বাংলাদেশের মাতৃসম বেগম জিয়া : দেশের এই ক্রান্তিকালে তাকে বড়ই প্রয়োজন - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:১২, শনিবার, ২৩শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মাতৃসম বেগম জিয়া : দেশের এই ক্রান্তিকালে তাকে বড়ই প্রয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২, ২০২৫ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২৫ ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

 

মোবায়েদুর রহমান
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ খবর নিয়ে আজকে লিখতে চেয়েছিলাম। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পত্রপত্রিকার খবর মোতাবেক, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। স্থিতিশীলতা বলতে চিকিৎসকরা বুঝিয়েছেন যে, তার অবস্থার আর কোনো অবনতি হয়নি। তিনি মানুষজনকে চিনতে পারছেন। তিনি কিছু কিছু কথাও বলতে পারছেন। তাঁর পরিবার এবং দল তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিতে চাচ্ছে। সিঙ্গাপুর অথবা লন্ডনের কথা ভাবা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে লন্ডনকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মির্জা ফখরুলের তথ্য অনুযায়ী, দেশনেত্রীর ট্রাভেল করার মতো শরীরের অবস্থা নাই। তাঁর শরীর পারমিট করা মাত্রই তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হবে।

কয়েকদিন আগে দেশনেত্রী বেগম জিয়াকে যখন এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তখন অনেকে ভেবেছিলেন যে, মাঝে মাঝে যে তাকে সেখানে গিয়ে রুটিন চেক আপ করতে হয় সেই রকমই রুটিন চেক আপের জন্য তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বোঝা গেলো, এবার তাঁর অবস্থা খুবই জটিল। মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন যে, দেশনেত্রীর অবস্থা অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল। দেশবাসীর কাছে বেগম জিয়ার রোগমুক্তির জন্য তিনি দোয়া চেয়েছেন।
দেশনেত্রীর জন্য দেশের ১৮ কোটি মানুষ যে কত বিচলিত, সেটি গত কয়েকদিনের খবরে বোঝা গেছে। সারাদেশের মসজিদে তাঁর জন্য দোয়া করা হয়েছে। ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় তাঁর জন্য দোয়া করা হয়েছে। আমার মতো আপনারাও অসংখ্য মানুষকে জানেন, যারা তাদের ঘরে ঘরে তাদের নামাজে বেগম খালেদা জিয়ার নেক হায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত করেছেন।

হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত সব আল্লাহর হাতে। তিনিই জানেন, কবে তিনি দেশনেত্রীকে ওপারে নিয়ে যাবেন। কিন্তু এপারে দেখা গেছে এক অদ্ভুত, অভূতপূর্ব চিত্র। ছোটবড় সমস্ত রাজনৈতিক দল তাঁর আরোগ্য কামনায় দয়াময় পরম প্রভূর দরবারে হাত তুলেছেন। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন থেকে শুরু করে যে ৫০টির ওপর রাজনৈতিক দল রয়েছে তারা সকলে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে চাচ্ছেন, বেগম জিয়া আরো কিছুদিন বেঁচে থাকুন। দেশের এই ক্রান্তিকালে আজ তাঁর বড়ই প্রয়োজন।
বেগম জিয়ার এবারের ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনের মাধ্যমে আরেকটি চরম সত্য বেরিয়ে এসেছে। সেটি হলো, দলমত নির্বিশেষে বেগম জিয়া বাংলাদেশের নেত্রী। আজ তিনি ১৮ কোটি মানুষের কাছে বাংলাদেশের ‘মাদার ফিগার’ হিসেবে আবির্ভূত। যারা বিএনপির সমালোচক তারাও চান যে, বিএনপির সাথে যতই মতদ্বৈধতা থাক না কেনো, বেগম জিয়া আমাদের সকলের নেত্রী। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত সমগ্র ভূখ-ের অবিসংবাদিত নেত্রী। দেশনেত্রী কীভাবে মাদার ফিগারে পরিণত হলেন?

॥দুই॥
বাংলাদেশে বেগম জিয়ার আসন শুধু মাত্র সর্বোচ্চ নয়, বরং প্রতিটি মানুষের মনের মনিকোঠায় তার বাস। এই স্থানটি কীভাবে তিনি দখল করলেন?
বেগম খালেদা জিয়া মাত্র ৩৬ বছর বয়সে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ ছিলো না। তিনি গৃহবধু ছিলেন এবং গৃহবধুই থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে আসে রাজনীতিতে। বেগম জিয়ার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নৃশংস হত্যাকা- তাকে রাজনীতিতে টেনে নিয়ে আসে। তাও শহীদ জিয়ার হত্যাকা-ের অব্যবহিত পর নয়। শহীদ জিয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। একদিন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার স্বয়ং বেগম জিয়াকে বললেন, দল এবং রাষ্ট্রের গুরুভার তিনি বহন করতে পারছেন না। তাকে অনুরোধ করলেন, বেগম জিয়া যেনো এই গুরুভার লাঘব করেন। বেগম জিয়া প্রথমেই কোনো রাষ্ট্রীয় পদে আসেননি। প্রথমে তিনি দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

যে মহিলা ছিলেন গৃহবধু, দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর সেই মহিলাকেই দেখা গেলো রাজপথে গণতন্ত্রের পক্ষে এবং স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে এক লড়াকু সৈনিক হিসেবে। জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারকে যখন মদদ দিচ্ছিলেন শেখ হাসিনা তখন প্রেসক্লাব থেকে দৈনিক পাকিস্তান পর্যন্ত প্রলম্বিত রাজপথে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন দু’-তিনটি ঘটনার স্বাক্ষী।

জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঢাকার রাজপথ যখন উত্তাল তখন একদিন বিএনপির মিছিলে আমিও ছিলাম। পুরানা পল্টনের কিছু পূর্বে বেগম জিয়ার মিছিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। বেগম জিয়া আহত হন । যতদূর মনে পড়ে, তাঁর কর্মীরা তাকে চতুর্দিক পরিবেষ্টন করে হাউজ বিল্ডিং অফিসের পেছনে খুব সম্ভব মরহুম কাজী জাফরের ইউপিপি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে চোখ মুখে পানি ছিটানোর পর তিনি উঠে বসেন এবং আবার মিছিলে যোগ দেন।
এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনে শেখ হাসিনাও যখন কোলাবরেটরের ভূমিকায় ছিলেন তখন বেগম জিয়া ছিলেন শেষ পর্যন্ত আপোসহীন। এই আপোসহীনতাই তাকে ভূষিত করে এক গৌরবোজ্জ্বল খেতাবে। আর সেটি হলো আপোসহীন দেশনেত্রী। ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এইচএম এরশাদ নির্বাচন দেন। এই নির্বাচনে যারা অংশ নেবে তারা ‘জাতীয় বেইমান’ হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। অথচ কী আশ্চর্য্য, ঐ ঘোষণার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিগবাজি মেরে শেখ হাসিনা ঐ ইলেকশনে যান। কিন্তু বেগম জিয়া শেষ পর্যন্ত ৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটে অটল থাকেন।

বেগম খালেদা জিয়া আজীবন আপোসহীন দেশনেত্রী খেতাবে ভূষিত থাকলেও জনগণের বৃহত্তর চাহিদা তিনি সব সময় মেনে নিয়েছেন। শহীদ জিয়া ছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু এরশাদের স্বৈরাচার বিরোধী ঐক্যজোটের আন্দোলনের একটি দাবি ছিলো সরকার পদ্ধতি হবে পার্লামেন্টারি বা সংসদীয়। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রায় সকলেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন দল হওয়ায় তারাই নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাবে। আওয়ামী লীগ গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে (আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে)। আর বিএনপি গঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। অথচ, সেই আওয়ামী লীগকে পরাস্ত করে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয় বিএনপি। জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা মোতাবেক বেগম জিয়া ক্ষমতা গ্রহণের পর দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারকে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারে রূপান্তরিত করেন।

গণ দাবিকে সানন্দে গ্রহণ করার আরেকটি অন্যন্য নজির হলো কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন। শুধুমাত্র কেয়ার টেকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বেগম জিয়া ১৯৯৬ সালে সংসদ ভেঙে দেন এবং নির্বাচন করেন। কারণ, সংবিধান সংশোধন করতে হলে দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আগের সংসদে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠত ছিলো না। তাই পরবর্তী নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকারের ব্যবস্থা করেন। এই সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করার পর তিনিই সেই সংসদ ভেঙে দেন এবং পদত্যাগ করেন। নির্বাচন করার জন্য ৩ মাসের জন্য কেয়ারটেকার সরকার গঠন করেন অবসর প্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান।

॥তিন॥
একটি রাজনৈতিক দল টেকসই হয় তখনই যখন সে জনগণের নাড়ির স্পন্দন অনুভব করতে পারে। আর একজন নেতা কালজয়ী হতে পারেন যখন তিনি জনগণের নাড়ির স্পন্দন অনুযায়ী কাজ করেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন সৈনিক ছিলেন। কিন্তু সৈনিক হয়েও এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হয়েও জনগণের প্রাণের ভাষা তিনি বুঝেছিলেন এবং সেই মোতাবেক শেখ মুজিবের সাড়ে ৩ বছরের রাজত্বের বিপরীতে দেশবাসীর সামনে নতুন রাজনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করেন। জনগণ সেই দর্শন সানন্দ চিত্তে গ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি জনগণের কাছে মৃত্যুর পরেও অক্ষয় হয়ে রয়েছেন।

একই বৈশিষ্ট্য ছিলো বেগম খালেদা জিয়ার। শহীদ জিয়াউর রহমান যে পথরেখা অঙ্কন করেছিলেন সেই পথরেখার শতভাগ অনুসরণ করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। শহীদ জিয়াউর রহমান ফারাক্কার পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো আপোস করেননি। ফারাক্কা ইস্যু শহীদ জিয়া জাতিসংঘেও নিয়ে গিয়েছিলেন। আর বেগম জিয়া ভারতকে ট্রানজিট তথা করিডোর দেওয়ার ব্যাপারেও কোনো আপোস করেননি। এই প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করছি।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর বেগম জিয়া বিরোধী দলের নেত্রী হন। তখন তার প্রেস সচিব ছিলেন আনোয়ার জাহিদ। বিরোধী দলের নেত্রী হিসাবে মিন্টো রোডের বাসভবনে বেগম জিয়া এক সংবাদ সম্মেলন করেন। ঐ সংবাদ সম্মেলনে দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিনিধি হিসেবে আমি বেগম জিয়াকে প্রশ্ন করি, ‘ভারতের ট্রানজিট তথা করিডোরের দাবির ব্যাপারে তাঁর অবস্থান কী?’ কোনোরূপ রাখঢাক না করে তার উত্তর ছিলো, ‘বুকের রক্ত ঢেলে দেবো, তবুও ভারতকে করিডোর দেবো না।’

॥চার॥
কুখ্যাত এক এগারোর কথা আপনারা সকলেই জানেন। এক এগারোর প্ল্যান ছিলো মাইনাস টু। মাইনাস টু ফর্মুলা অনুযায়ী শেখ হাসিনা জেনারেল মঈনের সাথে আঁতাত করে দেশের বাইরে চলে যান। কিন্তু বেগম জিয়া শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে থাকার স্ট্যান্ডে অটল ছিলেন। বেগম জিয়ার এই অবিচল মনোভাবের কারণে তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র এবং বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জেনারেল মঈনের সেনাবাহিনী নির্মম নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের ফলে তারেক রহমানের মেরুদ-ের হাড় ভেঙে যায়। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং জেনারেল মঈনের নীল নকশা অনুযায়ী ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা হয়। এই টোপ বেগম জিয়াকেও দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তিনি সেই টোপ গেলেননি। তার সময় বিএনপির স্লোগান ছিলো, ‘সিকিম নয় ভুটান নয়/ এদেশ আমার বাংলাদেশ।’

বেগম জিয়ার সততা, আপোসহীনতা, আধিপত্যবাদ বিরোধিতা এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বেগম জিয়াকে ইতিহাসের শিলালিপিতে কালজয়ী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই মাদার ফিগারকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বড়ই প্রয়োজন। চারিদিকে ষড়যন্ত্র। গণতন্ত্র আসি আসি করেও প্রতি পদে বাধা পাচ্ছে। দেশনেত্রী যদি সুস্থ থাকেন তাহলে বাংলাদেশ সমস্ত বাধার বিন্ধ্যাচল পার হতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
Email:journalist15@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ