বাড়ছে বামদল, ভোটের মাঠে ‘ঠনঠন’ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:০০, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাড়ছে বামদল, ভোটের মাঠে ‘ঠনঠন’

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২৬, ২০২২ ৬:০০ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২৬, ২০২২ ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

 

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

দেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলো নানা সমস্যা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আদর্শগত রাজনীতি করতে গিয়ে তাদের মধ্যে অন্তর্গত কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। আবার নতুন দল আসলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে সুবিধা করছে পারছে না। বর্তমানে ২১টি বাম রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে বেশিরভাগেরই সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল। ফলে নতুন নতুন বাম দল আসলেও তারা ধোপে টিকতে পারছে না। পারছে ভোটের বাক্সে ভাগ বসাতে।

আদর্শ আর কৌশলগত দিক এক হলেও স্বার্থের দ্বন্দ্বেই ছোট জোটগুলোতে চলছে ভাঙা গড়ার খেলা। স্বার্থের দ্বন্দ্বে ছোট জোটগুলো বার বার ভঙ্গনের মুখে পড়ছে। ফলে জোট গঠনের লক্ষ্য অর্জনে দলগুলো খেই হারাচ্ছে বারবার। এর ফলে দেশের ছোট রাজনৈতিক জোটগুলো ভেঙে টুকরা টুকরা হচ্ছে। এবার ভাঙনের মুখে পড়লো বাম গণতান্ত্রিক জোট।

রাজনীতিতে সাত দল ও সংগঠনের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সাত দলের শীর্ষ নেতারা ঐকমত্য হয়েছেন। নতুন ওই মঞ্চের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়েও বাম জোটে রয়েছে প্রবল মতবিরোধ। ফলে বামপন্থিদের বৃহত্তর এই জোটে ভাঙনের আশঙ্কাও করছেন অনেকেই।

বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দলের পরই সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেশি। এই দলগুলোর মধ্যে অর্ধেক নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত এবং নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছে আরও কয়েকটি দল। দলের সংখ্যার দিক থেকে ডান-গণতান্ত্রিক ধারার দলগুলোর চেয়ে সংখ্যায় বেশি হলেও বামদলগুলো ভোটে অনেক পিছিয়ে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গৃহীত ৫৫ শতাংশ ভোটের ৩.২৩ শতাংশ ভোট পেলেও সর্বশেষ নবম সংসদ নির্বাচনে সে সংখ্যা আরও কমে যায়।

বামদলগুলোর নেতারা এ বিষয়টিকে নিজেদের ‘দুর্বলতা’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের ভাষ্য, আদর্শগত রাজনীতি করতে গিয়ে বাম দলগুলোর মধ্যে অন্তর্গত কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে এসব সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধান করতে পারলেই একটি বিকাশমান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাম জোট রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে দেখা দেবে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের দাবি, বামপন্থীদের শক্তি এখন দুর্বল এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। কিন্তু একটি বিকাশমান শক্তি হিসেবে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বামদলগুলোর। যদি মিলিত ভাবে বাম দলগুলো তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে পারে এবং কোন ধরনের ক্রটি-বিচ্যুতির মধ্যে না পড়ে তাহলে আগামীতে বামপন্থীরা জাতির সামনে একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।

এ বিষয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, বামপন্থীদের নানান সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। শাসকশ্রেণির বাধা, লুটপাটের রাজনীতি, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাম আন্দোলন বিকাশের প্রধান বাধা। পাশাপাশি বামপন্থীদের নিজেদের ভেতরে কিছু সমস্যা রয়েছে। এর ফলে  পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে জনগণের কাছাকাছি যেতে হবে বামদের সেই ভাবনা-চিন্তায় এখনও যথেষ্ট পরিণতি আসেনি। তারপরও জনগণের কাছে বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে ধীরে ধীরে।

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক (বাম) দলের সংখ্যা ১০টি। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল)- সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)- সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)- চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি- সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি- সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-সভাপতি হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) চেয়ারম্যান ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী।

তবে এর বাইরেও অনিবন্ধিত রয়েছে আরও কমপক্ষে ১৪টি দল। অনিবন্ধিত দলগুলো হচ্ছে গণতন্ত্রী পার্টি-সভাপতি ব্যারিস্টার মো.আরশ আলী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, বাসদ-আহ্বায়ক মবিনুল হায়দার চৌধুরী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)- আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি- সভাপতি জাকির হোসেন, গণসংহতি আন্দোলন-প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি-সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ- আহ্বায়ক প্রফেসর আবদুস সাত্তার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন-আহ্বায়ক হামিদুল হক, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল-সভাপতি বদরুদ্দীন উমর, জাতীয় গণফ্রন্ট- সমন্বয়ক টিপু বিশ্বাস, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ- আহ্বায়ক মাসুদ খান, কমিউনিস্ট কেন্দ্র- আহ্বায়ক ড. ওয়াজেদ ইসলাম খান, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (সাইদ আহমেদ)।

বাম দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বধীন ১৪ দলীয় জোটে আছে ১০টি দল। এই দলগুলো হলো- ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু), জাসদ (বাদল), ন্যাপ (মোজাফফর), গণতন্ত্রী পার্টি, গণআজাদী লীগ, বাসদ (রশীদ খান), কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, সাম্যবাদী দল।

আর ২০ দলীয় জোটে রয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)- চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (সাইদ আহমেদ)।

এর বাইরে বাম দলগুলোর আরও ২টি জোট রয়েছে। সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) মিলে গঠন করা হয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। আর জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এই তিন দল নিয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় মুক্তি জোট।

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাম দলগুলো ভোটের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে তাদের ভোট কমছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বামদলগুলো সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ৩.২৩ শতাংশ। সেখানে নবম সংসদে বাম দলগুলো সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে ০.৯ শতাংশ। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারের সঙ্গে থাকা ২টি বাম দল ছাড়া অন্যরা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এই সংসদে দলগুলো ভোট পেয়েছে ৩.২৯ শতাংশ। এই সংসদে বিএনপিও অংশগ্রহণ করেনি।

দশম সংসদে ওয়ার্কাস পার্টির (মেনন) ৬ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এরমধ্যে দু’জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। দলটি ১৮ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ২.১০ শতাংশ। আর জাসদ (ইনু)থেকে নির্বাচিত হন ৫ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে ৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। দলটি ২৪ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১.১৯ শতাংশ । যদিও পরবর্তীতে দলটি ভেঙে যাওয়ায় জাসদ (ইনু) ও জাসদ (আম্বিয়া-বাদল) নামে পরিচিত হয়। সংসদ সদস্যরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যান।

নবম সংসদে ওয়ার্কাস পার্টি ৫ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২টি আসনে জয় পায়। দলটি ভোট পেয়েছে ০.৩ শতাংশ। আর জাসদ ৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৩ টি আসনে জয়লাভ করে। ওই সংসদে দলটি ভোট পেয়েছে ০.৬ শতাংশ। এর আগে সপ্তম সংসদে জাসদ ৭৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১ টি আসনে জয়লাভ করে। এ সংসদে দলটি ভোট পেয়েছে ০.২৩ শতাংশ।  তবে অষ্টম ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামদলগুলো অংশে নেয়নি।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৭টি বাম দল অংশগ্রহণ করে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল(জাসদ-ইনু) ৬৮  আসনে প্রার্থী দিলেও কোনও আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। দলটি ভোট পায় ০.০৫ শতাংশ।  জাসদ (রব) ১৬১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনেও জয় পায়নি। তারা ভোট পায় ০.৭৯ শতাংশ। জাসদ (সিরাজ) ৩১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনে জয় পায়। তারা ভোট পায় ০.২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৪৯ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৫ টি আসনে জয়লাভ করে। তারা ভোট পায় ১.১৯ শতাংশ। ওয়ার্কার্স পার্টি ৩৫ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১ টি আসনে জয়লাভ করে। দলটি ভোট পায় ০.১৯ শতাংশ। গণতন্ত্রী পার্টি ১৬ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১টি আসনে জয়লাভ করে। এই দল ভোট পায় ০.৪৬ শতাংশ। ন্যাপ (মোজাফফর) ৩১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১ টি জয়লাভ করে। তারা ভোট পায় ০.৭৬ শতাংশ।

ভোটে পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়ে রাজনীতি বিশ্লেষকদের ভাষ্য, একজন বামপন্থী শ্রমিককে মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে এবং মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নির্বাচন করতে হয়। অন্যদিকে লুটপাটের টাকা দিয়ে মানুষের বিবেক ও ভোট ক্রয় করা হচ্ছে যা বামদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। পেশি শক্তি, টাকার শক্তি এবং ভোট জালিয়াতি করে গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থাকে বিকল করে দিয়েছে ক্ষমতায় থাকা দলগুলো। সেখানে ভোটের সঠিক চিত্র মানুষ দেখতে পায় না। এই রকম পরিস্থিতিতে মানুষের সমর্থন থাকলেও সেটাকে ভোটে প্রতিফলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা ভোট কমার অন্যতম কারণ।

বাম নেতাদের দাবি, ভোট কমে যাওয়ার দুটি বড় কারণ রয়েছে। একটি হচ্ছে, এখন মানুষ মনে করে বামরা ভালো কথা বলে, কিন্তু তারা তো ক্ষমতায় যেতে পারে না। তাই বামদের ভোট দিতে চায় না তারা। আর নির্বাচনে এখন যেভাবে টাকা দিয়ে ভোট ক্রয় করা হয় সেখানে বামরা পিছিয়ে আছে। কারণ বামদের এতো টাকা নেই যে ভোট ক্রয় করবে। এছাড়া জোর করে, প্রশাসন দিয়ে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে আসলে কোন দল কত শতাংশ ভোট পেয়েছে তার সঠিক হিসাব আমরা পাচ্ছি না।

বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাম দলগুলোর একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত তাদের এ করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে। রাজপথে বাম দল ও তাদের অংগসহযোগী সংগঠনগুলোর তেমন দাপট নেই। একদিকে তারা সরকারবিরোধী কথা বলছে, কিন্তু কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না। বস্তুত তাদের কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডই নেই। এসব কারণে অন্তর্ঘাত ও অবিশ্বাসে বাম গণতান্ত্রিক জোট ভোটের মাঠে নিজেদের তুলে ধরতে পারছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ