কারা এতগুলো বাসে আগুন দিলো?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, আগস্ট ১, ২০২৩ ৮:১৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, আগস্ট ১, ২০২৩ ৮:১৮ অপরাহ্ণ

আমিরুল ইসলাম কাগজী ও অধ্যাপক ড মোর্শেদ হাসান খান
জুলাই ২৯, ২০২৩, বিএনপির পূর্ব ঘোষিত রাজধানী ঢাকা শহরের চার প্রবেশমুখে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির দিন মোট সাতটি বাসে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে মাতুয়াইল এলাকায় চারটি এবং সদরঘাট, শ্যামলী ও উত্তরায় একটি করে মোট সাতটি বাসে আগুন লাগানো হয়। কারা এতগুলো বাসে আগুন দিলো? এব্যপারে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট আগে দেখি তারপর বিভিন্ন নেতার বক্তব্য নিয়ে বিশ্লেষণ করবো।
এক।
মানবজীবনের রিপোর্ট —
২৯ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাতুয়াইল মেডিকেল মোড়ে গুলিস্তানমুখী স্বদেশ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। বাসটির চালক ইমরান হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি যাত্রী নিয়ে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিলেন। মাতুয়াইল মেডিকেল মোড়ে পুলিশ গাড়ি আটকে তাকে ঘুরিয়ে দেয়। তিনি মেডিকেল মোড়ে ইউটার্ন নিয়ে যাত্রী নামানোর জন্য দাঁড়াতেই কয়েকজন হেলমেট পরিহিত ব্যক্তি এসে বাসের পেছনের দিকে পেট্রোলজাতীয় কিছু ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা চালক ইমরানকে মারধর করে বাসের চাবিও ছিনিয়ে নেয়। মাতুয়াইল মেডিকেল মোড়ে তুরাগ পরিবহনের একটি মিনিবাসে ১টার দিকে আগুন দেয়া হয়। তবে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিভিয়ে ফেলা হয়।
দুই।
প্রথম আলো’র রিপোর্ট —
বেলা পৌনে দুইটার দিকে দক্ষিণ মাতুয়াইলের সান্টু ফিলিং স্টেশনের সামনে যাত্রীবাহী আরও একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সাব্বির আহমেদ নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, বাসটি পাম্প থেকে বের হচ্ছিল। বাসে শুধু চালক ছিলেন। দুজন লোক এসে চালককে বাস থেকে জোর করে নামান। তারপর বাসে আগুন দিয়ে ভিডিয়ো করেন। এরপর একটি মোটরসাইকেল আসে। তিনজন সেই মোটরসাইকেলে চলে যায়।
বাসটির চালক মো. সানাউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজিতপুর থেকে আসছি। গুলিস্তান যাত্রী নামাইছি। এখানে আমরা সব সময় তেল নিই, তাই আসছি। গাড়িটা ব্যাক দিয়া সোজা করতে লইছিলাম। এ সময় হোন্ডা লইয়া তিনজন লোক আসল। দুজন গাড়িতে উঠল। তারা বলল, নামবি নাকি তর ওপরে প্যাট্রল মারমু। আমি স্টার্ট বন্ধ কইরা দিছি। লাফ দিয়া পইড়া গেছি। ওরা আগুন লাগাই দিয়া বাইকে করে চলে গেছে।এ সময় পুলিশ পাঁচ-ছয় হাত দূরেই ছিল। দুই পাশেই পুলিশ ছিল।’
তিন।
মানবজমিন —
একইদিন বিকাল ৩টার দিকে সাভারের আশুলিয়ায় বিকাশ পরিবহনের একটি চলন্ত বাস আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়। এতে বাসটি পুড়ে যায়। একই সময়ে আরও কয়েকটি বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। পুড়ে যাওয়া বাসের চালক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের গাড়ি নবীনগর থেকে ঢাকার আজিমপুরে যায়। বিকাল ৩টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মির্জানগর ইউলুপ থেকে বাস ঘুরিয়ে নবীনগরে যাচ্ছিলাম। এ সময় বাসে আমি ও হেলপার ছিলাম, যাত্রী ছিল না। হঠাৎ পেছন থেকে ৫০-৬০ জন মিছিল নিয়ে এসে সড়কের ওপর থাকা একাধিক বাসে ভাঙচুর চালায়। তাদের অনেকের হাতে চাপাতি ও লাঠিসহ দেশি অস্ত্র ছিল। চার-পাঁচটি বাস ভাঙচুরের পর আমাদের বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।
শনিবার রাত ৯টা ৫৬ মিনিটের দিকে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় মালেকাবানু স্কুলের সামনে ঈগল পরিবহনের একটি ফাঁকা বাসে আগুন লাগে। তাৎক্ষণিকভাবে ৯৯৯-এ কল পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বাসটির হেলপার মো. বিপ্লব বলেন, রাত ৮টার সময় বাসের যাত্রী নামিয়ে দিয়ে এখানে বাসটি দাঁড় করে রাখা হয়। এর কিছুক্ষণ পর দেখি হঠাৎ ৩ জন ব্যক্তি এসে বাসের এক পাশ দিয়ে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় দৌড়ে গিয়ে বাসচালককে বিষয়টি জানাই। ততক্ষণে পুরো বাসে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ওই বাসটির চালকের সহকারী জানিয়েছেন, ৩ জন ব্যক্তি বাসে উঠে কিছু তরল ঢেলে আগুন দিয়ে নেমে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
চার।
মন্তব্য —
মডেল মসজিদ উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি আবার আগুন সন্ত্রাস শুরু করেছে। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন একই কথা। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টে যেই বলতে গেছেন আগুন সন্ত্রাসের কথা সঙ্গে সঙ্গে বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,আগুন সন্ত্রাসের কথা কোর্টে আনবেন না ওটা বাইরের কথা। অর্থাৎ এই কথা পৃথিবীর আর কেউ বিশ্বাস করে না আওয়ামী লীগ ছাড়া। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য।
বিএনপির পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিলো ঢাকার চার প্রবেশমুখে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান। আওয়ামী লীগও শান্তি বজায় রাখতে পুলিশের সাথে কাধে কাঁধ মিলিয়ে সকাল থেকেই এই চার স্পটে লাঠি সোটা, হাতুড়ি শাবল নিয়ে অবস্থান করতে থাকে। বেলা ১১ টা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে নয়াবাজার, ধোলাইখাল এবং গাবতলী থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বেধড়ক মারপিট করে হটিয়ে দেওয়া হয়। উত্তরায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ টিকে থাকলেও পরে আর দাঁড়াতে পারে নাই। মাতুয়াইলে দুপুর ২টা পর্যন্ত টিকলেও শেষমেষ বিএনপি কর্মীরা মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়।
মাতুয়াইল বাস তিনটায় আগুন লাগানোর সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিলো, তারপরও সন্ত্রাসীরা আগুন লাগিয়ে ভিডিয়ো করে নিরাপদে স্থান ত্যাগ করে। সব সাক্ষীর ভিডিয়ো ভাইরাল। এটা ২০১৩-১৪ এবং ১৫ সাল নয়, এটা ডিজিটাল যুগ। এবার ঢালাওভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর দোষ চাপিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া যাবে না। রাত ৯ টায় উত্তরায় বিএনপির কোনো কর্মসূচি ছিলো না, ফলে নেতাকর্মীও ছিলো না। তাহলে ওই রাতে কারা বাসে আগুন দিলো?
সাভারে বিএনপির কোনো অবস্থান ছিলো না। তাহলে সেখানে কারা বিকাশ বাসে আগুন দিলো?
পুলিশকে এবার খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করলে মার্কিন ভিসানীতির কোপানলে পড়তে হবেই। আওয়ামী লীগ সরকারকে পুলিশ টিকিয়ে রেখেছে এমন ভিডিয়ো কিন্তু ইথারে ভাসছে। যাদের বাসে আগুন লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের আটক করা এখন ফরজে আইন।
মাতুয়াইলে তুরাগ পরিবহণের লক্কড় ঝক্কর বাসে আগুন লাগানোর ঘটনা আওয়ামী লীগের সেই পুরনো কৌশলের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এই তুরাগ বাস চিটাগাং রোডে চলে না। তাহলে বাসটি ওখানে গেলো কিভাবে? এই বাসের মালিককে খুঁজে বের করলে রহস্য উদঘাটিত হবে। নিজের কর্মীদের দিয়ে নিজের লোকের বাসে বোমা কিংবা আগুন লাগিয়ে বিএনপির ওপর দোষ চাপিয়ে শত শত নেতা কর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা একেবারে পুরনো কৌশল। বিহঙ্গ পরিবহনের মালিক পঙ্কজ দেবনাথ। তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ২০১৩ সালের কথা। শাহবাগের মোড়ে বিহঙ্গ পরিবহনের ওই বাসে পেট্রোল বোমা মেরে ১১ জন নিরীহ যাত্রীকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই মামলার আসামিরা এখনো জেল খাটছে। সেদিন এ ঘটনার প্রতিবাদ করা যায়নি কারণ সরকার সমর্থক পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলগুলো এমনভাবে খবর পরিবেশন করে যে পুরো দোষ বিএনপির। শুধু তাই নয় আগুনে ঝলসানো যাত্রীদের নেওয়া হতো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ডা. শামন্ত লাল সেনের কাছে। সেখানে ছিলো স্যুটিংস্পট। বশংবদ টিভি চ্যানেলে সেইসব দগ্ধ যাত্রীদের আহাজারি দেখানো হতো। শেখ হাসিনা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সব দোষ চাপাতেন বিএনপির ওপর। মানুষ সেটা বিশ্বাস করতো। কিন্তু দিন বদলে গেছে। এখন বশংবদ পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলের ওপর কারও বিশ্বাস নেই। জনগণ এখন নিজে নিজেই সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে তারা লাইভ করে। ফলে ঘটনা লুকানো কিংবা মিথ্যা তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ধোলাইখালে এবং গাবতলীতে আমানুল্লাহ আমান পুলিশের হাতে মার খাওয়ার সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভাইরাল হয়ে যায়। নজরে আসে বিশ্বের, সরকারের ওপর চাপ আসে সেখান থেকে। তখন আমানের কাছে পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর ঝুড়ি বোঝাই মহানুভবতা আর গয়েশ্বর বাবুকে আপ্যায়ন করা হয় সোনারগাও হোটেলের দামী খাবার দিয়ে। কিন্তু শেখ হাসিনার গ্রাম্য চালাকি কোনো কাজে আসে নাই। যে কারণে পরেরদিন রোববার তাদের কর্মসূচি হালে পানি পেল না। কর্মীদের উজ্জীবিত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি বিএনপি বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিলেই লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ ঘটছে।
তবে পুলিশ পাহারায় এতগুলো বাসে আগুন দিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাওয়ার ক্ষমতা বিএনপির কর্মীদের নেই। তাহলে আগে ২০১৩-১৪-১৫ সালে পুলিশ পাহারায় যেমন যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরা বাস মিনিবাসে আগুন সন্ত্রাস করে বি
জনতার আওয়াজ/আ আ