থুবরে পড়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছে সাধারণ রোগীরা। হয়রানির শিকার হয়ে চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যাচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালের রাঁধুনি, মালি আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই সার্জারি ও অপারেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে চিকিৎসা নেয়া রোগীরা জানান। এদিকে গত ১৬ মে মহামান্য হাইকোর্টের একজন আইনজীবী আলহাজ্ব মো. আসাদুজ্জামান আনসারী বিষয়টি নিয়ে রিট করেন। পরদিন আদালতের বিচারপতি জেবিএম হাসান ও রাজিক আল জলিলের দ্বৈত বেঞ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে জনবল সংকটের তালিকা চেয়ে আদেশ দেন।

মঙ্গলবার (২৩ মে) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায় পরিচ্ছন্নকর্মী মিজানুর রহমান জরুরি বিভাগে অপারেশন করছেন। ক্যামেরা দেখে দ্রুত সরে পড়েন তিনি। পাশে বসে ছিলেন গাইনী চিকিৎসক ডা. নাহিদ ও একজন সিনিয়র নার্স। তারাও ক্যামেরা দেখে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে অপারেশনে হাত লাগান।

জানা গেছে, রাজারহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসকের সাথে সার্জারিতে অংশ নেন অবসর নেয়া পরিচ্ছন্নকর্মী রবি দাস। শুধু অপারেশন থিয়েটার নয়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও তিনি সার্জারির কাজ করে আসছেন নিয়মিত। তার মতো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগসহ অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়মিত সার্জারির কাজ করেন রাঁধুনি, মালি এবং পরিচ্ছন্নকর্মী। আর এই কাজ করে রোগীদের নিকট হতে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে থাকলেও রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে নেয়া হয়নি কোন কার্যকরি পদক্ষেপ। ফলে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা থেকে বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছে দেশের দারিদ্রপীড়িত এই অঞ্চলের মানুষ।

সাবেক পরিচ্ছন্নকর্মী রবি দাস বলেন, আমি গত ১ ডিসেম্বরে ঝাড়ুদার পদ থেকে অবসর নিয়েছি। ওটি এবং জরুরি বিভাগে নিয়মিত কাজ করে আসছি। ড্রেসিং এবং সেলাইয়ের কাজ করতে পারি। সাবেক অনেক চিকিৎসকের সাথেও আমি কাজ করেছি। কিন্তু কাগজে নিউজ প্রকাশ হওয়ায় আমি আর এসব কাজ করছি না। রাঁধুনি বাচ্চু মিয়া বলেন, আমার পদ রাঁধুনি হলেও আমি জরুরি বিভাগের সব কাজই পারি। এর আগেও আমি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ফুলবাড়িসহ অন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ড বয় হিসেবে কাজ করেছি। এই হাসপাতালে ওয়ার্ড বয় না থাকায় জরুরি বিভাগ দায়িত্ব পালন করছি। আমার মতো হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মালি পদের দেলোয়ার হোসেন, মিজানুরও কাজ করে থাকেন।

স্বেচ্ছাসেবক মালি পদের দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমি ফুলের বাগান দেখভালের জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। জরুরি বিভাগেও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা করেন। পাশাপাশি সেলাই ও ড্রেসিংয়ের কাজও করতে পারেন বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের দুইজন চিকিৎসক দাবি করছেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে যে কাউকে যেখানে সেখানে কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু এখন রবি, দেলোয়ার, মিজানুররা আর সহযোগী হিসেবে থাকেন না। ফলে রোগীদের ছোটখাটো অপারেশন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আসলে অপারেশনটা ডাক্তারদের একটা টিম ওয়ার্ক। একজন না থাকলে কাজ করা সম্ভব হয় না। আর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় লোকজনও নেই। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতে লোক নিয়োগ বন্ধ রযেছে। সহযোগী না পেলে অপারেশন করা যায় না।

এদিকে একাধিক রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এখনো ওই হাসপাতালের রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নকর্মী আর মালিরাই সার্জারি ও অপারেশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলার বৈদ্যের বাজারের বাসিন্দা শ্রী বাবলু চন্দ্র রায় বলেন, আমার মায়ের বয়স প্রায় ৭৫ বছর। তার বাম পা একটু কেটে গিয়ে ইনফেকশন হয়ে পায়ে পচন ধরেছে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা নেয়া হচ্ছে। রবি ভাই, দেলোয়ার ভাই আমার মায়ের পা ড্রেসিং করেন নিয়মিত। এজন্য আমি খুশি হয়ে তাদেরকে ড্রেসিং করার সময় কিছু বকশিস দেই যেন ভালো করে কাজ করেন।

বোতলার পাড় গ্রামের আনোয়ারা বেগম বলেন, আমার পুত্রবধুর ইনফ্লাম খোলার জন্য রাজারহাট হাসপাতালে এসেছি। সেখানে কাজ করা লোকদের তো নাম জানি
না। কালো করে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি থাকা এক ব্যক্তি ইনফ্লাম খুলে দিয়ে ১০০ টাকা নিয়েছে। আবার এক সপ্তাহ পর ডেকেছে। ছাটমল্লিক বেগ গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার ডান পাশে কোমড়ের উপরে একটি টিউমার হয়েছে। এটা দেখানোর জন্য রবি ভাইয়ের কাছে এসেছি। তিনি কি পদে কাজ করেন সেটা তো বলতে পারিনা। এর আগেও তার কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছি।

ভুক্তভোগী রোগী দেবিচরণ গ্রামের বাসিন্দা সুনিল চন্দ্র রায় বর্মন বলেন, পারিবারিক কোন্দলের জেরে আমার উপর হামলা হয়। এতে করে আমার ডান হাতের আঙ্গুল ও বাম হাতের একটি আঙ্গুলে কোপ লেগে কেটে যায়। পরে আমি হাসপাতাল গিয়ে দেখি দেলোয়ার ভাই অন্য রোগীদের ড্রেসিং করছেন। আমার ভাঙ্গা হাতে প্লাষ্টার করেন ডা. বাপ্পি স্যার এবং দেলোয়ার ভাই কাটা আঙ্গুলে সেলাই করেন। সেলাই করতে গিয়ে সুঁচের ঘুতা লাগে আঙ্গুলের হাড়ে এতে করে আমি কিছুটা ব্যথা অনুভব করি। কিছু দিন চিকিৎসা নেবার পর এখন আমি বাড়িতে চলে আসছি।

মেকুরটারি গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, এই হাসপাতালে ঝাঁড়ুদার সেলাই করে আবার সেই ঝাড়ুদারে ঔষধ দেয়। ভর্তি রোগীদের দেখতে নিয়মিত ডাক্তাররা রাউন্ট দেয় না। একবার দেখলে পরের দিন আবার আসে ডাক্তার। সঠিকভাবে রাজারহাট উপজেলার মানুষ চিকিৎসা, ঔষধ পায় না। এই হাসপাতালে তিনজন ওয়ার্ডের বিপরীতে আছে একজন। সে বর্তমানে কর্মরত আছেন উমর মজিদ ইউনিয়ন সাব সেন্টারে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে এই হাসপাতালটি ২৫ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। মেডিকেল অফিসার ১০ জনের স্থানে আটজন, নার্সিং সুপারভাইজার ১৫১ জন, সিনিয়র নার্স ২৬ জন, মিড ওয়াইফ ছয়জন, ল্যাব টেকনিশিয়ান দুইজন, প্রধান সহকারি একজন, অফিস সহায়ক তিনজন, ফার্মাসিস্ট দুইজন, পরিসংখ্যান একজন, স্বাস্থ্য পরিদর্শক দুইজন, এ্যাম্বুলেন্স চালক একজন, মালি একজন, মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট সাতটি পদে মধ্যে পাঁচজন, পরিচ্ছন্নকর্মী পাঁচটি পদের মধ্যে তিনজন রয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারি ৩০টি পদের মধ্যে ১৭ জন, সহকারি স্বাস্থ্য পরিদর্শক ছয়টি পদের মধ্যে চারজন, ওয়ার্ড বয় তিনটি পদের মধ্যে আছে একজন। এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেন্টাল চিকিৎসক, এমটি ডেন্টাল, ইপিআই, রেডিও গ্রাফার, কার্ডিওগ্রাফার, ক্যাশিয়ার, স্টোরকিপার, জুনিয়র মেকানিকেলগুলো শূন্য রয়েছে।

প্রয়োজনীয় লোকজন না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্জারি করছেন ওই হাসপাতালের রাঁধুনী, পরিচ্ছন্নকর্মী আর মালি। এতে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। এমন প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ‘টক অফ দ্য রাজারহাটে’ পরিণত হয়। সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জনবল সংকটকে দায়ী করেন।

রাজারহাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি যেহেতু হাইকোর্টে মামলা হয়েছে। শুনানীও হয়েছে। কিন্তু আমরা কোন কাগজ পাইনি। কুড়িগ্রাম জেলার সকল হাসপাতালের জনবলের তালিকা কুড়িগ্রাম সির্ভিল সার্জন সাহেব পাঠাবেন।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ