মুন্সিগঞ্জে বিলুপ্তির পথে পাটি শিল্প - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:২৮, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

মুন্সিগঞ্জে বিলুপ্তির পথে পাটি শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জুলাই ১০, ২০২৫ ১০:০৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জুলাই ১০, ২০২৫ ১০:০৫ অপরাহ্ণ

 

ন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
ছবি:প্রতিনিধি

কালের আবর্তে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পাটির শিল্প বিলুপ্তির পথে। গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শন এই শিল্প একসময় প্রতিটি ঘরে ঘরে দেখা গেলেও এখন তা টিকে আছে কেবল বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টায়।

এক সময় অতিথি আপ্যায়ন হতো পাটিতে বসিয়ে, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতো শীতলপাটির ওপর। আজও হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েতে শীতলপাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের দুপুরে এই পাটি দেহ ও মনে এনে দিত শীতলতা।

বর্তমানে উপজেলার মেদিনী মন্ডল ইউনিয়নের কুমারভোগ গ্রামে ১৮টি পরিবার পাটি শিল্পকে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। এসব পরিবারের নারীরা শীতলপাটি, বড় চট, ছোট চটসহ নানা ধরনের পাটি তৈরি করছেন। নতুন বধূদের হাতের ছোঁয়ায় নকশা করা পাটিগুলো হয়ে উঠছে শৈল্পিক শিল্পকর্ম। অনেকেই আবার শীতলপাটি দেয়ালে টাঙিয়ে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ান।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঘ-ফাল্গুন মাস পাটি বোনার উপযুক্ত সময়। আর বৈশাখে থাকে এর সর্বোচ্চ চাহিদা। বছরের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বর্ষজীবী উদ্ভিদ ‘পাইত্রা’ বা ‘মোতরা’ সংগ্রহ করা হয় মূলত সিলেট থেকে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, টঙ্গিবাড়ি, লৌহজং, সিরাজদিখানের ইছাপুরা, কুসুমপুর, চন্দনধূল, আবিরপাড়া ও অন্যান্য হাট থেকে পাইত্রা কিনে আনেন পাটিকররা।

গ্রাম থেকে ১ পোঁজা পাইত্রা কিনতে খরচ পড়ে ৫০-১০০ টাকা, আর হাট থেকে কিনলে ৩০০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। এক পোঁজা পাইত্রা থেকে প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া যায় তিনটি ভাগ—১ ভাগ বেতি (পাটি তৈরিতে ব্যবহার), ১ ভাগ আতি (ধানের মোটা বা পানের বিড়া বাঁধার কাজে) এবং ১ ভাগ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১ পোঁজা পাইত্রা দিয়ে তৈরি পাটি বিক্রি হয় ৫০০-৫৫০ টাকায়। পাটির মাপ অনুযায়ী বুনন মজুরি নির্ধারিত হয়—

৩ হাত বাই ৪ হাত: ৯০ টাকা, সাড়ে ৩ বাই সাড়ে ৪ হাত: ১২০ টাকা, ৪ হাত বাই ৫ হাত: ১৪০ টাকা।

উন্নত মানের পাটিকে ডালার বলা হয়, যা বুনতে সময় লাগে ৯-১০ দিন। এ ধরনের একটি পাটিতে বুনন খরচ হয় প্রায় ৬০০ টাকা, আর পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ২৫০০-৩০০০ টাকায়।

এ জেলার পাটি বিক্রির অন্যতম বাজার হলো টঙ্গিবাড়ি উপজেলার বেতকা ও আব্দুল্লাপুর। এ হাটে ঢাকা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদি থেকে পাইকাররা পাটি কিনতে আসেন। এছাড়া সিরাজদিখান বাজারেও চলে বিক্রি।

কারুপল্লিগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, কেউ দল বেঁধে রঙিন বেত দিয়ে ফুলের নকশার পাটি তৈরি করছেন, আবার কেউ নতুন পাটির জো তুলে দিচ্ছেন। দক্ষ পাটিকর নারীদের চাহিদা আছে সর্বত্রই।

একজন পাটিকর অতুল দে (৬০), ভাটিমভোগ গ্রামের বাসিন্দা, বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করে আসছি। সংসার চালাতে হিমশিম খাই, কিন্তু এখনও এ কাজ ছাড়িনি।

পশ্চিম রাজদিয়া গ্রামের মনিন্দ্র চন্দ্র দে জানান, আমরা চার ভাইয়ের মধ্যে তিন ভাই এই কাজ করি। বিয়ে বাড়িতে এখনো এই পাটির চাহিদা অনেক। সরকার সহায়তা করলে আমরা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারব।

মায়ারাণী দে, ইতি, শোভা দে, অর্চনা দে—এইসব নারীর মতো অনেকেই পাটি বিক্রি করে সংসারের বাড়তি খরচ চালাচ্ছেন। তারা নিজেদের সঙ্গে এলাকার আরও নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনৈতিক। সরকারি-বেসরকারি কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেই শীতলপাটি শিল্পীদের ঋণ মেলে না। অথচ সরকারি উদ্যোগে এই শিল্পটি রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে পাটিকরদের দিন ফিরতে পারত।

লৌহজং উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নেছার উদ্দিন বলেন, বর্তমানে উপজেলার মাত্র ১৮টি পরিবার এই শিল্প ধরে রেখেছে। আমরা চেষ্টা করছি এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে। অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা আছে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ