ক্ষমতা নয় দায়িত্ব শাসক নয় সেবক - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:০৫, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ক্ষমতা নয় দায়িত্ব শাসক নয় সেবক

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, ডিসেম্বর ২১, ২০২২ ৩:১৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, ডিসেম্বর ২১, ২০২২ ৩:১৭ অপরাহ্ণ

 

প্রফেসর ড. মোর্শেদ হাসান খান

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে সেই অমোঘ সত্যই যেন প্রকট আকার ধারণ করেছে। সাংবিধানিকভাবে একটা স্বাধীন জাতির পদে পদে আজ পরাধীনতা। এই পরাধীনতা নিজের মত প্রকাশের। এই পরাধীনতা ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার। প্রতিদিনই এদেশের আকাশে নতুন সূর্যের উদয় ঘটে, আবার অস্ত যায়। তবে তা সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনছে না। যেটুকু পরিবর্তন-পরিবর্ধন সেটুকু কেবলই শোষক গোষ্ঠীর। জনগণের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে এই শোষক গোষ্ঠীই দিনকে দিন ফুলে-ফেঁপে উঠছে। বিপরীতে সাধারণ জনগণ হয়ে পড়ছে রক্ত-মাংসহীন হাড়-হাড্ডির জীবন্ত কঙ্কাল ।
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সেপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে অলঙ্ঘনীয় প্রেক্ষাপটে আগমন ঘটেছিলো জিয়াউর রহমানের। একজন জেনারেল থেকে দেশের জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন ত্রাতা। তাইতো যুদ্ধ বিধ্বস্ত-ভঙ্গুর অর্থনীতি, শতধাবিভক্ত রাজনীতি আর বিলুপ্তপ্রায় সামাজিক কাঠামোকে ঠিক করতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন ঐতিহাসিক ১৯ দফা। এই ১৯ দফার আলোকেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও গতিশীল রাষ্ট্রের মহাসড়কে তুলে এনেছিলেন। তিনি দেশের রাজনীতিকে দিয়েছিলেন একটি পরিমার্জিত দিক নির্দেশনা। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে একটি সুষ্ঠু স্বাভাবিক ধারার প্রবর্তক তিনি। তেমনিভাবে অর্থনীতি, কূটনীতি কিংবা সমরনীতি সবকিছুতেই তিনি রচনা করেন একটা মজবুত ভীত। যা সে সময়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়। পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক রাষ্ট্র নায়কই সে সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাহসী নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হন। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য তিনি চট্টগ্রামে বিপথগামী সেনাদের হাতে শহিদ হলে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। এরপরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা।
স্বাধীনতার ৫২ বছরে পা রেখেছে ভৌগোলিক`বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দেশ। অবস্থানগত সুবিধা বিবেচনায় পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোর কাছেও বাংলাদেশের সমাদর রয়েছে। কিন্তু সেই সমাদর আর গুরুত্ব নেই এদেশের নাগরিকদের। শাসকগোষ্ঠী যখন শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন নিয়তি হয়তো এমনই হয়। যেমনটি গত প্রায় দেড় দশক ধরে হয়ে আসছে। কেবল নামেই নাগরিক এদেশের মানুষ, কার্যত দাস। এই দাসত্ব থেকে মুক্তি, উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন এবং জনসাধারণের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে তাই সেই শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপি ঘোষণা করেছে ঐতিহাসিক ২৭ দফার রূপরেখা। এই রূপরেখা হবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মুক্তির সনদ। যা বাস্তবায়িত হলে জনগণ তার নাগরিক স্বত্ত্ব ফিরে পাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফিরে আসবে সুস্থ প্রতিযোগিতা। অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। ক্ষমতা কাঠামোতে আসবে ভারসাম্য। অন্তত আগামী ১০০ বছর একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার যাবতীয় কার্যক্রম সঠিক ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করার একটা গাইডলাইন হবে এই ২৭ দফা।
বিএনপি আজকে যে ২৭ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছে সেটি হুট করেই আসেনি। বিগত দেড় দশক ধরে এদেশের শাসন ব্যবস্থার মূল্যায়ন, তৃণমূলে সাধারণ মানুষকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরের মানুষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক-মতবিনিময় এবং ইউরোপ-আমেরিকার শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংবিধান ও শাসন ব্যবস্থার পর্যালোচনা শেষে এটি করা হয়েছে। মূলত এটি একটি নির্যাস। যার মধ্যে রয়েছে একটি রাষ্ট্রের যাবতীয় ব্যাধি আরোগ্যের মন্ত্র।
বিএনপি বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ভোটচোর সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে। মাঠের কর্মসূচিকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ মাসেই আসছে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি। দেশের সিংহভাগ মানুষ যখন এই সরকারের জুলুম-নির্যাতনে অতিষ্ঠ। তখন তাদের নিস্ক্রিতির জন্য বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প দেখছে না বিএনপি। এই বৃহত্তর ঐক্যই বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবে। আর আন্দোলনেই পতন হবে জনবিচ্ছিন্ন এই জালিম সরকারের। তখন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাতে যদি বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব পায় তবেই বাস্তবে রূপ নেবে এই ২৭ দফা। একটি আধুনিক-মানবিক-উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই ২৭ দফার মধ্যেই রয়েছে সবটুকু উপকরণ। মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে তার অধিকার কিংবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে এই রূপরেখা। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনাকে ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন নয় বরং দায়িত্ব হিসেবে নিশ্চিত করা হবে। কেউ যেন ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করে না ভাবেন তিনিই সর্বেসর্বা বাকিরা পেঁজা তুলো-তা নিশ্চিত করবে এই ঐতিহাসিক রূপরেখা।
মূলত এই ২৭ দফার রূপরেখার প্রবর্তক তারুণ্যের অহঙ্কার আগামীর রাষ্ট্রনায়ক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শহীদ জিয়ার পবিত্র রক্ত যার ধমনীতে দেশ নিয়ে এমন উন্নত আর আধুনিক চিন্তা কেবল তার পক্ষেই সম্ভব। আওয়ামী দু শাসনের কবল থেকে দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি দিতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তিনি যেমন যোগ্য করে গড়ে তুলেছেন ঠিক সেভাবেই দেশ আওয়ামী রাহুর গ্রাস মুক্ত হওয়ার পর কোনপথে চলবে তার একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন তিনি। এই রূপরেখা অনুসরণে আগামীদিনের বাংলাদেশ হবে উন্নত-আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ। লুটপাট, দুর্নীতি, দু শাসন বন্ধ হবে।
ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রেওয়াজ বন্ধ হবে। একাধারে দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি ‘নিধিরাম সরকার’ আর প্রধানমন্ত্রীর ‘মুই কি হনুরে’ ধরণের অপবাদ ঘোচানো হবে। তাদের ক্ষমতায় একটা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স আনা হবে। পার্লামেন্ট হবে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট। যেখানে রাজনীতিকদের পাশাপাশি সমাবেশে শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দিক ও বিভাগের প্রতিনিধি থাকবেন। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। সাধারণ জনগণের উন্নয়ন-উন্নতিই হবে এই পার্লামেন্টের প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্য আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগে আনা হবে সংস্কার।
বিগত সময়ে আমরা দেখেছি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে দেশের সংবিধানকে বহুবার কাঁটাছেঁড়া করেছে আওয়ামী লীগ। সংশোধনের নামে অন্যায় ও অযৌক্তিক এই কার্যকলাপ দেশের সার্বিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে এ ধরণের অপতৎপরতা রোধ হবে। রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ ছাড়া ব্যক্তি কিংবা দল কোনো হীনস্বার্থেই সংবিধানকে কেউ ব্যবহার করতে পারবে না।
আবহমানকাল ধরেই এই জনপদ শান্তি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু তৃণমূলে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন আর ক্ষমতার রাজনীতির নামে তা আজ বিলুপ্ত প্রায়। রূপরেখার মধ্যে এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিভাবে হৃত গৌরব ফিরিয়ে এনে এই বঙ্গে আবারো সামাজিক রেওয়াজ-রসম ফিরিয়ে এনে মানুষে মানুষে ঐক্য আর সম্পৃতির সেতুবন্ধন তৈরি করা যায় সেটিও বলা হয়েছে রূপরেখায়।
প্রিয় পাঠক, একটি বিষয় খুব সাদা চোখেই দেখতে পাওয়ার কথা। এখন রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক কিংবা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো কি নির্লজ্জভাবে কেবল সরকারের দালালি করে। রাষ্ট্রের জনগণের অর্থে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের কল্যাণে পরিচালিত না হয়ে কেবল ব্যক্তি ও দল তোষণে ব্যস্ত। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নেই। এভাবে কোনো সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। রাষ্ট্রের চেয়ে কখনো কোনো দল বড় নয়। অথচ বিগত বছরগুলোয় সেই প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কেবল বিএনপির এই ২৭ দফার বাস্তবায়নই পারে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা রোধ করতে। রাষ্ট্রকে কেন্দ্রে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোকে তার চারপাশে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যয় সর্বদা সজাগ রাখার কৌশল কেবল এই রূপরেখার মধ্যেই রয়েছে।
এই রূপরেখার মধ্যে একটি দেশের সবগুলো প্রয়োজনীয় দিক অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী কিংবা সমতল থেকে পাহাড় কোনো একটি ক্ষুদ্র অংশকেও বাদ রাখা হয়নি। স্বাধীনতার ঘোষক, একাত্তুরের সম্মুখ সমরের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার শহিদ জিয়ার ধ্যান-জ্ঞান ছিলো এদেশের আপামর মানুষের কল্যাণ। তার শাহাদাতের পর এদেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। সততা, দেশপ্রেম আর গণমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে তিনি এদেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তার শাসনামলে সাধারণ মানুষের মুখে আহার ছিলো, মনে সুখ ছিলো। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অনন্য সম্মান ছিলো আন্তর্জাতিক মহলে। অথচ তার সবকিছুই আজ ভুলুণ্ঠিত। একটি মাফিয়া চক্র দেশের সকল রসদ চুরি করে কুক্ষিগত করছে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করছে। এই সবকিছুই পুনরুদ্ধার করতে হবে। দেশ নায়ক তারেক রহমানের এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে পুনরুদ্ধার হবে দেশের অর্থনীতি, ফিরবে বিলীন হয়ে যাওয়া গৌরব, রাষ্ট্র ফিরে যাবে তার অতীতে ঐতিহ্যে।
সেটি হলো এই দেশ কেবল বিএনপির একার নয়। এই দেশ সবার। এই জাতিকে পথ দেখানোর দায়িত্বও সবার। আজকে যারা নিছক বিএনপিকে প্রতিপক্ষ মনে করে এই ২৭ দফার সমালোচনা করবেন তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে সমালোচনার আগে এগুলো ভালো করে পড়ুন, আত্মস্থ করুন তারপর আপনার মতামত জানান। মনে রাখবেন সমালোচকের চেয়ে যে সংশোধনের জন্য ভুল ধরিয়ে দেয় সে এগিয়ে থাকে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আগে আপনাকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে তার শুরু হোক এখান থেকেই এবং এখনই।
লেখক — মহাসচিব, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইউট্যাব

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ