‘লোহার খাঁচা’ অমর্যাদার নিদর্শন : শহীদুল্লাহ ফরায়জী - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:১৮, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

‘লোহার খাঁচা’ অমর্যাদার নিদর্শন : শহীদুল্লাহ ফরায়জী

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জুন ৬, ২০২৪ ২:১৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, জুন ৬, ২০২৪ ২:১৩ পূর্বাহ্ণ

 

মুক্তি সংগ্রামের বাংলাদেশে কাউকে লোহার খাঁচায় প্রবেশ করানো- কোনো ক্রমেই মানুষের মর্যাদার সুরক্ষা দেয় না। লোহার খাঁচা নিষ্ঠুরতার স্মৃতিচিহ্ন, ঐ খাঁচা ব্যবহৃত হয় হিংস্র পশুপাখিকে আবদ্ধ রাখার জন্য, যেন লোকালয়ে এসে হিংস্রতার প্রতিফলন না ঘটায়। ঔপনিবেশিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত দেশে মানুষের জন্য আদালতে ‘লোহার খাঁচা’ বসানো হয়েছে স্বপ্রণোদিত হয়ে, এটা বিস্ময়কর! এটা জাতির কপালে দুর্দশার সিলমোহর।

আদালত ন্যায়বিচারের জায়গা, পশুপাখির চিড়িয়াখানা নয়। একটি স্বাধীন দেশে কী গ্রহণীয় আর কী বর্জনীয় তাও সরকারের বিবেচনায় নেই। মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারের অভিপ্রায় থেকে সরকার আদালতে লোহার খাঁচা প্রতিস্থাপন করেছে। একটি জাতির বহু নিদর্শন থাকে, স্থাপত্য থাকে, সৌধ থাকে- যা দিয়ে জাতির পরিচয় পাওয়া যায়। আমরা আমাদের বহু অর্জনকে যেভাবে বিনষ্ট করে ফেলেছি, তাতে এখন ‘লোহার খাঁচা’ রাষ্ট্রের চিহ্ন হয়ে প্রকাশ পাবে। এটা ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার। ভয়ভীতি নিয়ন্ত্রণ জারি রেখে জনগণকে পদানত রাখা।

আমরা উন্নয়নের জোয়ারে কাঠগড়াকে লোহার খাঁচায় রূপান্তর করেছি। কিন্তু কাঠগড়া এবং লোহার খাঁচার পার্থক্য সরকারের বিবেচনায় স্থান পায়নি।

লোহার খাঁচা যে মানুষের জন্য অপমানকর, আমৃত্যু যন্ত্রণা এবং হৃদয়ে রক্তক্ষরণের অমোঘ উৎস- তা প্রকাশ পেয়েছে ডক্টর ইউনূসের মর্মবেদনায়। পরাধীন আমলের ‘কাঠগড়া’ আর রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীন দেশের ‘লোহার খাঁচা’- দু’টো কখনোই এক বিষয় হতে পারে না। লোহার খাঁচা জনগণের জন্য একবিংশ শতাব্দীর সেরা অপমান ও মর্মবেদনাজনক এক উপঢৌকন। সরকার দেশের জনগণকে স্বাধীনতা দেয়, গণতন্ত্র দেয়, উন্নয়ন দেয়, কারাগার দেয়, এখন বরাদ্দ দিচ্ছে ‘লোহার খাঁচা।’
লোহার খাঁচা নিয়ে নোবেল বিজয়ী ডক্টর ইউনূস, যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তাতেই বুঝা যায় মানবতার চরম বিপর্যয়ের কথা। তিনি বলেছেন- ‘এই প্রথম লোহার খাঁচার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো। এটা নিন্দনীয় এক দৃশ্য। আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা যে, লোহার খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি আদালতের কাঠগড়ায়। এটা অভিশপ্ত জীবনের একটা অংশ।’ লোহার খাঁচা সমগ্র জাতিকেই অমর্যাদার শেকলে বন্দি করে ফেলেছে। আমরা যে প্রভুত্বকে ১৯৭১ সালে ছুড়ে ফেলেছি তা আবার ‘প্রভু’ এবং ‘ক্রীতদাসে’ প্রতিস্থাপিত হতে পারে না। রাষ্ট্র হয় তো বা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং মানবাধিকারও হরণ করতে পারে কিন্তু মানুষের মানবিক মর্যাদা বিনষ্ট করতে পারে না। লোহার খাঁচা- মানবিক মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করার নিদর্শন।

সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে যে রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে আত্মপ্রকাশ করলো, সেই রাষ্ট্রের আদর্শগত চরিত্র কী- তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ‘লোহার খাঁচা’। প্রতিনিয়ত লুণ্ঠন ও নির্যাতন উচ্চ থেকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানবতা, মর্যাদা এবং আত্মসম্মানের উপর আক্রমণ হচ্ছে।

বলপ্রয়োগ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার সংস্কৃতি যেভাবে বিস্তৃত আর গভীর হচ্ছে, তাতে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ক্রমাগত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্যায়-অবিচার এবং লুণ্ঠন ক্রমাগত সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্র-শ্রমিক ও জনগণের ঐক্য খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে সরকার ক্ষমতাকে অভিনব হিসেবে প্রয়োগ করছে। সরকার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যারা তার আনুগত্য পোষণ করছে না তাদের শাস্তির আওতায় আনছে। আর যারা সরকারের অপশাসনের সহযোগী তাদের ‘আজিজ-বেনজীর’ হওয়ার অতুলনীয় সুযোগ দিচ্ছে।

ঔপনিবেশিক শাসকরাও কিছুটা বুদ্ধিভিত্তিক সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাইতো। ফলে কর্তৃত্ব এবং জনগণের অপ্রত্যক্ষ সম্মতির প্রয়োজন অনুভব করতো। কিন্তু বর্তমান সরকার বলপ্রয়োগ আর কূটকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনের নামে জনগণের সম্মতি আদায় করে নেয়। শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সরকার ব্যবহার করে। গলার জোরে, ক্ষমতার জোরে এটাকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। অথচ ক্ষমতাসীন সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতি মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত জনগণকে পরাধীন করছে, প্রতিদিন মানুষ স্বাধীনতা হারাচ্ছে। অধিকার, ন্যায়বিচার ধ্বংস করাকেই সরকার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। ন্যায্যতা, বিবেক এবং মূল্যবোধ বিক্রি করাটাকেই সম্মানের মুকুট হিসেবে মাথায় তুলে নিচ্ছে। যা অপবাদ, কলঙ্কজনক এবং লজ্জাজনক- সরকার তাকেই গৌরবের স্থাপত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। বেনজীরের সীমাহীন দুর্নীতি প্রকাশের পরও সরকার দুর্নীতিবিরোধী জিরো টলারেন্সের মহত্ত্ব প্রচার করে যাচ্ছে। ভয়াবহ দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও অপশাসনে রাষ্ট্র তলিয়ে যাচ্ছে অথচ সরকারের আত্মসর্বস্ব আত্মগরিমা ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। বরং সরকার অতি আগ্রহ নিয়ে বলে যাচ্ছে- আজিজ- বেনজীর এবং এমপি আজিম ইস্যুতে সরকার বিব্রত নয়। কী পরিমাণ পরিহাস! অর্থাৎ সরকারের ভেতরে কোনো ন্যায্যতা নেই, সরকারের বিবেকে কোনো বিচারালয় নেই। ন্যায্যতা উপলব্ধির সামর্থ্য থাকতে হয়, শুভ চিন্তার সামর্থ্য থাকতে হয়। ন্যায্যতার স্বরূপ সন্ধান করার সামর্থ্যই হচ্ছে নৈতিক শক্তি। সরকারের বিব্রত হওয়ার সামর্থ্য বিনষ্ট হয়ে গেছে।

সুতরাং বিব্রত হওয়া এ সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। জনগণের করুণা, কৌতুকপূর্ণ অবজ্ঞা, বিদ্রূপ বা ঘৃণা কোনোটাই তাদের কাছে বিবেচ্য নয়। রাষ্ট্র ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে থাকুক, রক্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকুক বা সার্বভৌমত্বের ঝুঁকিতে পড়ুক কিংবা রক্তপাতের ঝুঁকিতে পড়ুক, সরকার তাতে গুরুত্ব দেবে না বরং অধিকতর গুরুত্ব দেবে শুধু ক্ষমতার ওপর। শুধু ক্ষমতাই তাদের কাছে আরাধ্য। এই সরকার ২০০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও ক্ষমতার তৃষ্ণা মিটবে না।

বাংলাদেশের অন্য কোনো দল বা অন্য কোনো শাসকদের সঙ্গে এই সরকারের পার্থক্য অনেক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সরকারের কাছে গণতন্ত্র, আদর্শ, অতীত প্রতিশ্রুতি, জবানবন্দি- কোনোটারই গুরুত্ব নেই। সরকার মনগড়া শত্রু চিহ্নিত করে যুদ্ধ ঘোষণা করে, রণকৌশল তৈরি করে অন্যের মত-পথকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। রাষ্ট্রের কোথাও ন্যায্যতার কোনো বন্দোবস্ত নেই। গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে সরকার ন্যায্যতা দিচ্ছে। গণতন্ত্র, জনগণ, সংবিধান- এসবকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখাকেই একমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মর্মবাণী- দু’পায়ে মাড়িয়ে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা কায়েম করেছে। এই ধরনের শাসন ব্যবস্থা বিরল। যেকোনো সময় গুরুতর সংকট ডেকে নিয়ে আসতে পারে। সরকার বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে যে, তাদের অবস্থান মাত্রাতিরিক্তভাবে বিপজ্জনক। সমগ্র জাতি বিপর্যয়ের অতলে তলিয়ে যাওয়া লোহার খাঁচায় বন্দি। জনবিস্ফোরণ ও বিরোচিত ঐক্য ছাড়া জনগণের বিজয় সম্ভব নয়। মতাদর্শগত সংগ্রাম ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

সুতরাং লোহার খাঁচায় বন্দি দেশকে উদ্ধারে সর্বত্র বড় ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত নৈতিক জাগরণ প্রয়োজন। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র সত্যিকারের প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

লেখক: গীতিকবি ও কলামিস্ট
faraizees@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ