আমার চোখে জুলাই :ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:৪৭, শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা সফর, ১৪৪৮ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

আমার চোখে জুলাই :ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬ ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬ ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

 


জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায়, যা শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক চেতনার এক গভীর পরিবর্তনের প্রতীক। জুলাইকে ঘিরে আজ নানা ব্যাখ্যা, নানা বিশ্লেষণ এবং নানা রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া সামনে এসেছে। কেউ এটিকে বিপ্লব বলছেন, কেউ গণঅভ্যুত্থান, আবার কেউ এটিকে কেবল একটি ছাত্র-আন্দোলনের বিস্তৃত রূপ হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য জুলাইকে নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে আবেগ নয়, বাস্তবতার আলোকে জুলাইকে মূল্যায়ন করতে হবে।

বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছাড়াই ছাত্রসমাজ এ আন্দোলনের সূচনা করেছিল। রাষ্ট্রক্ষমতার কঠোর দমন-পীড়ন, গুলি, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, মামলা ও ভয়ভীতির মধ্যেও তারা পিছু হটেনি। বরং প্রতিটি দমন-পীড়নের পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন লাভ করেছে। ছাত্রদের সেই দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের ফলেই একসময় ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। সে সময় বহু রাজনৈতিক নেতা কারাগারে ছিলেন অথবা কার্যত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থানে ছিলেন না। ফলে জুলাই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রসমাজ এবং তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সংহতি।

জুলাইকে বিপ্লব না গণঅভ্যুত্থান—এই বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যার পরিচয় নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। কিন্তু একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট করা। যদি শুরুতেই সরকার রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে এটিকে “বিপ্লব” অথবা “গণঅভ্যুত্থান”—যে কোনো একটি হিসেবে স্বীকৃতি দিত, তাহলে এই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক হয়তো এতদূর গড়াত না। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা অনিশ্চিত রেখে দিলে রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের সুবিধামতো তার ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, যার ফল জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে বিভক্ত করে।

আমার দৃষ্টিতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল তাদের রাজনৈতিক দৃঢ়তার অভাব। একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য শক্তিশালী, সাহসী এবং সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘ বিতর্কে জড়িয়ে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করল, যেখানে জুলাই আন্দোলনের মৌলিক চেতনা ধীরে ধীরে বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়তে শুরু করল। একটি ঐতিহাসিক জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার পরিবর্তে মতপার্থক্য ও বিভক্তির সুযোগ তৈরি হয়।

এর সবচেয়ে বড় পরিণতি হলো রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া। একটি সাংবিধানিক পরিষদ বা গণপরিষদ গঠন করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের যে ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাজে লাগানো যায়নি। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, বিচারিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর পরিবর্তে পুরোনো ব্যবস্থার অনেক অংশই বহাল রয়ে যায়। ফলে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে সংসদীয় রাজনীতিতে আবারও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পুরোনো ধাঁচের সংঘাত, অবিশ্বাস ও বিভক্তি ফিরে এসেছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টার নির্বাচনী নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য ও পক্ষপাতিত্বের স্বীকারোক্তি নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল শক্তি হওয়ার কথা ছিল জনগণের আস্থা এবং নিরপেক্ষতা। সেই নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে নির্বাচন, সংস্কার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শুধু নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়; জনগণের কাছে নিরপেক্ষ বলে প্রতীয়মান হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসা দলীয় সরকারগুলো কাঠামোগত সংস্কারের বহু প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব অর্থে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার করতে পারেনি। প্রশাসনের দলীয়করণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, দুর্নীতি দমন, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রশ্নে প্রত্যাশিত পরিবর্তন কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। জনগণ বিশ্বাস করেছিল, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে থেকে তারা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সুযোগ অনেকাংশেই হাতছাড়া হয়েছে। এই ব্যর্থতার মূল্য জাতিকে হয়তো আরও বহু বছর বহন করতে হবে।

জুলাই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোনো জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার সচেতন নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে সংগঠিত জনশক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সেই শক্তিকে যদি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্র সংস্কারে রূপান্তর করা না যায়, তাহলে আন্দোলনের অর্জন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। ইতিহাসে বহু বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রাজনৈতিক রূপান্তরের পর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না হলে পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন রূপে ফিরে আসে।

জুলাই আমাদের শুধু একটি সরকারের পতনের ইতিহাস শেখায় না; এটি আমাদের রাষ্ট্র গঠনের ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ব্যক্তি বা দলকে কেন্দ্র করে নয়, রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে চিন্তা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে কোনো আন্দোলনের সাফল্যই স্থায়ী হয় না। ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শাসনব্যবস্থা, আইন, প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিতার সংস্কার।

আমার বিশ্বাস, জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। ইতিহাসের প্রকৃত সম্মান কেবল স্মরণসভা, স্লোগান বা রাজনৈতিক মালিকানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তার প্রকৃত মর্যাদা নিহিত।

পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়; তারা আমাদেরই সন্তান এবং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, টেকসই জাতীয় উন্নয়নেরও অপরিহার্য শর্ত। একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পথশিশুদের অধিকার ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ