সাইকেলে চড়ে খুলনা বিভাগীয় গণ সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন নড়াইলের সেলিম - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৩৫, বুধবার, ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

সাইকেলে চড়ে খুলনা বিভাগীয় গণ সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন নড়াইলের সেলিম

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, অক্টোবর ২৩, ২০২২ ৪:১১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, অক্টোবর ২৩, ২০২২ ৪:১১ অপরাহ্ণ

 

বিএনপি’র খুলনা বিভাগীয় গণ-সমাবেশ দুপুর ২টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের পৌনে ২ ঘণ্টা আগে বেলা সোয়া ১২টায় কোরআন তেলাওয়াত ও মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে। বিএনপি’র বিভাগীয় গণ-সমাবেশের মঞ্চের ঠিক মাঝখানে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মানে একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। সবুজ তোয়ালে দিয়ে ঢাকা চেয়ারের এক পাশে সমাবেশের প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চেয়ার রাখা ছিল। আরেক পাশে সমাবেশের সভাপতি খুলনা মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক এস এম শফিকুল আলম মনার চেয়ার ছিল। সমাবেশের আয়োজকরা বলেছেন, মূলত দলের চেয়ারপার্সনকে সম্মান জানাতে এই খালি চেয়ার রাখা হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে খুলনামুখী বাস ও লঞ্চ বন্ধ। রাত থেকে ভৈরব ও রূপসা নদীর সবগুলো ঘাটে ট্রলার চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সারা দেশের সঙ্গে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে খুলনা নগরী। এত বাধার পরে ‘বিচ্ছিন্ন’ নগরীতে চলে সমাবেশমুখী জনস্রোত।

বাইসাইকেলযোগে সমাবেশস্থলে নড়াইলের সেলিম: নড়াইল বিএনপি’র নিবেদিত কর্মী মোহাম্মদ সেলিমের কণ্ঠে স্লোগান, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন চাই।’ তিনি বাইসাইকেলযোগে এসে বিভাগীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তার বাড়ি জেলার শাহবাগ ইউনিয়নে জুরালিয়া গ্রামে।

শুক্রবার সকাল ৭টায় তিনি খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৫০ কিলোমিটার দূরের খুলনা নগরীতে আসতে সময় লাগে ৭ ঘণ্টা। তার সাথীরা কেউ কেউ এসেছে ট্রলারে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ কেউ ভ্যানে।
সাবেক এমপি মঞ্জু ও সাবেক মেয়র মনি দর্শক সারিতে: বড় মিছিল নিয়ে বিভাগীয় গণসমাবেশে যোগ দেন খুলনা মহানগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি, সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনিসহ তার অনুসারীরা। দুপুর ১২টায় নগরীর সঙ্গীতা সিনেমা হলের মোড় থেকে একটি বড় মিছিল নিয়ে তারা সমাবেশস্থলে আসেন। মিছিলে খুলনা মহানগর বিএনপি, নগরীর ৫ থানা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ওয়ার্ড কমিটির সাবেক নেতারা অংশ নেন। ২০২১ সালের ৯ই ডিসেম্বর খুলনা মহানগর বিএনপি’র ৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হলে বাদ পড়েন মঞ্জু-মনি ও তাদের অনুসারীরা। দলের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে সাংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এর প্রেক্ষিতে ২৫শে ডিসেম্বর তাকে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে খুলনা মহানগর বিএনপি’র সহ-সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক, ৫ থানার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়ার্ড কমিটির পাঁচ শতাধিক নেতা পদত্যাগ করেন। গত ১১ মাস ধরে দলের কর্মকাণ্ডে নিস্ত্রিয় ছিলেন তারা।
বৈকালীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ: বেলা ৩টার দিকে গণসমাবেশ চলাকালে খুলনার বৈকালী এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ১৪নং ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে। এখানে আহত হয়েছে অন্তত ১৫ জন। এদিকে, খুলনা শহরের বিভিন্ন প্রবেশমুখে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে হকিস্টিক ও লোহাড় রড নিয়ে অবস্থান নেন প্রতিপক্ষ নেতাকর্মীরা। যারাই খুলনায় প্রবেশ করছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না সাংবাদিকরাও। তাদের বহনকারী গাড়ি আটকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

খুলনা রেল স্টেশনে পুলিশ-বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ও ভাঙচুর: বিএনপি’র সমাবেশে আগতদের বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে খুলনা রেল স্টেশনে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা এ সময় বিএনপি কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে এবং স্টেশনের দরজার গ্লাস ভাঙচুর করে। খুলনা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার জানান, নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটির জের ধরে সংঘর্ষে জড়ায় আগতরা। কেএমপি’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সোনালী সেন জানান, কাউকে বাধা দেয়া হয়নি। ধৈর্য্যরে সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

১০ হাজার নেতাকর্মীর জন্য রান্না করা খাবার জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে লুটপাট: খুলনার পার্শ্ববর্তী জেলার প্রায় ১০ হাজার নেতাকর্মীর জন্য খাবার রান্না হয়েছিল। নগর বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম জহিরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রান্না করা খাবার লুট করে নিয়ে যায়।
পিকচার প‌্যা‌লেস মোড়ে কাঁটাতারের বেড়া: সকাল থেকে নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে দেখা যায় কাঁটাতারের বেড়া। কাঁটাতারের বেড়ার ব্যাপারে কর্তব্যরত পুলিশের এস.আই মাহফুজের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারবো না, আপনারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

খুলনা যেন মি‌ছি‌লের নগরী‌: খুলনায় বিভাগীয় গণমহাসমাবেশ সফল করতে নগরীতে জড়ো হয়েছিল বিভাগের ১০ জেলার মানুষ। সকাল থেকে নগরী যেন মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। প্রতি ৫ মিনিট পর পর খ- খ- মিছিল সমাবেশস্থলের দিকে আসে। সকল প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে মানুষ সমাবেশের দিকে অগ্রসর হয়েছে। নগরীর শান্তিধাম মোড়ে কথা হয় শরণখোলা থেকে আগত রহিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষ আজ জেগে উঠেছে।’
মোংলা থেকে এসেছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মানুষ বর্তমান সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ক্ষোভ প্রদর্শন করছে। আজ আমরা এখানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যোগদান করছি। সারা দেশে জাতীয়তাবাদী শক্তি জেগে উঠেছে। কোনো ধরনের অপকর্ম করা হলে কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না।

গল্প-গানে কেটেছে রাত: বিএনপি’র খুলনা বিভাগীয় গণসমাবেশ গতকাল দুপুরে মহানগরীর সোনালী ব্যাংক চত্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শুক্রবার রাতেই বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা এসে সমাবেশস্থলে অবস্থান নেন। তাদের রাত কেটেছে গল্প-আড্ডা, গান আর স্লোগানে। অনেকেই সময় কাটাতে লুডুসহ বিভিন্ন খেলায় মেতেছিলেন। কুষ্টিয়ার বিএনপি কর্মী অনুপ ম-ল বলেন, আমরা অনেকেই এসেছি। হোটেলে তো এত মানুষের সিট মিলবে না। তাই সমাবেশস্থলে অবস্থান নিয়েছি। বিএনপি’র খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ বাস্তবায়নে গঠিত মিডিয়া উপ-কমিটির আহ্বায়ক এহতেশামুল হক শাওন বলেন, শত বাধা উপেক্ষা করে সমাবেশস্থলে এসে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। বহু বাধা কাটিয়ে এখানে আসতে পেরে তারা আনন্দিত। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাবেশস্থল পরিদর্শন করে হোটেলে যান। এরপর সেখানে মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

রাতে নেতাকর্মীরা এসেছেন ট্রেনে: খুলনায় বিএনপি’র বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কৌশলে খুলনায় প্রবেশ করছেন নেতাকর্মীরা। সমাবেশের আগের দিন শুক্রবার রাতে ট্রেন ও ট্রলারে করে খুলনায় এসেছেন নেতাকর্মীরা। দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও মেহেরপুর থেকে তারা ট্রেনে খুলনায় এসেছেন। চুয়াডাঙ্গা পারকৃষ্ণপুর মদনা ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক বিপ্লব বলেন, তিনদিন আগে স্টেশনে যাই, কিন্তু টিকিট দেয়নি। আজ রাতে ট্রেনে এসেছি। খুলনায় আসার পথে দুর্বৃত্তরা ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। কয়রা উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ হাসান জানান, খুলনা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলা থেকে খুলনার সমাবেশে যোগ দিতে ট্রলারে নদীপথে আসেন। খুলনা মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক শফিকুল আলম মনা বলেন, বাধা উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা খুলনায় এসেছেন।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রা‌তে ট্রলারে আসেন শ্যামনগর, দাকোপ ও কয়রার নেতাকর্মীরা: খুলনায় বিএনপি’র গণসমাবেশের আগে কয়রা উপজেলা থেকে খুলনাগামী বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। তাই সমাবেশে যোগ দিতে বিকল্প নৌপথে ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারযোগে খুলনায় যান বিএনপির নেতাকর্মীরা। কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সকল প্রকার পরিবহন ও লঞ্চ বন্ধ থাকায় আমরা রাতের অন্ধকারে ট্রলারযোগে রওনা দেই।

রূপসা, জেলখানা ও কালিবাড়ি ঘাট পারাপার বন্ধ: ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে গতকাল সকাল থেকে রূপসা ঘাট ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকার ঘোষণা দেয়া হলেও ২১শে অক্টোবর রাত পৌণে ৯টায় যাত্রী পারাপার বন্ধ করে দেয় ঘাট মাঝি সংঘ। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে ঘাট পারাপারের সাধারণ মানুষ। রূপসা ঘাট দিয়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ পারাপার হয়ে থাকে। হঠাৎ ঘাট পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পারাপারের এসব মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। এর আগে মাঝি সংঘের সভাপতি মো. রেজা ব্যাপারী বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সকল পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে ২২শে অক্টোবর ২৪ ঘণ্টার জন্য ঘাট পারাপার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছি। এই নেতা আরও বলেন, ‘গণসমাবেশকে ঘিরে খুলনাজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চলেছে। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ৬৮ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরও শতাধিক নেতাকর্মীর বাড়ি বাড়ি অভিযান, তল্লাশি ও ধরপাকড় করা হয়েছে। এতকিছুর পরও গণসমাবেশ সফল হয়েছে বলে খুলনাবাসী মনে করেন।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ