রাজনীতিবিদদের হাড্ডিবিহীন জিহ্বাকে কুড়াল হিসেবে ব্যবহার ঠিক নয় - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৭:১৩, শনিবার, ২৩শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

রাজনীতিবিদদের হাড্ডিবিহীন জিহ্বাকে কুড়াল হিসেবে ব্যবহার ঠিক নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৮, ২০২৫ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৮, ২০২৫ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

 

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

গণঅভ্যুত্থানের পর এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নানা চ্যালেঞ্জ ও বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত দেশ। যা সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এই কঠিন সময়ে সবাইকে সংযম দেখানো দরকার ছিল। দরকার ছিল দায়িত্বশীল আচরণের। কিন্তু আমরা বাস্তবে কী দেখছি? সবাই যেন তাদের দাবি নিয়ে উতলা। এ যেন দাবি আদায়ের সর্বোত্তম সময়। সবচেয়ে বেশি যাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ জাতি আশা করে তারা হলো রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদ। আমরা কি রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বশীল আচরণ দেখতে পাচ্ছি?

দেশকে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীল রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। রাজনীতিবিদরাই দেশ চালাবেন। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের বেশিরভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। রাজনীতিবিদদের কথায় দেশে আগুন লাগতে পারে, আবার তাদের কথায় দেশে শান্তি ফিরে আসতে পারে, বিরাজ করতে পারে স্বস্তি। আন্তর্জাতিক খ‍্যাতিসম্পন্ন কানাডার প্রখ‍্যাত লেখক রবিন শার্মার মতে, “Words can inspire. And words can destroy. ⁢Choose yours well” (অর্থাৎ “কথামালা অনুপ্রেরণা দিতে পারে। আর কথামালা ধ্বংস করতে পারে। ⁢তোমারটা ভালোভাবে বেছে নাও)।”⁢

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে কাঁদা ছোরাছুড়িতে ব‍্যস্ত। অকথ্য ভাষায় গালাগালি, বিশ্রী ভাষায় আক্রমণ, রাজনীতিতে আগত একেবারে নবীনদের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ ছাড়াই মারাত্মক অভিযোগ যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিত‍্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় গালাগালি ও আক্রমণের ভাষা রাজনীতির ব‍্যাকরণের বাইরে চলে যায়। লেখাতে বা বলাতে পুনর্বার উচ্চারণ পর্যন্ত করা যায় না। ফলে জাতি হয় বিভ্রান্ত ও দ্বিধাবিভক্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতি আবেগী কর্মী ও সমর্থকদের জন্য গালাগালি ও আক্রমণের ভাষা যেন পোয়াবারো। তারা বরং গালাগালি ও আক্রমণের ভাষার মাত্রা আরো কয়েক ডিগ্রি বাড়িয়ে ট্রল করা শুরু করে।

রাজনীতিতে দ্বিমত বা বহুমত থাকতেই পারে, থাকা একেবারে স্বাভাবিক। বরং বহুমত থাকাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে পলিসি নিয়ে, আদর্শ নিয়ে এবং গঠনমূলক রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে। তারা একে অপরের সাথে অবশ্যই যুদ্ধ করবে, তবে সে যুদ্ধ হতে হবে দর্শন দিয়ে, মেধা ও যুক্তি দিয়ে। নিশ্চয়ই অস্ত্র বা অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা দিয়ে নয়। রাজনীতিতে তর্ক হবে, বিতর্ক হবে এবং জনগণ এই তর্ক-বিতর্ক থেকেই উত্তমটা বেছে নেবে। তবে সব তর্ক-বিতর্ক হবে শালীনভাবে, রাজনীতির গন্ডির ভেতর পারস্পরিক সৌজন্যতা ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে।

ভদ্র ও শালিন ভাষায় অনেক বড় ও শক্তিশালী কথা বলা যায়। তাছাড়া ভদ্রতা ও শালীনতার মাধ্যমে মানুষের মনও সহজে জয় করা যায়। বস্তুত: নিজের কথা ও ভাষা নিজেকে অন্যের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমেরিকার প্রখ‍্যাত কবি ও লেখক Edgar Allan ⁣Poe এর মতে “Words are, in truth, the image⁤ of the soul” (অর্থাৎ “কথামালা আসলে আত্মার প্রতিচ্ছবি”)। চিৎকার করে, রগ চেটিয়ে, গালাগালি করে, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে, অভিযোগ করে এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না। বরং এতে হিতে বিপরীত হয়। দার্শনিক জালাল উদ্দিন রুমির ভাষায়, “Raise your words, not voice.⁤ It is rain that grows ⁤flowers, not thunder” (অর্থাৎ আপনার কথামালা তুলে ধরো, কণ্ঠস্বর নয়। বৃষ্টিই ফুল ফোটায়, বজ্রপাত নয়”)।

একে অপরকে খাটো করা, তিরস্কার করা এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে তীর্যক মন্তব্য করা থেকেই শুরু হয় যা তাদের কর্মী ও সমর্থকদের মাধ্যমে গিয়ে ঠেকে একেবারে অশালীন গালিগালাজ ও দোষারোপে। এভাবে পারস্পরিক আক্রমণ যখন শুরু হয় তখন স্ব স্ব দলের কর্মী ও সমর্থকরা হাতে অস্ত্র পায়, জিহ্বাকে ব‍্যবহার করা শুরু করে কুড়াল হিসেবে।

বিএনপি ও জামায়াত দু’দলকে বলছি- একসাথে তো আপনারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করছেন, একসাথে সরকার গঠন করেছেন এবং একসাথে পতিত সরকারের হাতে দেড় দশকের উপরে ধরে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এখন এভাবে কাঁদা ছোড়াছুড়ি বা উল্টা-পাল্টা আক্রমণ না করে নিজ দলের আদর্শ, গঠনমূলক রাজনৈতিক প্রোগ্রাম ও মেনিফেস্টো নিয়ে জনগণের কাছে যান। পজিটিভ রাজনীতি করুন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহযোগিতা করুন। Let the people decide (জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন)। জনগণ যাদেরকে ম‍্যান্ডেট দেবে তারাই দেশ চালাবেন।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন, আমাদের প্রায় সব অঙ্গে মহান স্রষ্টা হাড় (হাড্ডি) দিয়েছেন, কিন্তু জিহ্বাতে হাড্ডি দেন নাই। কত সুনিপুণ মহান প্রভুর সৃষ্ঠি! অথচ এই নরম হাড্ডিবিহীন জিহ্বাকে আমরা প্রায় সময় কুড়াল (কুঠাল) হিসেবে ব্যবহার করি! এই জিহ্বার কারণে আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ ঝগড়া, দ্বন্ধ, আক্রমণ ও মারামারি সংগঠিত হয়। এই হাড্ডিবিহীন জিহ্বার আঘাত অনেক সময় মারাত্বক অস্ত্রের চেয়েও বেশি জঘন্য, স্থায়ী ও ক্ষতিকর হয়। ত্রিশ দশকের বৃটিশ রাজনীতিবিদ Pearl Strachan ‌Hurd এর ভাষায়, “Handle ‌them‌ carefully, for tongues have more power than atom bombs” (অর্থাৎ “এগুলো সাবধানে সামলাও, কারণ জিহ্বার শক্তি পরমাণু বোমার চেয়েও বেশি”)।

তাই এই জিহ্বাকে হেফাজত বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের প্রিয় ধর্ম কত না গুরুত্ব দিয়েছে! দুটি জিনিষের নিশ্চয়তা দিলে জান্নাতের (বেহেশতের) নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ও অন্যতম হলো জিহ্বা। আমাদের প্রিয় নবী (স:) বলেছেন “যে আমাকে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।” (সহিহ বুখারী: ৬৪৭৪)!

হাড্ডিবিহীন জিহ্বাকে কুড়াল হিসেবে ব্যবহার করে পতিত সরকার প্রধানের কী দশা হয়েছে তা একেবারে আমাদের চোখের সামনে। “শেখ হাসিনা পালায় না”, “রাজাকারের নাতিপুতিরা কি পাবে” এমন কথা বলে তার আজকের পরিণতি! শহীদ জিয়া, বেগম জিয়া ও তারেক রহমান সম্পর্কে কি-না বিশ্রি ভাষায় তিনি গালিগালাজ করতেন। মুখ খুললেই যেন বের হতো গালিগালাজ। অনেকের মনে হতো জিহ্বাই যেন তার প্রধান শত্রু। আর পরিণামে হয়েছেও তাই। জনৈক মনীষীর ভাষায়, “A sharp ⁣tongue can⁤ cut your own throat” (অর্থাৎ “ধারালো জিহ্বা তোমার নিজের গলা কেটে ফেলতে পারে”)।

রাজনীতিবিদদের সাবধান হওয়া উচিৎ। জিহ্বাকে কুড়াল হিসেবে ব্যবহার করবেন না। জনৈক দার্শনিক বলেছেন, “The tongue has⁢ no bones, but it is strong⁣ enough to break ‍a heart. ⁢So be careful⁢ with your words” (অর্থাৎ জিহ্বার কোনো হাড় নেই, কিন্তু এটি হৃদয় ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই আপনার কথার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন”)। জিহ্বাকে কুড়াল হিসেবে ব্যবহারে আর যাই হোক জাতি গঠন হবে না, হবে না নিশ্চিত সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা। বরং জিহ্বাকে কুড়াল হিসেবে ব্যবহারে অনেকটা নিজের পায়ে কুড়াল মারা।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্র চিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ