‘আমাদের মানবতার ডাক সরকারের কানে যায় না
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২৩ ৮:০২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২৩ ৮:০২ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি তো মাদার অব হিউম্যানিটি, মানবতার মাতা বললেও আমাদের মানবতার ডাক সরকারের কানে যায় না।
শনিবার (৯ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গুম, খুন, ক্রসফায়ার, কারা নির্যাতন বন্ধের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে এসব কথা বলেন বিভিন্ন সময় গুম-খুনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।
মায়ের ডাকের এই সমাবেশটি শুরুতে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে পুলিশের বাধার কারণে সমাবেশ করতে পারেনি সংগঠনটি। পরে তারা মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আসেন এবং সেখানেই সামবেশ করেন।
সমাবেশে রেহানা বানু মুন্নী বলেন, আমার ভাইকে ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর মাঝরাতে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়। তাকে ৭-৮ জন অস্ত্রধারী প্রশাসনের লোক দিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল। আজকে দশ বছর আমার ভায়ের কোন খোঁজ নাই। আমরা রাস্তায় রাস্তায় ভাইয়ের জন্য কাঁদি। আমার বাবা মারা গেছে, মা মৃত্যু পথযাত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি তো মাদার অব হিউম্যানিটি, মানবতার মাতা, আপনি রোহিঙ্গাদের সাহায্য করেছেন। আমাদের কান্না কি আপনি শোনেন না? আমাদের কান্না কি আপনার কানে যায় না? আমাদের কান্না কি আপনি শোনেন না? আজকে ১০ বছর ধরে আমরা কাঁদছি, কেন আপনি দেখছেন না?
তিনি আরো বলেন, আমরা আমাদের কথা বলতে আজকে শাহবাগে দাঁড়িয়েছিলাম, কেন টেনে-হিচড়ে আমাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন? আমরা কি এই দেশের নাগরিক না?
সমাবেশে ২০১৩ সালে গুম হওয়া বংশাল থানা ছাত্রদল সহসভাপতি মোহাম্মদ সোহেলের মেয়ে সাফা বলেন, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর আমার বাবাকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে আমি আমার বাবাকে দেখিনি। বাবাকে আমি রাস্তায় রাস্তায় খুঁজেছি, পাইনি। প্রতিদিন বড় হচ্ছি বাবার আদর ছাড়া। বাবাকে কখনো বাবা বলে ডাকতে পারিনি। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। বাবাকে ছাড়া আর কিচ্ছু চাই না।
নিউ মার্কেট থানা ছাত্রদলের সভাপতি বাচ্চুর বোন ঝুমুর আক্তার বলেন, আমার ভাইকে ২০১৪ সালে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে, আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার ভাইকে মারার জন্য আমাকে ছয় মাস জেলে রাখা হয়েছে। আমরা কেমন স্বাধীন দেশে বাস করি, যেখানে ভাইয়ের জন্য বোন, ভাইয়ের জন্য ভাই, বাবার জন্য ছেলে জেল খাটে? আমার ভাইকে তো মেরে ফেলা হয়েছে। যাদের ভাই এখনো গুম রয়েছে, তাদের আমরা ফেরত চাই।
গুমের শিকার বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. পারভেজ হোসেনের স্ত্রী ফারহানা আক্তার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে বলতে চাই, আপনি তো স্বামীর সংসার করেন নাই। আপনই কীভাবে বুঝবেন স্বামী কী জিনিস। স্বামী কী জিনিস আপনি বুঝবেন না।আমার শরীর অর্ধেক পুরে গেছে তারপরও আমি আসছি এখানে। আমার অধিকারের কথাটা বলতে, আমাকে কেন বাঁধা দেওয়া হয়েছে। আমার বাচ্চাটাকে গাড়ি থেকে নামতে দেওয়া হয় নাই। কেন আমাদের বাচ্চাটাকে গাড়িতে রেখে আসতে হয়েছে। আমরা কী অন্যায় করেছি যে আমার স্বামীকে গুম করা হয়েছে। আমার স্বামীর কী দোষ আমি এটা জানতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়েন না। আপনার কাছে রেখে দেন। শুধু বলেন এটুকু বলেন, কেন আপনি আমার স্বামীকে গুম করেছেন। আর কিছু জানতে চাইনা আপনার কাছে।
গাড়ি চালক কাউসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম বলেন, আজ ১১ বছর হয়ে গেছে আমি আমার বাবাকে দেখি না। আমি আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমার আব্বাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। আমি আমার বাবাকে একটু দেখতে চাই।
সভাপতির বক্তব্যে মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী আফরোজা ইসলাম আঁখি বলেন, গত ১০-১২ বছর ধরে আমরা আমাদের স্বজনদের ফিরে পাওয়ার জন্য, যাদের খুন করা হয়েছে তাদের বিচারের দাবিতে রাজপথে আছি। এখন যাদের গায়েবী মামলা দিয়ে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারাগারে নির্যাতন করা হচ্ছে, যাদেরকে না পেয়ে তাদের স্বজনদের, বাবাকে, ভাইকে, স্ত্রীকে সন্তানসহ কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের বিচারের দাবিতে, তাদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছি৷ এই সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য আমরা রাজপথে দাঁড়িয়েছি৷
তিনি আরো বলেন, আমরা শাহবাগে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে আমাদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি, আমাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি এই অবস্থার উন্নতি হবে, আমরা আমাদের স্বজনদের ফিরে পাবো, এই নির্যাতনের অবসান হবে।
মায়ের ডাকের আহবায়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের ৪৪টি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আমরা সমাবেশ আয়োজন করেছিলাম, আমাদের মাইক কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই দেশে আমাদের দু:খের কথাগুলো বলার অধিকার পর্যন্ত নেই।
সমাবেশে ভুক্তভোগীর পরিবার ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, আমরা আজকে দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে একটি ফ্যাসিস্ট দানবীয় সরকার মানুষের বুকের রক্তের উপর দিয়ে, মানুষের লাশের উপর দিয়ে ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তারা (সরকার) হেলমেট বাহিনী, লাঠিয়াল বাহিনী বানিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে ঘরে ঘরে মানুষকে অত্যাচার করছে, হত্যা করছে। এর কোনো বিচার নেই। এই যে শ্রমিক আন্দোলনে ৩-৪ জন শ্রমিক হত্যা হয়েছে। সেই শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ মারা গেলে সেটি নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু যেসব শ্রমিক মারা গেছে, তাদের পরিবার নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। এই হলো আজকে আমাদের অবস্থা।
তিনি আরো বলেন, একটি অবৈধ, জবাবদিহিবিহীন, বিনা ভোটের সরকার আজকে নতুন করে পাতানো নির্বাচনের খেলা খেলছে। তিনি (শেখ হাসিনা) নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে আওয়ামী লীগের নেতাদের সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে, কতগুলো বিরোধী দলীয় দাসকে নিয়ে ভোট করছে। কারণ তাকে (শেখ হাসিনা) আরো অনেকদিন থাকতে হবে। এই স্বজনহারা মা-বোনদের কথা, তাদের বুকের বেদনার কথা, তাদের জীবনের কথা কোনটাই চিন্তা করছে না।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, পুলিশসহ এই সরকারের যত বাহিনী আছে, যত অত্যাচারই করুক, মায়ের ডাক তারপরও তাদের লড়াই অব্যাহত রাখছে। এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ সরকার কোনো কথা শুনবে না। গত ১০ বছরে আমরা কতবার প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েছি, কতবার কথা বলেছি। আমাদের মানবতার ডাক সরকারের কানে যায়নি। এখন মানুষের সমস্ত মানবিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, মৌলিক অধিকার, ভোটের অধিকার হরণ করে তারা (সরকার) একটি তামাশা তৈরির চেষ্টা করছেন।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, গুম-খুন চলছে, বিনা বিচারে হত্যাকান্ড চলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে কিংবা জেলের ভেতরে হত্যাকান্ড চলছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গায়েবী, মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হচ্ছে, আটক করে রাখা হচ্ছে এবং নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দিয়ে ফরমায়েসী সাজা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি ১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় আছেন, এর আগেও পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। আপনার ১০ বছরের ক্ষমতা মানুষের ভোটের ভিত্তিতে হয়নি। আপনি ক্ষমতায় আছেন জবরদস্তি করে। ক্ষমতায় থাকার জন্য আপনি মানুষ হত্যা করছেন, সমস্ত বিরোধী দলকে জেলে পাঠাতে চাইছেন। পুরো দেশকে বিরোধী দলের জন্য কারাগারে পরিণত করতে চাইছেন। এটা আপনার জন্য কোনো গৌরব নয়। এভাবে দমন-পীড়ন করে ক্ষমতায় থাকা আপনাকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। মানুষের কাছে আপনি ঘৃণার পাত্র হবেন। এদেশের মানুষ আপনাকে অত্যাচারী ফ্যাসিস্ট শাসক হিসেবে, মানুষের হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নত করবে।
গণঅধিকার পরিষদের একংশের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, আজকে বিচারকরা ফ্যাসিবাদের দোসর হচ্ছে। একটা ডাকাতের দল জনগণের উপরে ইট পাথরের মতো চেপে বসে আজকে ভিন্নমতের কন্ঠ দমন করে, নির্যাতন নিপীড়ন করে রাষ্ট্র চালাচ্ছে। যারা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছে তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মামলা দেওয়া হচ্ছে। আজকে যারা বিচারের নামে প্রহসন করছেন তাদেরকেও আইনের মুখোমুখি হতে হবে। রাজনৈতিক মামলায় বাটপার, বেইমান, প্রতারক শাহজান ওমর জামিন পায় কিন্তু মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, আমির খসরুরা জামিন পায় না। বেইমান শাহজান জামিন পেয়ে নৌকায় উঠেছে এর চেয়ে নগ্ন উদাহরণ আর কি হতে পারে!
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার কোন অবস্থানে? মায়ের ডাক সংগঠনকে সবাই চেনে। হাজার হাজার মায়ের কান্না ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সংগঠনটি গড়ে উঠেছে। তাদের সমাবেশে যেভাবে পুলিশ ধাক্কা দিয়েছে, যেভাবে পুলিশ তাদের হেনস্তা করেছে, লাঞ্চিত করেছে এবং তাদের সেখানে সমাবেশ করতে দেওয়া হয়নি- বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এর একটি প্রমাণ বহণ করে। সরকার এতটাই জনবিচ্ছিন্ন, সরকার এতটাই জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থা৷ নিয়েছে, মায়ের ডাকের মতো একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, গুম হওয়া পরিবারের সংগঠন, তাদের একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পর্যন্ত তারা (সরকার) ভয় পাচ্ছে। আমরা সরকারের এই তৎপরতাকে গভীর নিন্দা জানাই, তীব্র সমালোচনা করি।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সিনিয়র সহ-সভাপতি তানিয়া রব বলেন, আমাদের কেন শাহবাগ দাঁড়াতে দেওয়া হলো না? আমরা কি দেশের নাগরিক নই, আমরা ট্যাক্স দেই না? শাহবাগে কেন আমাদের ধাক্কাতে হলো? এই সরকার তো কালা-বধির হয়েছেই, সেই সঙ্গে প্রশাসন, প্রত্যেকটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তারা বধির করে ছেড়েছেন। মায়ের ডাকের যে ক্রন্দন, দুঃখ, আক্ষেপ তা নিয়ে কি আমরা কোথাও দাঁড়াতে পারবো না?
জনতার আওয়াজ/আ আ