বিএনপির অতীত ভুল ও কিছু পরামর্শ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১১:৩৩, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপির অতীত ভুল ও কিছু পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৫ ৮:১১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৫ ৬:৫৫ অপরাহ্ণ

 

ব‍্যারিস্টার রফিক আহমেদ
শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করে দেশের রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। শহীদ জিয়াকে নিয়ে দেশের বেশিরভাগ মানুষের কোনো প্রশ্ন নেই। সর্বস্তরের মানুষ তাকে ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে। তবে শহীদ জিয়া পরবর্তী সময়ে বিএনপির বারবার ভুলের মাশুল পুরো জাতিকে দিতে হয়েছে। বিএনপির অতীত ভুলগুলো এবং কিছু পরামর্শ নিয়ে এই নিবন্ধে আলোচনা করা হলো।

১৯৯১-১৯৯৬: বিএনপির প্রথম শাসনামলের ভুলসমূহ

১. ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে জাতীয় সরকার না করা: ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সরকার গঠনের সুযোগ ছিল। কিন্তু দলটি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। জাতীয় সরকার গঠন করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো।

২. সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করা: ১৯৯১ সালে বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় গেলেও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়। সংবিধানের কিছু অস্পষ্টতা এবং সমস্যাগুলো সমাধান করা হলে রাজনৈতিক সংকট অনেকাংশে কমে যেত।

৩. মাগুরার নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ: মাগুরার নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল, যা আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের সুযোগ করে দিয়েছে। এই ঘটনা বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।

৪. সার চোরাচালানে জড়িত দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া: সার চোরাচালানের সাথে জড়িত দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এমনকি এই ইস্যুতে ১৭ জন কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়, যা বিএনপির জন্য একটি বড় কলঙ্ক।

৫. ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে পুলিশের পক্ষ নেওয়া: ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ নেওয়া বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল ছিল। এই ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

৬. কেয়ারটেকার সরকারের দাবি না মানা এবং জামাতকে দূরে ঠেলে দেওয়া: বিএনপি কেয়ারটেকার সরকারের দাবি না মানায় রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া জামাতকে দূরে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও দলের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।

২০০১-২০০৬: বিএনপির দ্বিতীয় শাসনামলের ভুলসমূহ

১. শহীদ জিয়ার হত্যাকাণ্ডে বিচার না করা: শহীদ জিয়ার হত্যাকাণ্ডের বিচার না করা বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল ছিল। এই ঘটনায় শেখ হাসিনার জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও বিএনপি তা তদন্তে এগিয়ে আসেনি।

২. সংবিধান সংশোধন না করা: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার পরও বিএনপি সংবিধান সংশোধন করতে ব্যর্থ হয়। এই সুযোগ কাজে লাগানো হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকত।

৩. কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার না করা: কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার না করা বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল ছিল। এই ঘটনায় শেখ হাসিনার জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও বিএনপি তা তদন্তে এগিয়ে আসেনি।

৪. ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রহস্য উন্মোচন না করা: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রহস্য উন্মোচন না করা বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল ছিল। এই ঘটনায় শেখ হাসিনার জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও বিএনপি তা তদন্তে এগিয়ে আসেনি।

৫. হাইকোর্টের বিচারপতিদের উপর হামলার বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকা না রাখা: হাইকোর্টের বিচারপতিদের উপর হামলার বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকা না রাখা বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল ছিল। এই ঘটনায় বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

৬. দেশপ্রেমিক ও আওয়ামী প্রেমিক চিনতে না পারা: বিএনপি অনেক আমলা, সেনা অফিসার এবং পুলিশ অফিসারকে নিজেদের পক্ষে ভেবে তাদের ভালো পজিশনে বসিয়েছে, যারা পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছে। এটি বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল ছিল।

৭. আওয়ামী পন্থী গোয়েন্দাদের দিয়ে কাজ সারানো: বিএনপি আওয়ামী পন্থী গোয়েন্দাদের দিয়ে কাজ সারানোর চেষ্টা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করেছিল।

৮. সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার পরিকল্পনা ধরতে না পারা: বিএনপি সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার পরিকল্পনা ধরতে ব্যর্থ হয়, যা শেখ হাসিনার পরিকল্পনা বলে অভিযোগ রয়েছে।

৯. দলের কিছু নেতার ভুল পরামর্শ: দলের কিছু নেতার ভুল পরামর্শের কারণে বিএনপি অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দলের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে।

১০. দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া: বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও কিছু পরামর্শ

১. আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতি নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান: বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতি নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তবে এখন অবস্থান পরিবর্তন ভালো ইঙ্গিত দেয়।

২. জামায়াতকে নিয়ে বিভ্রান্তি: জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির কিছু নেতার বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দলের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। আমি মনে করি জামায়াত কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না, এই বিষয়ে বিচলিত হবার কিছু নেই।

৩. উশৃঙ্খল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: বিএনপির উশৃঙ্খল, চাঁদাবাজ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু দল থেকে বহিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

৪. যোগ্য প্রার্থী বাছাই: বিএনপিকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে হবে, যারা সত্যিকার অর্থে দেশের পরিবর্তনে ও দেশ গঠনে মূল্যবান ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শুধুমাত্র দীর্ঘদিন ধরে দল করেন বা দলের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন, এটা কোনো যোগ্যতা নয়।

৫. ফ্যাসিবাদের পতনে আন্দোলনকারীদের সাথে সহযোগিতা: ফ্যাসিবাদের পতনে আন্দোলনকারীদের সাথে সহযোগিতা ও সহমর্মিতা পোষণ করা উচিত। তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে তাদের সাথে সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করা উচিত। তাদের ভুল থাকলেও তাদের কঠোর সমালোচনা না করে তাদের সাথে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।

৬. ভারত তোষণ না করাঃ বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় আধিপত্য বিরোধী। সর্বোপরি হাসিনার বিগত ১৫ বছরে বিএনপির উপর নির্যাতন, ক্ষমতার বাইরে থাকা ইত্যাদি কারণে ভারতীয় ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ছিলো। এ চক্রান্ত এখনো অব্যাহত।

উপসংহার

বিএনপির অতীত ভুলগুলো জাতিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। তবে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে বিএনপি আবারও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। দলটিকে অবশ্যই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অযোগ্য নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হবে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ