নতুন সরকারের কাছে মানুষ কী চায় - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:২৪, বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নতুন সরকারের কাছে মানুষ কী চায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, মে ২৭, ২০২৬ ৪:৫১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, মে ২৭, ২০২৬ ৫:১৮ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে নাগরিকদের মনে একটিই বড় প্রত্যাশা ছিল— নির্বাচিত একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হবে এবং দেশে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ভোটাধিকার হরণ, বিচারহীনতা, অর্থ পাচার এবং মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতির অবসান চেয়েছিল মানুষ। সেই অভ্যুত্থানের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই বছর। এর মাঝে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার ও নির্বাচন দিয়ে বিদায় নিয়েছে। এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত জনআকাঙ্ক্ষার নির্বাচিত সরকার।

২৭ মে এই নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিন। কিন্তু যে ‘নতুন বাংলাদেশে’র স্বপ্ন বুকে নিয়ে তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন, ১০০ দিন পর সেই আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিস্তর ফারাক। সাধারণ মানুষের মনে এখনও শান্তি ফেরেনি। মানুষ এখন জানতে চায়— বাজারদর কমবে কিনা, চাকরি ও ব্যবসা টিকবে কিনা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিরাপদ কিনা।

মাঠপর্যায়ের চিত্র

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মনে এক ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ভর করেছে।

রাজধানীর আদাবরের ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ছাদেক বলেন, ‘সরকার যায়, সরকার আসে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন নাই। প্রতিদিন আয়ও একরকম হয় না। মালিককে ভাড়া দিয়ে কখনও হাজারখানেক টাকা থাকে, কখনও আরও কম।’

মোহাম্মদপুরের সিএনজি-চালক সাইফুল বলেন, ‘‘দৈনিক আয়ের কোনও ঠিক নেই, কিন্তু খরচ বেড়েই চলেছে। দেশের অর্থনীতি খুবই খারাপ, যাত্রী কমে গেছে। সরকারের উচিত আগে এগুলো ঠিক করা।’’

নির্মাণ শ্রমিক জমির মিয়া বলেন, ‘‘নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল— কাজ বাড়বে, মজুরি বাড়বে। কিন্তু কোনোটাই বাড়েনি। প্রতিদিন কাজও পাওয়া যায় না, অথচ বাজারে সবকিছুর দামে আগুন।’’

বাজার ও নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ

মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, মানুষের ক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু দুটি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজার এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

বেসরকারি চাকরিজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘‘সরকার বদল হয়েছে, কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায়নি। চাল, ডাল, তেল বা পেঁয়াজের দাম কমেনি। আগের সিন্ডিকেট ভেঙে হয়তো নতুন সিন্ডিকেট হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্তের পকেট তো ফাঁকা। আমরা খেয়ে-পরে বাঁচতে চাই, বড় বড় রাজনৈতিক বক্তৃতা আমাদের পেট ভরাবে না।’’

মিরপুর-১ এ বাজার করতে আসা এমদাদুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘সবকিছুরই তো দাম বেশি। এখন ডিমের দামও বেড়েছে। মাছ-মাংস সাধারণ মানুষের কেনার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বাচ্চাদের যে ডিম কিনে খাওয়াবো, সেটাও চাপ হয়ে যাচ্ছে।’’

আরেক চাকুরিজীবী মেহেদী হাসান বলেন, ‘‘আমার সংসারে এখন অভাব চলে এসেছে। আমি যে বেতন পাই তা বাড়েনি, কিন্তু খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।’’

১০০ দিনের প্রাপ্তি

সব নেতিবাচকতার মাঝেও নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো রাজনৈতিক পরিবেশের উন্মুক্ততা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

মুক্ত বাক-স্বাধীনতা: মানুষ এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অন্য কোনও কালো আইনের ভয় ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা চায়ের দোকানে বসে সরকারের মুক্ত সমালোচনা করতে পারছেন।

ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করে গেছে, তার ফলে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়াটাকে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন নাগরিক সমাজ।

সরকারের সাফল্য

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রথম ১০০ দিনে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে নিয়েছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন: প্রায় দুই দশক পর দেশে একটি সম্পূর্ণ অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। সংসদের অধিবেশন নিয়মিত বসছে এবং জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ: ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। বাজেট পুনর্বিন্যাস এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রফতানি ও সংস্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদী আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে এবং সচল করা হয়েছে দেশের রফতানি খাত।

প্রশাসনিক পুনর্বাসন: পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পুনর্বাসনের কাজ প্রায় শেষ করা হয়েছে।

যা করতে পারেনি সরকার

শততম দিনের মাথায় এসে সরকারের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার খতিয়ানও বেশ দীর্ঘ, যা নাগরিকদের মনে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা: চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম কমানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাঠপর্যায়ে পুরোনো সিন্ডিকেটের হাতবদল হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে।

চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব: শীর্ষ নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও তৃণমূল পর্যায়ে বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, কাঁচাবাজার ও বালুমহালে দলীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ হয়নি। সাধারণ মানুষের ভাষ্য— ‘নেতা বদলেছে, নীতি বদলায়নি।’

আইন-শৃঙ্খলা ও মব কালচার: পুলিশ বাহিনীকে পুরোপুরি কার্যকর ও জনবান্ধব করতে দৃশ্যমান কোনও বড় পরিবর্তন আসেনি। দেশের কিছু এলাকায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া (মব ভায়োলেন্স) বা সামাজিক সহিংসতার প্রবণতা এখনও রয়ে গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

দলীয়করণের পুরোনো রোগ: প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় যোগ্যতার চেয়ে পুনরায় দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীদের বসানোর অভিযোগ উঠেছে।

বেকারত্ব নিরসনে রোডম্যাপের অভাব: তরুণ ভোটারদের মূল দাবি কর্মসংস্থান হলেও যুবসমাজের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনও কর্মসংস্থান প্রকল্প বা উদ্যোক্তা সহায়তা তহবিলের মতো বড় কোনও রোডম্যাপ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।

মধুচন্দ্রিমা শেষ, এখন দৃশ্যমান ফলাফলের সময়

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রাথমিক ‘মধুচন্দ্রিমা’ বা ছাড় দেওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে প্রথম ১০০ দিনে সরকার কী করেছে এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোন কোন কাজ এখনও করতে পারেনি, তার দৃশ্যমান ফলাফল এখন মানুষ দেখতে চায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষ স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিল সত্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা যেকোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অর্থনৈতিক কষ্ট মেনে নেবে। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করলে জনগণ তা সহজে মেনে নেবে না। ব্যালটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা পেলেও নতুন সরকারের সামনে এখন চ্যালেঞ্জের পাহাড়। এই চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিয়ে তারা জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ