আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে ১০ নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, মে ১২, ২০২৩ ৩:০৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, মে ১২, ২০২৩ ৩:০৯ অপরাহ্ণ

ডেস্ক নিউজ
সামাজিক সুরক্ষায় ভাতার পরিমাণ নয়, উপকারভোগীর আওতা বাড়িয়ে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বার্তা পৌঁছে দেন, তারা একা নয়, সরকার তাদের ধারণ করে। পাশে আছে। এ লক্ষ্যে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয় সার্বিকভাবে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছে, তার পরিধি কিছুটা বাড়ানোর সুপারিশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
গত বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি খসড়া সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় উপস্থাপিত খসড়া বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপ, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও বরাদ্দের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বাজেটের প্রাথমিক খসড়া সারসংক্ষেপ প্রস্তাব অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোসহ ১০ দফা নির্দেশনা দেন।
সেগুলো হলো সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি) বাস্তবায়ন হার বাড়াতে মনিটরিং জোরদার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ, কর না বাড়িয়ে কর আদায়ের আওতা বাড়ানো এবং নিয়মিত করদাতাদের হয়রানি বন্ধ, আমদানি-রপ্তানিতে বিশেষ নজর এবং
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে সব ধরনের কৃষিতে ভর্তুকি বৃদ্ধি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ জ্বালানি তেল ও গ্যাসে ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনা, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং এ লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাত এগিয়ে নিতে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ধীরে ধীরে নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট বাস্তবায়ন করা।
আগামী ১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এই বাজেট পেশ করবেন। তার আগে চূড়ান্ত বাজেটে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাসংবলিত এসব সুপারিশের সবকটিই বাজেট পদক্ষেপে অন্তর্ভুক্ত করতে বৃহস্পতিবার থেকেই কাজ শুরু করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বাজেট প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সামাজিক সুরক্ষা খাতে উপকারভোগীর আওতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কালবেলাকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আসুক দেশের সব মানুষ। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের চলমান যে সামাজিক সুরক্ষামূলক ১২৩টি কর্মসূচি রয়েছে, তার আওতা বাড়িয়ে বাদ পড়াদের অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ভাতার পরিমাণ ৫০০ না ১০০০, সেটি বড় বিষয় নয়। সমাজে বিভিন্ন স্তরে পিছিয়ে থাকা এসব মানুষকে নিয়ে সরকার যে ভাবে, এই অন্তর্ভুক্তি তার একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তো হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় উপস্থাপিত খসড়া বাজেটে অনুমোদনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম কমিয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আসন্ন বাজেট নিয়ে আরও কাজ করতে বলেন। এ লক্ষ্যে টিসিবির ভর্তুকি মূল্যের খাদ্য সহায়তা, খোলা বাজারে চাল ও আটা বিক্রি (ওএমএস) এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১৫ টাকা মূল্যে চাল বিক্রি কার্যক্রমে উপকারভোগী বাড়াতে বলেন তিনি।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে এ খাতে অতিরিক্ত ৮১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছর খাদ্য ভর্তুকি খাতে ৮০০০ কোটি বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কারণে অন্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে এ খাতে বরাদ্দ সামান্য বাড়তে পারে। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টিসিবির মাধ্যমে চলতি অর্থবছর ২ লাখ ৭৫ হাজার টন খাদ্য সরবরাহের কার্যক্রমে আছে। আগামী অর্থবছর যাতে তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে; কিন্তু বরাদ্দ কমানো যাবে না। এ লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনায় বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও বাড়তি অর্থ লাগে তার ছাড়ে সুযোগ রাখতেও অর্থ মন্ত্রণালয়কে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনে চলতি বাজেটে যেসব নির্দেশনা রয়েছে সেগুলো আগামী বাজেটেও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর তাগিদ দেন তিনি। এজন্য অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নতুন বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্য রপ্তানি বাড়াতে জোর দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়িয়ে এবং আমদানি ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেন তিনি। এ বিষয়ে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে সতর্ক থাকতেও নির্দেশ দেন।
রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হুন্ডি প্রতিরোধ করে বৈধপথে রেমিট্যান্স আহরণ কী করে আরও বাড়ানো যায়, তার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি) বাস্তবায়ন হার বাড়াতে মনিটরিং জোর ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ‘গ্রাম হবে শহর’ এই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া বাড়াতে বলেন।
চলমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে সরকার ঋণ নিলেও ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। বৈঠক সূত্র জানায়, কর না বাড়িয়ে কীভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় অর্থমন্ত্রীর পাশাপাশি এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান সংস্থাটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। স্বল্পোন্নত বা এলডিসি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার পর ভবিষ্যতে রাজস্ব আদায়ের ওপর কী ধরনের চাপ আসতে পারে, সে বিষয়টিও তুলে ধরেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তবে তিনি জানান, রাজস্ব আদায়ে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তা পূরণ করতে সক্ষম হবে এনবিআর।
এনবিআরও মনে করে, ভ্যাট ফাঁকি রোধ এবং কর প্রদানে সক্ষম এরকম করদাতাদের করনেটে নিয়ে আসা সম্ভব হলে রাজস্ব আদায় কয়েকগুণ বাড়বে। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বাজেট বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণ কিংবা অন্য উৎস থেকে টাকা ধার করার প্রয়োজন হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তি। এজন্য সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাগবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আমদানি সহজীকরণের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বৈঠকে। আগামী বাজেটে সব ধরনের ভোগ্য ও নিত্যপণ্য আমদানিতে শুল্ককর ও ভ্যাট ছাড়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দেবেন, সেজন্য বাজেট নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে পৃথক আরেকটি বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জনতার আওয়াজ/আ আ