যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হতে মিথ্যা অভিযোগ অভিবাসীদের
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬ ৭:৪৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬ ৭:৪৪ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যে বসবাসের স্থায়ী অনুমতি পেতে কিছু অভিবাসী পারিবারিক নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। বিবিসির এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মন্ত্রীদের প্রবর্তিত সুরক্ষানীতির অপব্যবহার করে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের চেয়েও দ্রুত স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করছে একটি চক্র। আইনজীবীদের দাবি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপর্যাপ্ত যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ নিয়ে সামান্য প্রমাণেই স্থায়ী বসবাসের সুযোগ মিলছে। এতে মিথ্যা অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন নিরপরাধ ব্রিটিশ সঙ্গীরা, ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবন।
অভিবাসনব্যবস্থার এই ভয়াবহ ছিদ্রটি চিহ্নিত হয়েছে ‘অভিবাসী গার্হস্থ্য নির্যাতন ভুক্তভোগী ছাড়’ নামে সুরক্ষাব্যবস্থার অপব্যবহার খতিয়ে দেখতে গিয়ে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু নারী ও পুরুষ অভিবাসী পরিকল্পিতভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বা বিয়েতে জড়াচ্ছেন। যুক্তরাজ্যে পা রাখার পর সুযোগ বুঝে সঙ্গীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের বানোয়াট অভিযোগ আনছেন। এই কাজে তাদের প্রলুব্ধ ও সহায়তা করছেন একশ্রেণির অসাধু আইনি উপদেষ্টা। তারা অর্থের বিনিময়ে নির্যাতনের মিথ্যা গল্প সাজিয়ে দিচ্ছেন।
বিবিসির একজন ছদ্মবেশী প্রতিবেদক এমন এক উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এলি সিসওয়াকা নামের ওই উপদেষ্টা ৯০০ পাউন্ডের বিনিময়ে একটি মিথ্যা দাবি ও স্ক্রিপ্ট তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিবেদক পাকিস্তান থেকে আসা এক নতুন অভিবাসী সেজে জানিয়েছিলেন, তিনি স্ত্রীকে ছেড়ে প্রেমিকার সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু ভিসা বিয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায় দেশ ছাড়ার ভয়ে আছেন। সিসওয়াকা তাকে পরামর্শ দেন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভান করতে। তিনি জানান, ‘মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন’ হিসেবে মামলাটি সাজানো হবে, যেখানে কোনো শারীরিক জখমের প্রমাণের প্রয়োজন পড়বে না। সিসওয়াকা কোনো নিবন্ধিত আইনজীবী নন, তবু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগ চালিয়ে আসছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ৫ হাজার ৫৯৬ জন অভিবাসী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হিসেবে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেছেন। তিন বছরে এই হার ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আবেদনকারীদের এক-চতুর্থাংশই পুরুষ। গত দুই বছরে পুরুষদের আবেদনের হার বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বসবাসের অনুমতি পাওয়ার এই পথটি এখন অভিবাসন আইন ফাঁকি দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গীর অজান্তেই তার বিরুদ্ধে আদালতের হয়রানি-বিরোধী আদেশ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললেও শুধু একটি ক্রাইম রেফারেন্স নাম্বারকে সম্বল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা পড়ছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন আয়শা (ছদ্মনাম)। একটি মুসলিম ডেটিং অ্যাপে আলাপ হওয়া এক পাকিস্তানি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। পরে জানা যায়, লোকটি নাগরিকত্বের বিষয়ে মিথ্যা বলেছিল। সম্পর্ক তিক্ত হলে আয়শা শ্বশুরবাড়ি ছাড়েন এবং লোকটির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন। কিন্তু ভিসা বাতিলের নোটিশ পাওয়ার পর ওই ব্যক্তি উল্টো আয়শার বিরুদ্ধে নির্যাতনের বানোয়াট অভিযোগ আনেন। আয়শা বলেন, লোকটি তার বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের মিথ্যা গল্প সাজিয়েছে। এতে পুলিশ বিভ্রান্ত হয়ে আয়শাকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করে। ক্রাইম ইনজুরি কম্পেনসেশন অথরিটি আয়শার ওপর হওয়া যৌন নিপীড়নের সত্যতা পেয়ে তাকে ক্ষতিপূরণ দিলেও তার সাবেক স্বামী মিথ্যা অভিযোগের জোরেই দেশটিতে অবস্থান করছেন।
সুরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী জেস ফিলিপস এই পরিস্থিতিকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রতারণার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে থাকার চেষ্টা করলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফেরত পাঠানো হবে। এই জালিয়াতিতে সহায়তাকারী ভুয়া আইনজীবীদের কারাগারে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। অপরাধীদের বাজেয়াপ্ত করা অর্থ এই খাতের সংস্কারে ব্যয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অভিবাসন পরিষেবা কমিশনার গাওন হার্ট জনসাধারণের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, শুধু নিবন্ধিত উপদেষ্টাদের সাহায্য নেওয়া উচিত। অনিবন্ধিত উপদেষ্টাদের শরণাপন্ন হওয়া মানেই নিজেদের বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলা।
২০১৪ ও ২০১৫ সালেও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছিল। তখন দেখা গিয়েছিল, কর্মকর্তারা যাচাই না করা প্রমাণ বা সহায়তা সংস্থাগুলোর একপক্ষীয় চিঠির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছেন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বর্তমানে ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ প্রতিবছর এই বিশেষ ছাড়ে স্থায়ী বসবাসের দাবি তুলছেন। সিসওয়াকার মতো অসাধু চক্রগুলো ‘করপোরেট ইমিগ্রেশন ইউকে’ নামে প্রতিষ্ঠান খুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাফল্যের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সিসওয়াকা দাবি করেন, তিনি যতগুলো মামলা করেছেন তার সবই সফল হয়েছে। এটি প্রমাণ করতে তিনি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দাপ্তরিক চিঠিও ব্যবহার করছেন।
পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে একজন সাধারণ ভিসাধারীকে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের জন্য অন্তত পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে নির্যাতনের ওই বিশেষ ছাড় ব্যবহার করে কয়েক মাসেই তা পাওয়া সম্ভব। এই গতিই মূলত প্রতারকদের প্রলুব্ধ করছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা এখন থেকে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই করবেন। শুধু ক্রাইম রেফারেন্স নাম্বার থাকলেই আবেদন মঞ্জুর হবে না। প্রতিটি ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তবে আয়শার মতো ভুক্তভোগীদের মতে, ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত আরও অনেক ব্রিটিশ নাগরিককে মিথ্যা অপবাদ ও আইনি জটিলতার নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।
এই বিশাল জালিয়াতি চক্রটি মূলত সিস্টেমের মানবিক দিকটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। যেসব অভিবাসী খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল, তাদের সুরক্ষায় নিয়মটি করা হয়েছিল। অথচ এখন ওই সুরক্ষা কবচটিই ব্যবহৃত হচ্ছে নির্দোষ সঙ্গীদের সামাজিক ও মানসিকভাবে হেয় করার কাজে। বিবিসির এই অনুসন্ধান প্রকাশ্যে আসার পর অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর দাবি জোরদার হয়েছে। জেস ফিলিপস মনে করেন, বিচারব্যবস্থার এই দুর্বলতাগুলো দ্রুত মেরামত করা না গেলে অভিবাসনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যতে অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এই অসাধু চক্র ভাঙতে বদ্ধপরিকর ব্রিটিশ সরকার। সূত্র: বিবিসি
জনতার আওয়াজ/আ আ