চালের বাজারে গোড়ায় গলদ - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৬:৩০, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

চালের বাজারে গোড়ায় গলদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, জুন ৩, ২০২২ ৬:৪৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, জুন ৩, ২০২২ ৬:৪৭ পূর্বাহ্ণ

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যতালিকার মধ্যে ভাত ছাড়া চলে না প্রতিটি ঘরে। এবার অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট টার্গেট করেছে চালকে। একদিকে ভরা মৌসুম, অপরদিকে ভারত থেকে আমদানি প্রক্রিয়া চলমান থাকার পরও চালের দাম বৃদ্ধি করে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে সিন্ডিকেট। এতে করে কৃষক ও ভোক্তার পকেট কাটা হচ্ছে।

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে প্রচুর ধান-চাল মজুত থাকার পরও দাম বৃদ্ধিকে দুঃখজনক বলছে ভোক্তা অধিকার পরিষদ। চট্টগ্রাম খাদ্য অধিদপ্তর পাহাড়তলী, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জে একাধিক চাল ব্যবসায়ী নেতা, কৃষক ও ভোক্তার সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে, অস্থির চালের বাজারে মূলত গোড়ায় গলদ। মাঝখানে পড়ে ভোক্তা ও কৃষক মরে যাচ্ছে।

চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে যেসব বিষয় উঠে আসছে, এর মধ্যে রয়েছে মোটা চালকে চিকন চাল করে প্যাকেটজাত অতিরিক্ত মজুত ফুড গ্রেইন লাইসেন্স না থাকা ও মিল মালিকের কারসাজি।

পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজার সমিতির সভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন, দাম বৃদ্ধির সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা উত্তরবঙ্গ থেকে চাল নিয়ে আসি। সেখানে দাম বাড়লে আমাদের করার কিছু নেই। পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের যে জরিমানা করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অন্যায়। আমরা তো দাম বৃদ্ধি ও কমানোর কাতারে পড়ি না। আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের জরিমানা করাটা সম্পূর্ণ আই ওয়াশ বা মিডিয়া কাভারেজ। চালের দাম বৃদ্ধির গোড়াই ঠিক করতে হবে।

পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, প্রত্যেক চাল ব্যবসায়ীকে ফুড গ্রেইন লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে এবং মিল মালিকদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চালের দাম বৃদ্ধিতে কৃষক উপকৃত হচ্ছে না। কারণ প্রান্তিক অধিকাংশ কৃষক মিল মালিকদের কাছে জিম্মি। ধান উৎপাদনের পূর্বে মিল মালিকরা কৃষকদের কাছে বিনিয়োগ করেন। কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করে অর্থের অভাবে সঠিক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অধিক লাভবান হন মিল মালিকরা।

মিল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা ব্যবসায়ী এবং সর্বশেষ ধাপ ভোক্তাকে অতিরিক্ত দামে চাল কিনতে বাধ্য করছে। চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিদিন ১০০ গাড়ি চাল আসে উত্তরবঙ্গ থেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চাল ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমান চট্টগ্রামে যেসব চাল ব্যবসায়ীকে অতিরিক্ত মজুতের জন্য যে জরিমানা গুনতে হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ ফুড গ্রেইন লাইসেন্সের অতিরিক্ত মজুত দেখলে জরিমানা করাটা উচিত নয়। অনেক সময় চাল বিক্রি না হয়ে কিছু অতিরিক্ত থাকতে পারে। চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম বলেন, ভরা মৌসুমে চালের দাম বৃদ্ধি হওয়াটা খুবই দুঃখজনক। তিনি চালের দাম বৃদ্ধির দায় চাপিয়েছেন বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানির ওপর। হাওর এলাকায় বন্যা হওয়ার ফলে ৫০ ভাগ ধান উৎপাদন কম হয়েছে। এছাড়া মিল মালিকরা ধান সংগ্রহ করে অতিরিক্ত মজুত করে রাখেন বলে জানান তিনি। একটি বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশ, চট্টগ্রামের চাল ব্যবসায়ীরা গোপনে বিভিন্ন জায়গায় চাল মজুত করেছেন। শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাশ শিকলবাহা পটিয়া এবং নগরীর সিটি গেটসহ যেখানে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়, সেসব জায়গায় গুদাম করে চাল মজুত করেছেন।

চালের দাম বৃদ্ধিতে খুশি হতে পারেননি কৃষক মফিজ। তিনি বলেন, রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে অনেক কষ্টের বিনিময়ে ধান উৎপাদন করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিক্রি করার জন্য মিল মালিকের কাছে গেলে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না। তবে বাজারে চালের দাম শুনে হতবাক হই। উৎপাদন করি আমরা। লাভবান হন ব্যবসায়ীরা এবং অতিরিক্ত দাম দিতে হয় ভোক্তাকে। রফিকুল ইসলাম বলেন, সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়াটা এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছুই নেই। আয় তো বাড়েনি, শুধু বেড়েই চলেছে ব্যয়। চট্টগ্রাম খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক শফিউল হাবিব ভূঁইয়া বলেন, অতিরিক্ত মজুতদারদের আমরা জরিমানা করেছি এবং তাদের ফুড গ্রেইন লাইসেন্সের আওতায় আসার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের উপনিয়ন্ত্রক সুনীল দত্ত বলেন, মিনিকেট নামে কোনো চাল নেই। বড় ও অসাধু সিন্ডিকেটরা মোটা চালকে চিকন করেছে এবং এসব চাল প্যাকেটজাত করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে। প্যাকেটজাত চাল বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে। নির্দিষ্ট চাল ব্যবসায়ী ছাড়া অন্যান্য পুঁজিপতি ব্যবসায়ীও চাল মজুত করছে। আমরা বাজার মনিটরিং করছি। চাল গুদামজাত করেছে— এ ধরনের গুদাম সিলগালাসহ অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জহুরুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী খাদ্য ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছেন কি না আমরা তদারকি করছি। যারা আইন ভঙ্গ করছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। তবে তিনি দাবি করছেন, ধানের দাম কমে আসছে। কারণ সংগ্রহ হয়েছে ভালো এবং এক লাখ ২৫ হাজার টনের মতো চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রশ্নের জবাবে বলেন, সিন্ডিকেট বা কালোবাজারের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।

মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান আরো জোরালো হবে : খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ‘একটি মহল খাদ্য ঘাটতির বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে তবে বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা নেই। মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এ অভিযান আরো জোরালো হবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার খাদ্যমন্ত্রী বোরো-২০২২ মওসুমে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও বাজার মনিটরিং সংক্রান্ত অনলাইন মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুই কারণে সরকার ধান চাল সংগ্রহ করে। প্রথমত, সরকার ধান কিনলে কৃষক তার ফসলের নায্যমূল্য পায়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।’
বোরো সংগ্রহ সফল করতে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাজ করতে হবে। কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না।

ধান চাল সংগ্রহকালে কারো সাথে দুর্ব্যবহার না করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে বলেন, তবে চালের কোয়ালিটির সাথে কম্প্রোমাইজ করা যাবে না। বড় বড় কর্পোরেট হাউজ ধান চাল সংগ্রহ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মিল না থাকলে তারা যেন এ ব্যবসায় যুক্ত না হতে পারে সেটা নিশ্চিতে ধান চালের বাজারে নজরদারি বাড়াতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেন তিনি। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ফুড গ্রেইন লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নে জোর দিতে হবে। কেউ যেন লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা না করতে পারে,অবৈধ মজুত করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট ১৯৭৪ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন তিনি।

তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চালের দাম ও গমের দাম কমতে শুরু করেছে। সে দেশগুলো চাল ও গম রপ্তানি করবে মর্মে পত্রও দিচ্ছে। বাজার অস্থির করতে দেয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে ট্যাক্স কমিয়ে চাল আমদানি করা হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মজিবর রহমানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফ উদ্দিন, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের জেলা প্রশাসকগণ, কৃষি বিভাগের উপপরিচালক, খাদ্য বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও মিলমালিকরা সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ