গ্রেফতার-নিপীড়নেও কঠোর আন্দোলনে বিএনপি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:৩৮, শনিবার, ১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

গ্রেফতার-নিপীড়নেও কঠোর আন্দোলনে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০২৩ ৩:৩০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০২৩ ৩:৩০ অপরাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক
বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে পাল্টাপাল্টি যুক্তি, মিটিং-মিছিলে বক্তব্য ছিল তুঙ্গে। এরইমধ্যে ‘একদফা’ দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামে বিএনপি। ২০২৩ সালের গোড়া থেকেই প্রায় ৩৬টি রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে শরিক দলগুলোর দাবিতে গত ১২ জুলাই সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এক দফার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি।

যদিও এই এক দফাতে মোট পাঁচটি দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আন্দোলনের এক দফার বাইরে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফাও ঘোষণা করে সরকারবিরোধী এই পক্ষ। জোট রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর থেকে যে যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়, তাতে দীর্ঘদিনের মিত্র দল জামায়াত ইসলামীকে অন্তর্ভুক্ত করেনি বিএনপি। তবে বছর শেষে এসে দূরে সরিয়ে দেওয়া জামায়াতকে আবার কাছে টেনে নেয় দলটি।

২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর কঠোর আন্দোলনে যায় দলটি। যুগপৎ ধারা থেকে সরে এসে তখন এক মঞ্চ থেকে আন্দোলনের কৌশল নেয় বিএনপি। এই এক মঞ্চে যুগপৎ ধারার শরিকদের বাইরে নির্বাচনে না যাওয়া দলগুলোসহ জামায়াতে ইসলামীকেও বিএনপি নিতে চাইলে তাতে আপত্তি জানায় যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাম পক্ষটি। এ অবস্থায় দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে আসা বিএনপি ২০ ডিসেম্বর সরকারের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’র ডাক দেয়।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমমনা দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বর্জন ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে চলতি সপ্তাহে টানা কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছে তারা। নির্বাচনের পর ভোট বাতিলের দাবিতেও টানা কর্মসূচি দেবে এই দলটি।

সরকার পতনে এক দফা প্রণয়ন

বিএনপি ও তার মিত্ররা সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ ১০ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। পরে আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে তাদের নানা দফাকে সমন্বয় করে এক দফায় নিয়ে আসা হয়। বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা আলাদা আলাদা মঞ্চ থেকে ১২ জুলাই এই এক দফার যৌথ ঘোষণা দেয়।

সরকারকে চাপে ফেলার প্রথম চেষ্টা ২৯ জুলাই

সরকার পতনের এক দফা দাবিতে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে পদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি, গণমিছিল এবং রোডমার্চ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে বিএনপি। এরপর ২৮ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশ করে পরদিন ২৯ জুলাই ঢাকার চার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি দেয় দলটি। মহাসমাবেশ উপলক্ষে ঢাকায় জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে উপস্থিতির সংখ্যা বাড়িয়ে আন্দোলনকে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ঢাকার প্রবেশপথগুলোর কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সেই তুলনায় তেমন না হওয়ায় সরকারকে চাপে ফেলার প্রথম চেষ্টা বিফলে যায়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপরই তিনি নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।

ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যুবদলের ঢাকা মহানগরের দুই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। তাছাড়া অনেক নেতাকে তিরস্কার করা হয়। তবে ২৯ জুলাই বিএনপির ঢাকার চার প্রবেশ মুখের কর্মসূচি সরকার কঠোরভাবে দমন করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ অনেকেই পুলিশের হামলায় রক্তাক্ত হন ওই দিন।

২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ

১৮ অক্টোবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মহাসমাবেশ থেকেই আমাদের মহাযাত্রা শুরু হবে। তারপর এই সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আর থেমে থাকব না।’ তবে ২৮ অক্টোবর সহিংসতা এবং মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর গ্রেফতার করা হয় মির্জা ফখরুলসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের।

সারাদেশে শুরু হয় ধরপাকড়। অনেক নেতা আবার আত্মগোপনে চলে যান। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ২৭ ডিসেম্বর এক ভার্চুয়ালি ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশের ৪-৫ দিন আগে থেকে এখন পর্যন্ত ২৩ হাজার ৬৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মোট মামলা দেওয়া হয়েছে ৬৮৮টির অধিক।

কঠোর আন্দোলন হরতালে ফেরে বিএনপি

২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর এর প্রতিবাদে ও এক দফা দাবিতে ২৯ অক্টোবর সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করে বিএনপি। দীর্ঘ তিন বছর পর হরতালে ফেরে দলটি। এর আগে সর্বশেষ ২০২০ সালে ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো চার দফায় পাঁচ দিন হরতাল এবং ১৩ দফায় ২৪ দিন অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।

ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এখনও তালা

২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর ওই দিন রাতেই ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা দেওয়া হয়। সেই তালা এখনও খোলেনি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন বিএনপি নয়াপল্টনে বিজয় শোভাযাত্রা কর্মসূচি পালন করলেও কার্যালয় খোলা হয়নি। ২৯ অক্টোবর পুলিশ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কড়া পাহারা বসায়। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট কার্যালয়টির সামনে ‘ডু-নট ক্রস-ক্রাইম সিন’ লেখা হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখে। দুই দিন পর দুই পাশে বসানো হয় কাঁটাতারের ব্যারিকেড। তবে ১৪ নভেম্বর ব্যারিকেড সরানো হয়।

ডোনাল্ড লুর চিঠিতে সংলাপে বসতে রাজি হয় বিএনপি

সরকারবিরোধী চলমান হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মধ্যেই দেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে চিঠি দেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। তাতে তিনি সব পক্ষকে শর্তহীন সংলাপে বসার তাগিদ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের চিঠির পর সংলাপের ব্যাপারে নমনীয় হয় বিএনপি।

তবে তার আগে নেতাকর্মীদের মুক্তি দিয়ে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টির দাবি জানায় দলটি। আর আওয়ামী লীগ চিঠি দেওয়ার দুই দিন পর ফিরতি চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ও সমমনাদের অবরোধ ও অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যেও আওয়ামী লীগ সংলাপে বসবে, এমন পরিবেশ নেই। এছাড়া বাস্তবধর্মী ফলাফলের জন্য সংলাপে বসার মতো এত সময়ও হাতে নেই।

বিএনপি ক্ষমতাসীনদের তরফে সংলাপ নাকচ হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনেই মন দেয়।

গণহারে সাজা

আলোচিত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ছিল রাজনীতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ওই সমাবেশ ভন্ডুল হওয়ার পরই কার্যত শুরু হয়েছে ‘গণহারে’ পুরোনো মামলায় সাজার রায়। প্রায় প্রতিদিনই একাধিক মামলার রায় ঘোষণা করছেন আদালত। গত সাড়ে তিন মাসে সারাদেশে নাশকতার ৬৩ মামলায় দলটির ৯৮৮ নেতাকর্মীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয় শতাধিক নেতাকর্মী দুই বছর এবং অনেকে তার চেয়ে বেশি মেয়াদে দণ্ডিত হয়েছেন।

অবশ্য এর মধ্যে একই ব্যক্তি একাধিক মামলায়ও সাজা পেয়েছেন। নজিরবিহীন দ্রুতগতির রায়ের ঘটনায় মামলা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছেন নেতাকর্মীর আইনজীবীরা। আবার দায়সারা তদন্তের কারণে মৃত ও গুম হওয়া নেতাকর্মীকেও সাজা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে ‘ন্যায় বিচারপ্রাপ্তি’ থেকেও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

১০ ডিসেম্বর সারাদেশে মানববন্ধন:টানা এক মাসের বেশি সময় হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসকে উপলক্ষ করে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘিরে ৪৩ দিন পর আবার রাজপথে ফেরে বিএনপি। এদিন ঢাকা ছাড়াও সারাদেশের জেলা পর্যায়ে মানববন্ধনের কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।

ভোট বর্জন ও অসহযোগ আন্দোলনে ডাক

হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি কার্যকারিতা হারাতে থাকায় বিকল্প কর্মসূচিতে যায় বিএনপি। ২০ ডিসেম্বর সরকারের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’-এর ডাক দিয়েছে প্রায় দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচিতে থাকা রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। দলটি ৭ জানুয়ারির ভোট বর্জন করা, ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা, সকল প্রকার কর, খাজনা ও ইউটিলিটি বিলসহ অন্যান্য প্রদেয় না দেওয়া, ব্যাংকে আমানত না রাখা এবং আদালতে হাজিরা না দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ভোট বর্জন ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে প্রথম দফায় ২৪ ডিসেম্বর অবরোধ ও ২১ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করে। বর্তমানে দ্বিতীয় দফার গণসংযোগ কর্মসূচি করছে দলটি।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ