জোরপূর্বক গুম তদন্তে জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে নেয়ার আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১০:৫৩, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জোরপূর্বক গুম তদন্তে জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে নেয়ার আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, আগস্ট ৩০, ২০২৩ ৩:৫৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, আগস্ট ৩০, ২০২৩ ৩:৫৮ অপরাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক

জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশনে সমর্থন দেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ, বাংলাদেশের তা মেনে নেয়া উচিত। জোরপূর্বক গুম বিষয়ক আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ইংরেজিতে তারা যে শিরোনাম করেছে, তার বাংলা অর্থ- বাংলাদেশ: জোরপূর্বক গুমের তদন্ত উন্মুক্ত করতে হবে। জাতিসংঘের তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। (গুমের শিকার) পরিবারগুলো দীর্ঘদিন উত্তরের জন্য অপেক্ষায় আছে।

এতে বলা হয়, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে কর্তৃপক্ষ। পক্ষান্তরে তারা প্রহসনমূলকভাবে দাবি করে, ওইসব মানুষ আত্মগোপন করে আছেন। বাংলাদেশি মানবাধিকার মনিটরদের তথ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা কমপক্ষে ৬০০ মানুষকে জোরপূর্বক গুম করেছে। কিছু মানুষকে পরে মুক্তি দেয়া হয়েছে, আদালতে তোলা হয়েছে অথবা বলা হয়েছে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন তারা। এখনও প্রায় ১০০ মানুষ নিখোঁজ আছেন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্পেশালাইজড মেকানিজম প্রতিষ্ঠায় সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার বলেন, জোরপূর্বক গুমের বাস্তবতাকে অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কাউকেই বোকা বানাতে পারছে না। পক্ষান্তরে তারা গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগকে প্রলম্বিত করছে। এসব পরিবার জানে না তাদের প্রিয়জনরা কোথায় আছেন। এসব নির্যাতনের সমাধানের জন্য জোরপূর্বক গুমের তদন্তে জাতিসংঘ যে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন উন্মুক্ত করায় সহাযোগিতার কথা বলেছে, তার প্রতি খাঁটি প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করা উচিত সরকারের।

সম্প্রতি এক বিক্ষোভে ১২ বছরের আদিবা ইসলাম রিদি বলেছে, প্রতিটা মুহূর্ত আমি আশায় থাকি যে, আমার পিতা ফিরে আসবেন এবং অন্যদের মতো আমাকেও জড়িয়ে ধরবেন। এটা যে কতটা বেদনার তা প্রকাশ করতে পারবো না। এরই মধ্যে ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমার অপেক্ষার কোনো শেষ হয়নি।

তার পিতা পারভেজ হোসেন বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির একজন কর্মী ছিলেন। আদিবার বয়স যখন ২ বছর তখন ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর জোরপূর্বক তার পিতাকে গুম করা হয়। ওইদিন পারভেজ হোসেন এবং বিএনপির অন্য তিনজন কর্মী বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে একটি বিনোদনমূলক পার্কে যাচ্ছিলেন হেঁটে। এ সময় একটি সাদা ভ্যান উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে তুলে তার ভিতর করে নিয়ে যায়। এই চারজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরপরই একজন বলেন, তিনি তাদেরকে পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের অফিসে নিরাপত্তা হেফাজতে দেখেছেন। কিন্তু তাদেরকে আটক রাখার কথা অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। অন্য কয়েক ডজন মানুষের মতো পারভেজ হোসেন কোথায় আছেন তা আজও অজানা।

২০২১ সালের ১০ই ডিসেম্বর মানবাধিকার বিষয়ক গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কির অধীনে র‌্যাব ও এর শীর্ষ কয়েকজন কমান্ডারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযোগ করা হয় তারা আইন লঙ্ঘন, বিশেষ করে জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও বলেছে, এখন পর্যন্ত জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের পরিবর্তে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ভিকটিমের পরিবারকে হয়রান এবং ভীতি প্রদর্শন করছে। পরিবারগুলো বলেছে, তাদের প্রিয়জন নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাদের ওইসব প্রিয়জন কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে তাদেরকে বার বার জিজ্ঞাসাবাদ করে কর্তৃপক্ষ। পরিবারগুলোকে কর্মকর্তারা হুমকি ও চাপ দেন অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে অথবা পুলিশের রিপোর্টে ঘটনা ‘রিভাইজ’ করতে বলেন। এর মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী যে গুমের সঙ্গে জড়িত তার প্রমাণ মুছে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিবারগুলো আরও বলছে, কর্তৃপক্ষ তাদের বাড়িতে যায় এবং তাদেরকে মিথ্যা বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করে। ওইসব বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে জোরপূর্বক গুম করা হয়নি এবং তারা পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে লুকিয়ে আছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও বলেছে, জোরপূর্কক গুমের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাতে বার বার কূটনীতিকদের বাধা দেয় ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা ও কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ২০২২ সালের ১৪ই ডিসেম্বরের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ওইদিন ভিকটিম পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। কিন্তু সেখানে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা। এতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। ফলে তিনি সেই মিটিংয়ের ইতি টানেন। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের পক্ষ অবলম্বন করে কথা বলে সরকার এবং তারা বলে এমন মিটিং করা উচিত হয়নি রাষ্ট্রদূতের।

নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে জোরপূর্বক গুম সমস্যার অর্থপূর্ণ একটি সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি বার বার আহ্বান জানিয়ে আসছে দাতা সরকার, জাতিসংঘ, মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো এবং নাগরিক সমাজ। কিন্তু সেসব আহ্বান উপেক্ষা করছে সরকার।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও বলেছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক জোরপূর্বক গুম বাদে মৌলিক সব চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী বাংলাদেশ। ২০২২ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সফর করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলে। তিনি বাংলাদেশকে এই কনভেনশনে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। আহ্বান জানান জাতিসংঘের জোরপূর্বক গুম বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানাতে, যাতে এই সমস্যার নিষ্পত্তিমূলক সমাধানে প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করা যায়।

ব্লেকনার বলেন, যদি নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার গুরুত্ব দিয়ে চায় বাংলাদেশ সরকার, তাহলে জবাবদিহিতার দিকে তাদেরকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। জোরপূর্বক গুম হচ্ছে, অভিযোগের স্বচ্ছ ও পক্ষপাতিত্বহীন তদন্ত হচ্ছে- এটা স্বীকার করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় জবাবদিহিতা।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ