দুর্যোগেও বেশি ক্ষতির শিকার হয় গরিবরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৩ ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৩ ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

বেলেন ফার্নান্দেজ।
চলতি মাসের ৬ তারিখে ৭.৮ মাত্রার ভূকম্পনে দক্ষিণ তুরস্ক এবং উত্তর সিরিয়ার কিছু অঞ্চলে ভয়াবহ মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ অঞ্চলগুলো বিভিন্ন কারণে সম্প্রতি নানারকম ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছে। সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে লাখ লাখ লোক এখন উদ্বাস্তু। আর তাদের অনেকেই তুরস্কের দক্ষিণে এ ভূমিকম্পের শিকারে পরিণত হয়েছে। এ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা খুব দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে অগণিত মানুষ। আর এ ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা হিমশীতল তাপমাত্রার সঙ্গে লড়াই করে কোনোরকমে টিকে আছে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় এমন একটা ব্যাপার যা সারা পৃথিবীকে বিধ্বংস করে ফেলতে পারে। আর বিশ্বব্যাপী যারা দরিদ্র এবং এ দুর্যোগে আক্রান্ত, তাদের জীবন অত্যন্ত অনিশ্চিত। এ মানুষগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়াও নানারকম তীব্র সংকটে জর্জরিত। আর এ সংকট থেকে উত্তরণ একেবারেই অসম্ভব।
যাদের সহায়-সম্বল কিছুই নেই, নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে পৃথিবীতে তাদের বাসস্থানগুলো কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং স্বল্পমাত্রার একটি ভূমিকম্পে তাদের বাসস্থান বেশ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০০৭ সালের পেরুভিয়ান ভূমিকম্পে আইকা প্রদেশের পাশে একটি দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে বেশ কিছু ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু পুঁজিবাদী ভিত্তির ওপর যদি কিছু গঠিত হয়, তাহলে নিকৃষ্ট নির্মাণসামগ্রী বা বিল্ডিং কোড না মানলে যে ক্ষতি হয়, সেই বস্তুটি তার চেয়েও বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যারা এ ব্যাপারে অজ্ঞাত, তাদের জন্য বলছি—তীব্র অসমতার ওপর পুঁজিবাদের যে দাবি এবং অভিজাত শ্রেণির সংখ্যালঘুদের অত্যাচারের অর্থ হচ্ছে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বড় একটি বৈশ্বিক ব্যবধান রয়েছে। এ ব্যবধানগুলো ক্রমান্বয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং এ পরিবেশগত বিপর্যয়ের যুগে আরও স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। আর কোনো প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের পর ঢালাওভাবে কোনো সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আসে, তা শুধু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের উপকার করার পরিবর্তে সাহায্য প্রদানের সঙ্গে জড়িত যে শিল্প, সেটিকে আরও বিকশিত করে ও বিভাজন বাড়িয়ে তোলে।
এমনও বাস্তবতা রয়েছে যে, বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের জীবন অনিশ্চিত এবং এ জীবনের এই অনিশ্চয়তা তাদের জন্য ক্রমাগত নানারকম বিপর্যয় তৈরি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ ব্যাপারে কেউই তেমন কোনো মনোযোগ দেয় না। গত জুন মাসে নিউ হিউম্যানিটারিয়ান নিউজ এজেন্সি এক রিপোর্টে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে স্থূল কিছু বৈষম্যর কথা উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয় যে, ২০২২ সালের সব জরুরি তহবিলের প্রায় অর্ধেক মাত্র পাঁচটি দীর্ঘস্থায়ী এবং মূলত সংঘাতচালিত সংকটে ব্যবহার করা হবে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক একটি অনুমানে বলা হয়েছে যে, বার্ষিক দুর্যোগের সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৬০-এ উন্নীত হবে। আর এসব দুর্যোগের শিকার ব্যক্তিরাই প্রায়ই অনিরাপদ অবস্থানে থাকতে বাধ্য হয়। যার ফলে আরও একটি নতুন সংকটের মঞ্চ তৈরি হয়।
আফগানিস্তানের কথাই ধরা যাক। আফগানিস্তান মূলত বাইরের দেশগুলোর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এ বহিঃনির্ভরতা দেশটিকে মোটেও নিরাপদ করতে করেনি। গত বছর আগস্টে বন্যায় এখানে ১৮০ জনেরও বেশি লোক মারা যায়। আবার মাত্র দুই মাস পর একটি ভূমিকম্পে এক হাজারজনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। গত মে মাসে বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে দেশটি স্মরণাতীতকালের খাদ্য সংকটে ভুগছে। এখানে প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা ক্রমাগত খরা ও অর্থনৈতিক ভাঙনের কারণে ক্ষুধার্ত থাকছে এবং তারা তাদের দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করতে ব্যর্থ।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের গত দুই দশকের ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র ফলাফল হচ্ছে এই দারিদ্র্য। আর এর সরাসরি ফলাফল হিসেবে লাখ লাখ আফগান জনগণের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হয়ে গেছে। বিনষ্ট করা হয়েছে বিলিয়ন ডলারের রিকভারি ফান্ডগুলো।
হাইতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব রাজনীতি, লোভ এবং অব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সঙ্গে মিলে আরেকটি দৃষ্টান্তের স্থাপন করছে। এখানে ২০২১ সালে ৭.২ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর একটি মারাত্মক ঝড় ও ভূমিধস হয়েছিল। এ ঘটনায় ২ হাজার ২০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়। এ ছাড়া ১ লাখ ৩০ হাজার বাড়িঘর এবং অনেক স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে।
বিগত ২০১০ সালে একটি ভূমিকম্পে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার লোক নিহত এবং দেড় মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন হওয়ার ঠিক এক দশক পরই ঘটে উপরোক্ত ঘটনা। হাইতিতে ‘উদ্ধার’ কর্মপরিচালনা করার জন্য যে বিলিয়ন ডলার এসেছিল, তার কিয়দংশই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র হাইতিয়ানদের কাছে পৌঁছেছে। এর পরিবর্তে ওই অর্থের বেশিরভাগ ব্যয় হয় বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী এবং অন্যান্য দক্ষ লোকদের সাহায্য করার জন্য।
আগামী বছরগুলোতে, হাইতিতে সরকারি দুর্নীতির জন্য মার্কিন সমর্থন এ ভূখণ্ডটিকে রাজনৈতিক সংকটের জন্য অতিরিক্ত অনুকূল করে তুলবে। তাই পরবর্তীকালে যদি সেখানে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তাহলে বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য যে সক্ষমতা দরকার তা হাইতির থাকবে না বলে আশা করা যাচ্ছে।
ভূমিকম্পের ব্যাপারে আমার নিজেরও কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি গত ২০১০ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম তুরস্কে একটি এবং ২০২০ সালের জুনে মেক্সিকোর ওক্সাকান উপকূলে ৭.৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের সাক্ষী। দ্বিতীয় কম্পনটি আমি সুগভীরভাবে অনুভব করেছি। কিন্তু সেটা ছিল ক্ষণিকের জন্য কারণ এ ভূমিকম্পে আমার বাসস্থান বা ব্যক্তিগত কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয়নি। অন্য কথায়, তুরস্ক ও সিরিয়ার সর্বশেষ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিজ্ঞতার তুলনায় আমার এ অভিজ্ঞতা আসলে কিছুই নয়। তুরস্কের অনেকেই আছেন যারা যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত। নিঃসন্দেহে বলা যায় ভূমিকম্পের আগে থেকেই তারা নিজেদের ভেতরের এক ধরনের তীব্র আবেগ অনুভব করেছেন।
তুরস্ক ও সিরিয়ায় এ বিপর্যয়ের পর আমি ওক্সাকাতে একজন মেক্সিকানের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে মেক্সিকো সিটির ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদেহ বের করতে সহায়তা করেছিলেন। সে ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে মৃতের সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছিল ১০ হাজার। তবে বাস্তবিকভাবে হয়তো মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হবে। তিনি এখনো মনে করতে পারেন তিনটি মৃতদেহের কথা—একজন মা স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত দুটি বাচ্চাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।
যারা দরিদ্র, ভূমিকম্প তাদের এক গভীর বার্তা দিয়ে যায়। জীবনের নগণ্য মূল্য সম্পর্কে তাদের আরও অবহিত করে যায়, যার ফলে ভূমিকম্প-সম্পর্কিত মানসিক আঘাত তাদের অতি সহজেই পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।
মেক্সিকো সিটির ভূমিকম্পের ঘটনার এক বছর পর ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে, ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন। প্রকৃতপক্ষে শহরটি কখনোই ক্ষতি বা দুর্যোগের অব্যবস্থাপনা থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেনি। আর এখানে অনিশ্চয়তা নতুন কিছু নয়। তবে কিছু ব্যাপার মুহূর্তের মধ্যে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এর মূল কারণ পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ মানবতা বা সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাওয়া যে কোনো কিছুকে ধ্বংস করার নতুন ভিত্তি গড়ে দেয়। তাই ‘দুর্যোগ ত্রাণ’ শিল্প নিজের কার্যক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। আর দরিদ্ররা অপেক্ষা করে নতুন কোনো বিপর্যয়ের। এখনো পর্যন্ত ধনীরা নিজেদের সামরিক সংঘাত, অর্থনৈতিক উত্থান, জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপর্যয় এবং করোনভাইরাস মহামারির আঘাত থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রেখেছে। কিন্তু দরিদ্রদের সে ধরনের কোনো উপায় নেয়। তাদের সব সহ্য করে যেতে হয়। এর ফলে পৃথিবীতে অভাব ও শূন্যতা আরও বেড়ে যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, অন্যান্য সব বর্তমান দুর্দশার মতোই তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্পগুলো ওই এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীদেরই সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে অল্পসংখ্যক লোকের মুনাফার জন্য অধিকাংশের জন্য অনিশ্চয়তাপূর্ণ একটি অবস্থা তৈরি করে।
লেখক : মার্কিন নাগরিক ও আলজাজিরার কলামিস্ট। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন তৌহিদা জান্নাত
জনতার আওয়াজ/আ আ