জ্বালানি তেলের জন্য দিনরাত একাকার হয়ে যাচ্ছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬ ৪:০২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬ ৪:০২ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট পাম্পগুলোতে গেলে বোঝা যায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানির রেকর্ড পরিমাণ মজুত রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রলপাম্পগুলোতে তেলের জন্য চলছে হাহাকার। অপেক্ষা করতে করতে দিনরাত এক হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার যানবাহনচালকের।
পেট্রল, অকটেন, ডিজেল–সব ধরনের জ্বালানির ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে একই সংকট। কাঙ্ক্ষিত তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের, দিন থেকে রাতে গড়ালেও অপেক্ষা আর ফুরায় না। রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, ভোর হওয়ার আগেই তেল নেওয়ার আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন চালকরা। সেই লাইন দুপুর, বিকেল পেরিয়ে রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকছে। কোথাও ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না পর্যাপ্ত তেল। অনেকেই বাধ্য হয়ে অল্প পরিমাণ তেল নিয়ে ফিরছেন, আবার কেউ দীর্ঘ অপেক্ষার পরও খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
জ্বালানিসংকটের এই চিত্র এখন রাজধানীর প্রায় সব পাম্পেই। হাজার হাজার যানবাহন তেলের আশায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও সীমিত সরবরাহের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা। অনেক ক্ষেত্রে সিরিয়াল ভেঙে তেল নেওয়া, বোতলে তেল সংগ্রহ কিংবা আগে-পরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতি ঘটছে। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষার চাপ–সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
দেখা গেছে, অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেলে হঠাৎ করেই সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত গ্রাহক নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন। ডিপো থেকে কখন তেল আসবে, তার কোনো নিশ্চিত তথ্য না থাকায় পাম্পের মালিক ও গ্রাহক উভয়ই উদ্বেগে ভুগতে থাকেন। সরকারিভাবে পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে সংকট কাটছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। কেউ কেউ আবার কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও তুলছেন।
সরেজমিনে গতকাল আসাদগেট এলাকার সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন এবং পরীবাগ এলাকার মেঘনা ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, পাম্পের সামনে থেকে শুরু হয়ে প্রধান সড়ক ছাড়িয়ে আশপাশের অলিগলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। কোথাও সেই লাইন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। পাম্পসংলগ্ন গলিপথ ও আবাসিক এলাকাতেও যানবাহনের চাপ বাড়ায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট, ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আসাদগেট এলাকায় সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি জিয়া উদ্যান পেরিয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুই স্তরে গাড়ি–প্রাইভেট কার ও মোটারসাইকেল বেশি। অন্যদিকে পরীবাগের মেঘনা পাম্প এলাকায় একাধিক লাইনে বিভক্ত হয়ে গাড়ির চাপ ছড়িয়ে পড়েছে হাতিরপুল, বাংলামোটর ও পাশের গলিপথ পর্যন্ত। এতে পুরো এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই ভোর ৫টার আগেই লাইনে দাঁড়ান। দুপুর নাগাদ সেই লাইনের দৈর্ঘ্য কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, বাস ও ট্রাকের ভিড়ে সড়কের একাংশ কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।
রাইড শেয়ারচালক রাশেদ বলেন, ‘ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াই। গড়ে ৮-১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আমার ১ হাজার টাকার তেল প্রয়োজন, কিন্তু এত অপেক্ষার পর পাই মাত্র ৩০০-৫০০ টাকার তেল। এই সময়টা রাস্তায় থাকতে পারলে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করতে পারতাম।’
ফুড ডেলিভারি রাইডার আসলাম বলেন, ‘সকাল ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, প্রায় ৭ ঘণ্টা পর তেল পেয়েছি। এত সময় অপেক্ষা করলে কাজ করার সুযোগ কমে যায়।’
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক মোস্তফা বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত লাইনে আছি। পরপর দুই দিন দাঁড়িয়েও তেল পাইনি। এখন অফিসের কাজের আগেই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।’
পাম্পসংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আসাদগেটের একটি পাম্পের কর্মচারী জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম তেল পাচ্ছেন তারা। ফলে সীমিত পরিমাণে তেল দিতে হচ্ছে, যার কারণে অধিকাংশ গ্রাহকই চাহিদা মতো তেল পাচ্ছেন না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক পাম্পেই পুলিশের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তবুও গ্রাহকদের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরবরাহ সংকটই বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে বলে জানিয়েছে। তবে কবে নাগাদ এই সংকট কাটবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে তাতে সংকট থাকার কথা নয় বলে মনে করেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল শনিবার চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে বলে প্রমাণ রয়েছে।
দেশে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য বাস্তবিকভাবে যা করা দরকার, সরকার তা করছে। সরকারের চেষ্টা ও আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আটকে পড়া জাহাজ বাংলার জয়যাত্রার নাবিক ও ক্রুরা সবাই ভালো আছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের দেশে চলে আসার ব্যবস্থা করা হবে।
এর এক দিন আগে গত শুক্রবার চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে এবং গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে যেটি কখনো হয়নি, বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত আমাদের আছে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশেও ছয় সপ্তাহ সমপরিমাণ জেট ফুয়েল রয়েছে।’
জনতার আওয়াজ/আ আ